উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি মালবাহী জাহাজ।  ১১ মার্চ ২০২৬
উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি মালবাহী জাহাজ।  ১১ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র কি শক্তি খাটিয়ে হরমুজ প্রণালি চালু করতে পারবে, এতে মার্কিন বাহিনীর ঝুঁকি কী কী

মধ্যপ্রাচ্যে সপ্তাহান্তে অতিরিক্ত কয়েক হাজার মার্কিন সেনাসদস্য পৌঁছেছেন। এটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ইরানে স্থল অভিযানের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। স্থল অভিযানের মাধ্যমে জোর করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার সম্ভাবনা বাড়লেও কিছু আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া মোট তেলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি করা হয়। এই প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এটি তেহরানকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, তা ট্রাম্প বোঝেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

ইরানে সেনা পাঠানোর চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল একটি অভিযানের কথা ভাবছেন ট্রাম্প। তা হলো ইরানের মূল ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা চালিয়ে দেশটির উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দখল করা।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে তিনি কূটনীতিকে একটি সুযোগ দিতে প্রস্তুত। এরপরও ইরানে বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোববার ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ‘ইরানের তেল দখল’ করতে চান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ট্রাম্পের সামনে দুটি সামরিক পথ খোলা আছে—ইরানের ভূখণ্ড দখল করা অথবা এই জলপথে বিশাল নৌবহর মোতায়েন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন সীমিত আকারে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করলেও এতে যে পরিমাণ প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে, তা একজন প্রেসিডেন্টের মসনদ টলিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে ইরান বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছে, তাদের ভূখণ্ডে বিদেশি সেনারা পা রাখলে, তা হবে রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করা।

ট্রাম্প এখন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে আগ্রাসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবারও সেটার ব্যতিক্রম হবে, তা আমি মনে করি না। সেনা প্রস্তুত থাকলে তিনি তাঁদের ব্যবহার করতে পিছপা হবেন না। তবে এতে প্রচুর প্রাণহানি ঘটবে
এমা সালিসবারি, জ্যেষ্ঠ ফেলো, ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট

যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তন প্রতিষ্ঠান ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ ফেলো এমা সালিসবারি মনে করেন, পারস্য উপসাগরের কোনো একটি ইরানি দ্বীপ দখলের মাধ্যমে যুদ্ধ তীব্রতর করা থেকে ট্রাম্প নিজেকে সামলাতে পারবেন না।

এমা সালিসবারি বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) এখন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে আগ্রাসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবারও সেটার ব্যতিক্রম হবে, তা আমি মনে করি না। সেনা প্রস্তুত থাকলে তিনি তাঁদের ব্যবহার করতে পিছপা হবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ধারণা, এই সিদ্ধান্ত ভয়াবহভাবে ভুল প্রমাণিত হবে এবং এতে প্রচুর প্রাণহানি ঘটবে।’

মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরান একটি হুঁশিয়ারি পাঠিয়েছে। তারা জানিয়েছে, তাদের মাটিতে কোনো মার্কিন সেনা পা রাখলে তাদের হত্যা করতে ইরান নিজের ভূখণ্ডেই ‘কার্পেট বম্বিং’ বা ব্যাপক বোমা হামলা চালাবে। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের মতে, তেহরান সতর্ক করে বলেছে যে হামলাকারী বাহিনীকে আঘাত করতে তারা নিজেদের অবকাঠামো উড়িয়ে দিতেও প্রস্তুত।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ধারণ করা ছবিতে ইরানের খারগ দ্বীপ

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ গত রোববার অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে গোপনে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে। গালিবাফ বলেন, ‘আমাদের সেনারা মার্কিন সেনাদের আগমনের অপেক্ষায় রয়েছেন, যাতে তাদের আগুনে পুড়িয়ে মারা যায় এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের আজীবনের মতো শিক্ষা দেওয়া যায়।’ শান্তি আলোচনা শুরু হলে গালিবাফ ইরানের অন্যতম প্রতিনিধি হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে পাঁচ হাজার মেরিন সেনার একটি দলের অর্ধেক সদস্য গত শনিবার মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন। এসব সেনা উভচর সামরিক যান নিয়ে সমুদ্র থেকে ভূখণ্ডে উঠতে পারদর্শী। এ ছাড়া অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ হাজার প্যারাট্রুপার বা ছত্রীসেনাও অল্প কিছুদিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তাঁরা উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টার থেকে প্যারাস্যুটের সাহায্যে যুদ্ধক্ষেত্রে বা শত্রু সীমানায় অবতরণে দক্ষ।

স্থল অভিযান করেও ইরানের হুমকি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না–ও হতে পারে। জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকলে হরমুজে নৌপথ সচল রাখা কঠিন হবে। এ জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে প্রণালিটি পাড়ি দিতে সামরিক পাহারা দেওয়া দরকার হবে।

ইরানের জ্বালানি তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খারগ দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য মূল লক্ষ্যবস্তু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এক বা একাধিক ছোট দ্বীপ দখল করা সহজ হলেও মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান মার্কিন সেনাসংখ্যা দিয়ে তা ধরে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। মার্কিন সেনারা সেখানে পৌঁছানোর পর আসল বিপদ শুরু হবে। কারণ, ইরান তখন রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করবে।

বড় ধরনের কোনো স্থল অভিযানের জন্য যে পরিমাণ সেনা দরকার, সেই তুলনায় অনেক কম সেনা নিয়ে ইরানে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছিল। অথচ ইরানের আয়তন ইরাকের তিন গুণের বেশি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন ওই অঞ্চলে আরও ১০ হাজার সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে।

ইরানে সেনা পাঠানোর চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল একটি অভিযানের কথা ভাবছেন ট্রাম্প। তা হলো ইরানের মূল ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা চালিয়ে দেশটির উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দখল করা। এ ধরনের অভিযানের জন্য বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজন হবে। ধারণা করা হয়, সমৃদ্ধ এসব ইউরেনিয়াম এক বা একাধিক স্থানে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছে। এসব স্থানে গত বছর বোমা হামলা চালানো হয়েছিল।

লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা খারগ দ্বীপ দখল করতেও পারি, না–ও করতে পারি। আমাদের সামনে অনেক বিকল্প আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর অর্থ এ–ও হতে পারে যে আমাদের সেখানে (খারগ দ্বীপে) কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করতে হবে।’

এ ইলাস্ট্রেশনে হরমুজ প্রণালির প্রণালির ম্যাপ ও থ্রি–ডি প্রিন্ট করা তেলের ব্যারেল দেখা যাচ্ছে

খারগ দ্বীপটি পারস্য উপসাগরের বেশ গভীরে এবং হরমুজ প্রণালি থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। ফলে সেখানে মার্কিন সেনাদের কাছে রসদ সরবরাহ করা যেমন কঠিন হবে, তেমনি তাঁরা ইরানি হামলার কারণে বেশি নাজুক অবস্থায় থাকবেন।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির ভেতরে বেশ কিছু ইরানি দ্বীপ রয়েছে। এ জলপথ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এসব দ্বীপ গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দ্বীপটির নাম কেশম। এ ছাড়া আবু মুসা, গ্রেটার তুনব ও লেসার তুনব নামেও তিনটি ছোট দ্বীপ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এসব দ্বীপের মালিকানা দাবি করলেও বর্তমানে সেগুলো ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব দ্বীপ প্রণালিটি দখলে রাখার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

শান্তিচুক্তিতে দর-কষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার জন্য ইরানে সেনা মোতায়েনকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ, ইরানের কোনো দ্বীপ কয়েক দিনের বেশি দখলে রাখা কঠিন হবে
রুবেন স্টুয়ার্ট, জ্যেষ্ঠ ফেলো, ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) জ্যেষ্ঠ ফেলো রুবেন স্টুয়ার্ট মনে করেন, শান্তি চুক্তির দর-কষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার জন্য এই সেনা মোতায়েনকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ, ইরানের কোনো দ্বীপ কয়েক দিনের বেশি দখলে রাখা কঠিন হবে। স্টুয়ার্ট বলেন, ‘তাঁদের (মার্কিন সেনাদের) পক্ষে এসব দ্বীপের কয়েকটিতে অবতরণ করা সম্ভব। তবে সামরিক দিক থেকে হিসাব করলে এর মাধ্যমে কোনো লক্ষ্য অর্জন করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়।’

মাইন অপসারণকারী জাহাজের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এরই মধ্যে জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ বর্তমানে তাদের নেই।

স্থল অভিযান করেও ইরানের হুমকি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না–ও হতে পারে। জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকলে হরমুজে নৌ চলাচল সচল রাখা কঠিন হবে। এ জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে প্রণালিটি পাড়ি দিতে নৌযানের মাধ্যমে পাহারা দেওয়া দরকার হবে। সেই সঙ্গে মাইন অপসারণ ও আকাশপথের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। এই বিশাল কাজের জন্য হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা প্রয়োজন হবে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হবে।

মাইন অপসারণকারী জাহাজের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এরই মধ্যে জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ বর্তমানে তাদের নেই।

এই চ্যালেঞ্জ আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। শনিবার ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। তারা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত সংকীর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করতে পারে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুটি নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।