মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক উপস্থিতির মধ্যেও আগামী বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরুর আশা করছে ইরান। এর মধ্য দিয়ে সংঘাত এড়াতে চাইছে দেশটি। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আবার শুরু হতে যাওয়া আলোচনার আগে একটি সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। এর আগে ওয়াশিংটনের দূত স্টিভ উইটকফ প্রকাশ্যে তেহরানকে নতি স্বীকার করার কথা বলেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বলেছেন, বৃহস্পতিবার জেনেভায় আলোচনা শুরু হবে। চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বাড়তি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ইরানে বিক্ষোভ দমনে সরকারি অভিযানের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার হুমকি বহুগুণ বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ওই অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। রোববারও ইরানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে আঞ্চলিক মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের ওপর হামলা চালায়, তবে আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার আমাদের রয়েছে।’ তবে তিনি আরও বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের একটি ভালো সুযোগ রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, আগের আলোচনা থেকে উৎসাহব্যঞ্জক সংকেত পাওয়া গেছে।
জেনেভায় সাম্প্রতিক আলোচনার পর ইরান জানিয়েছে, তারা একটি চুক্তির খসড়া প্রস্তাব তৈরি করছে, যা সামরিক সংঘাত এড়াতে সহায়ক হবে। আরাগচি সিবিএসকে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, সম্ভবত এই বৃহস্পতিবার জেনেভায় যখন আমরা আবার বসব, তখন আমরা সেই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারব এবং একটি ভালো খসড়া তৈরি করে দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব।’
এর আগে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল, ইরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের প্রস্তাব জমা দেয়, তবে ওয়াশিংটন বিস্তারিত আলোচনা শুরু করতে আবারও বৈঠকে বসতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরি, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য জাহাজ পাঠিয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকিকে জোরালো করতে ওই অঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও শক্তিশালী করেছে।
গত বছর কূটনীতি চলাকালে ইরানে ইসরায়েলের বিমান হামলার কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রও স্বল্প সময়ের জন্য যোগ দিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল।
ওমানের মধ্যস্থতায় সাম্প্রতিক আলোচনা চললেও ইরানি জনগণের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের আতঙ্ক বাড়ছে। তেহরানের বাসিন্দা হামিদ বলেন, ‘আমি রাতে ঘুমানোর ওষুধ খেয়েও শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না।’ ৪৬ বছর বয়সী আইটি টেকনিশিয়ান মিনা আহমাদভান্দ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ হওয়াটা এখন অনিবার্য। তিনি আরও বলেন, ‘আমি যুদ্ধ চাই না, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।’
এ উদ্বেগের কারণে ভারত, সুইডেন, সার্বিয়া, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে।
ইরান মূলত মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চায়। এ নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েছে। গত বছরের শেষদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে দেশটিতে বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কর্তৃপক্ষের কঠোর দমনে সেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। রোববারও ইরানি শিক্ষার্থীরা আবারও বিক্ষোভ মিছিলে জড়ো হন।
স্থানীয় ও বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো তেহরানের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভের খবর দিয়েছে।
শুরুতে ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উৎসাহিত করেছিলেন এবং দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তাঁদের পক্ষে হস্তক্ষেপে হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তাঁর হুমকি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে মোড় নেয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার প্রাক্কালে তিনি এ আহ্বান জানান।
ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকের আগে কালাস বলেন, ‘এই অঞ্চলে আমাদের আর কোনো যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। এখানে ইতোমধ্যে অনেক সংঘাত চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা সত্য যে ইরান এখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার জন্য আমাদের এ সময়কে সত্যিই কাজে লাগানো উচিত।’