
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গল ও বুধবারের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে গত মাসে নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি। দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকও (এমওইউ) অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদ জাভেদ হাসান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই সংঘাতের পরবর্তী ধাপের জন্য নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে এ যুদ্ধবিরতির সুযোগকে ব্যবহার করেছে। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ওয়াশিংটনের যে এই চুক্তি পুরোপুরি মেনে চলার অভিপ্রায় কখনো ছিল—এমন প্রমাণ খুব কমই আছে।
জাভেদ হাসান বলেন, তেহরান যুদ্ধবিরতির এই স্বস্তির সময়কে ‘রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যে তেল রপ্তানি আবার সচল করার পাশাপাশি নিজেদের কৌশলগত দাবিগুলো পুনর্ব্যক্ত করতে’ ব্যবহার করেছে বলে মনে হয়।
মুক্ত উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের (ওপেন সোর্স ডেটা) ওপর ভিত্তি করে এই অর্থনীতিবিদ অনুমান করছেন, ইরান তেল বিক্রি থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করেছে।
জাভেদ হাসান বলেন, লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এটিই স্পষ্ট করেছে যে সামরিক চাপ কমেনি, যা সমঝোতা স্মারকের ১ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। এই ব্যবস্থা (সমঝোতা স্মারক) সব সময়ই সাময়িক বলে মনে হয়েছিল।
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, সংকট কেটে গেছে—এমন ধারণায় আস্থা রাখাটা কঠিন।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল–জাজিরার সাংবাদিক মাইক হান্না বলেন, চলমান সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা বাতিলের সিদ্ধান্তে মার্কিন প্রশাসন অনড় রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কের আঙ্কারায় ৫৩ ঘণ্টার সফর শেষে প্রায় ছয় ঘণ্টা আগে হোয়াইট হাউসে ফিরেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার সকালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কিছু শোনা না গেলেও ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট বলেছেন, যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’।
অন্যদিকে প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তা বলেছেন যে চলমান সংঘাত সত্ত্বেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত এবং তা সম্ভব।
মাইক হান্না বলেন, এটি মনে রাখা প্রয়োজন, এ সংঘাতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করতে কংগ্রেসের কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও ভোট দিয়েছিলেন। ফলে চলমান এ লড়াইয়ের বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিরোধ রয়েছে। এখন যেহেতু আর কোনো যুদ্ধবিরতি নেই, তাই ট্রাম্পের পক্ষে কংগ্রেস এবং মার্কিন জনগণের কাছে এটি ব্যাখ্যা করা কঠিন হতে পারে যে যেই যুদ্ধ প্রাথমিকভাবে তিন–চার সপ্তাহ স্থায়ী হবে বলে তিনি বলেছিলেন, সেটি কেন তিনি এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন।
আল–জাজিরার এই সাংবাদিক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কয়েকজন বিশ্লেষক বলেছেন, ট্রাম্প যেন নিজের বিজয় ঘোষণা করতে পারেন এবং যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলতে পারেন, সে লক্ষ্যেই চুক্তিটি এত তাড়াহুাড়া করে করা হয়েছিল। তাঁরা আরও বলছেন, ওই চুক্তির ধারাগুলো, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি–সম্পর্কিত ধারাগুলো নিয়ে সংঘাত অনিবার্যই ছিল, যা এখন নতুন করে বাড়তে থাকা এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, আগের ৪৮ ঘণ্টায় তারা ইরানের ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। গত ১৭ জুন উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পর এটি ছিল সবচেয়ে বড় পরিসরে হামলা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগপ্রধান হোসেন কেরমানপোর বলেন, যুদ্ধবিরতি বহাল থাকা অবস্থায়ই যুক্তরাষ্ট্র ৭ ও ৮ জুলাই ইরানের পাঁচটি প্রদেশে হামলা চালিয়েছে। হামলায় ১৪ জন শহীদ ও ৭৮ জন আহত হয়েছেন।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তেহরানের সঙ্গে যুক্ত রেলপথের দুটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরান-তেহরান রেল করিডরের রেলপথও। এ ছাড়া বুশেহরে পারমাণবিক স্থাপনার কাছেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে মার্কিন হামলার জবাবে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানও। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর বাহরাইনে অবস্থিত। ইরানের হামলার সতর্কতায় দেশটিতে অন্তত তিনবার সাইরেন বেজে ওঠে। পাশাপাশি কুয়েত ও কাতারকেও লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরানি বাহিনী। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে জর্ডানও। এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।