
বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছে—ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজগুলোকে অবশ্যই ইরানের পূর্বঘোষিত নিরাপদ পথ ব্যবহার করতে হবে।
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পরবর্তী সময়ে বিশ্ববাণিজ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয় এ পথ দিয়ে।
এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে। ২২ এপ্রিল পর্যন্ত তা চলার কথা।
ইরানের বন্দরগুলোর ওপর ওয়াশিংটন যে নৌ অবরোধ দিয়ে রেখেছে, তা চলবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, ‘বিশ্বের জন্য এটা একটি মহান ও চমৎকার দিন।’ তিনি এটাও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি নিয়ে ঐকমত্য না হওয়া অবধি অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো বলছে, হরমুজ প্রণালি খুললেও এ সমুদ্রপথে এখনো খুব কমসংখ্যক জাহাজ চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখন নিরাপদ কি না, সেটা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের মাঝে লেবাননেও নির্বিচারে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। এখন সেখানেও যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির প্রথম পূর্ণাঙ্গ দিন ছিল গতকাল। আর এদিনই হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন আব্বাস আরাগচি।
এক্স পোস্টে আব্বাস আরাগচি লেখেন, ‘লেবাননে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সংগতি রেখে এই যুদ্ধবিরতির (ইরানের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি) বাকি সময়টুকুতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াতের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়েছে। ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থা কর্তৃক পূর্বঘোষিত সমন্বিত রুটে নৌযান চলাচল করবে।’
এরপর ইরানের একজন ‘ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার’ বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, সেই ‘পূর্বনির্ধারিত’ পথ ধরেই জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে হবে। আর হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধজাহাজ চলাচল ‘পুরোপুরি নিষিদ্ধ’ থাকবে।
সম্ভবত এখানে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নির্ধারিত একটি মানচিত্র ও দুটি নৌপথের কথা বলা হয়েছে। গত সপ্তাহে ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোয় তা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল।
ইরানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির এক্স পোস্টের তীব্র সমালোচনা করেছে। এর মধ্যে আইআরজিসির সঙ্গে সম্পৃক্ত সংবাদ সংস্থা তাসনিম এ পোস্টকে ‘বাজে ও অসম্পূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছে। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ চালু রাখা হলে হরমুজ খুলে দেওয়ার বক্তব্য বাতিল বলে গণ্য হবে। অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে ইরান সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে এক্সে একটি পোস্ট দেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনায় নিজ দেশের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। স্পিকার গালিবাফ বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘণ্টায় সাতটি দাবি করেছেন, যার সব কটিই মিথ্যা।’
মূলত ‘ইরান আর কখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না বলে রাজি হয়েছে’ উল্লেখ করে ট্রাম্পের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফ এমন মন্তব্য করেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার স্পষ্ট করে জানান, ‘(মার্কিন) অবরোধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ইরানের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে। আর নির্ধারিত রুট অনুসারে চলবে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পোস্টের আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক এক্স পোস্টে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে ইরানের দেওয়া পূর্বনির্ধারিত পথ অনুসরণ করতে হবে। আর ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ চলতে থাকলে ইরানও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেবে।
ইসমাইল বাঘাই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান হরমুজ প্রণালির অভিভাবক। তবে প্রয়োজন হলে দেশটি নমনীয়তা দেখাবে।