
গত বছরের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে গাজা উপত্যকা থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করার কথা ছিল ইসরায়েলের। কিন্তু সেনা সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে ইসরায়েলি বাহিনী অবরুদ্ধ এ উপত্যকায় গোপনে স্থায়ী ও সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আল-জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিটের একটি অনুসন্ধানে গত মে পর্যন্ত স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে গাজার ভেতর এমন ৪০টি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ বিশ্লেষণ প্রমাণ করে, আটটি ঘাঁটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। এখনো পুরোদমে একটি ঘাঁটির নির্মাণকাজ চলছে।
গাজার ভূখণ্ড দখলের সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ দেখা গেছে খান ইউনিসে। সেখানকার একটি কবরস্থান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে তার ওপর নতুন সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
এসব স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি ইসরায়েল সরকারের ক্রমশ গাজা উপত্যকা দখলে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই স্পষ্ট করছে। সম্প্রতি এক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই গাজা উপত্যকার সিংহভাগ এলাকা স্থায়ীভাবে দখলে নেওয়ার নির্দেশনার কথা নিশ্চিত করেছেন।
গাজার নিরপেক্ষ অঞ্চল ও সামরিক এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ে ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত একটি সীমারেখা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনী এই সীমারেখার মধ্যে নিজেদের অবস্থান সীমিত রেখেছে।
ওই সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা এখন হামাসকে চাপে রেখেছি। গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে।’
সম্মেলনে উপস্থিত এক ব্যক্তি গাজা উপত্যকাকে পুরোপুরি ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার দাবি জানান। জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আসুন ধাপে ধাপে এগোই। আগে ৭০ শতাংশে যাই। সেখান থেকেই শুরু করি।’
কবরস্থান ভেঙে সামরিক ঘাঁটি
স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইসরায়েল যেসব সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে, সেগুলো অস্থায়ী কোনো পর্যবেক্ষণ চৌকি নয়, বরং টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবকাঠামো নির্মাণের একটি পদক্ষেপ।
কৌশলগতভাবে গাজায় বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে নতুন সামরিক ঘাঁটিগুলো তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি উত্তর গাজায়, দুটি মধ্যাঞ্চলে, একটি নেৎজারিম করিডরের পূর্বে ও তিনটি দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিসে।
গাজার ভূখণ্ড দখলের সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ দেখা গেছে খান ইউনিসে। সেখানকার একটি কবরস্থান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে এটির ওপর নতুন সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে এ কবরস্থানে মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের ১৮ মে–র মধ্যে দেখা যায়, কবরস্থানটিতে একই রকম দেখতে কয়েকটি স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। স্থাপনাগুলোতে সামরিক যানবাহন রাখা। স্থাপনাগুলো সেনা আবাসন ও বৈঠকের জন্য ব্যবহৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উত্তর গাজার বেইত লাহিয়াতেও একই ধরনের দ্রুত সামরিকীকরণের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তোলা কিছু ছবিতে এলাকাটি সম্পূর্ণ খালি দেখা গেলেও নভেম্বরের মাঝামাঝি সেখানে অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শুরু হতে দেখা যায়। গত মে মাসে সেখানে পূর্ণাঙ্গ সামরিক স্থাপনা ও বিভিন্ন ভবন গড়ে উঠতে দেখা গেছে।
গাজাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৪০টি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার একটি পরিকল্পিত কৌশল।
পুরোনো ঘাঁটিগুলো শক্তিশালী করা হচ্ছে
নতুন ঘাঁটি নির্মাণের পাশাপাশি ইয়েলো লাইনের ভেতর আগে থেকেই থাকা সামরিক অবস্থানগুলোও দ্রুত সম্প্রসারণ করছে ইসরায়েলি বাহিনী। পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের আগপর্যন্ত এ লাইনের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীকে অবস্থান করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
গাজা নগরীর পূর্বে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটির আয়তন ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
নতুন করে সাজানো এ ঘাঁটিতে সাঁজোয়া যান রাখার জন্য আলাদা জায়গা, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর পুনর্বিন্যাস ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
মধ্য গাজার একটি সামরিক স্থাপনার চারপাশে গভীর প্রতিরক্ষামূলক পরিখা খননের চিত্রও স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি।
এ সামরিক অবকাঠামোর কৌশলগত উদ্দেশ্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় নেৎজারিম করিডরে। এ করিডর ব্যবহার করে ইসরায়েলি বাহিনী উত্তর ও দক্ষিণ গাজাকে কার্যত আলাদা করে রেখেছে।
আল–জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিট করিডরটির আশপাশ ও পূর্বদিকে তিনটি পৃথক সামরিক ঘাঁটি শনাক্ত করেছে। এসব ঘাঁটির মাধ্যমে গাজার দুই অংশের মধ্যে চলাচলের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হচ্ছে।
করিডরের পূর্বে জুহোর আদ-দিক এলাকায় একটি খোলা জমিও দ্রুত সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করা হয়েছে। গত মার্চে সেখানে মাটি কাটার কাজ শুরু হয়।
জনসাধারণকে অবরুদ্ধ করার কৌশল
গাজাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৪০টি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার একটি পরিকল্পিত কৌশল।
ঘাঁটিগুলোর একটি আরেকটির সঙ্গে মাটির বাঁধ, পরিখা ও সামরিক সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত।
এই অবকাঠামো বেসামরিক মানুষের চলাচল ও নিজেদের জমিতে যাওয়ার সুযোগকে মারাত্মকভাবে খর্ব করছে, বিশেষ করে ইসরায়েলি অবস্থানের কাছাকাছি এলাকাগুলোতে।
গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত ও ১ লাখ ৭২ হাজার ৯১৯ জন আহত হয়েছেন। হতাহতদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।
এ সম্প্রসারিত সামরিক উপস্থিতি ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ওই চুক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২১ দফা শান্তি পরিকল্পনার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল।
চুক্তিতে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ, মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছিল।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আকরাবাবি বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় ‘দখল, নিয়ন্ত্রণ ও সীমানা সম্প্রসারণ ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির মূল অংশে পরিণত হয়েছে।’
আবদুল্লাহ বলেন, ইসরায়েলের নতুন কৌশল হলো এমন একটি অঞ্চল গড়ে তোলা, যেখান থেকে ফিলিস্তিনি জনগণ ও নগর অবকাঠামো পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হবে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭২ হাজার ৯১৯ জন আহত হয়েছেন। হতাহতদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সহিংসতা থামেনি। যুদ্ধবিরতির পর সাত মাসে অন্তত ৯২৯ ফিলিস্তিনি নিহত ও ২ হাজার ৮১১ জন আহত হয়েছেন।