বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক সদস্যের কোলে শিশু তালিন সাইদের মরদেহ। এপ্রিল ১২, ২০২৬
বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক সদস্যের কোলে শিশু তালিন সাইদের মরদেহ। এপ্রিল ১২, ২০২৬

লেবাননে বাবার জানাজায় ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ ৪ স্বজন নিহত

গত সপ্তাহে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় ৭ বছর বয়সী শিশু আলিন সাইদ গুরুতর আহত হয়েছে। তার শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো। বাবার জানাজার সময় এ হামলা হয়। আলিন প্রাণে বেঁচে গেলেও হামলায় তার দুই বছরের কম বয়সী বোনসহ চার স্বজন নিহত হয়েছে।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রাম স্রিফায় সাইদ পরিবারের বাড়িতে গত বুধবার ওই হামলা হয়। সেদিনই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

লেবাননের অনেকেই আশা করেছিলেন, এই যুদ্ধবিরতি তাঁদের দেশেও প্রযোজ্য হবে। কিন্তু তাঁদের ধারণা ভুল ছিল। সেদিন লেবাননজুড়ে ব্যাপক হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলায় ৩৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। হামলার কারণে সাইদ পরিবারকে নতুন করে আরও ৪ স্বজনকে দাফন করতে হয়েছে।

আলিনের ৬৪ বছর বয়সী দাদা নাসের সাইদ হামলায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। রোববার নাসের সাইদ দক্ষিণের বন্দরনগরী তিয়ারে সবুজ কাপড়ে মোড়ানো মরদেহগুলো নিতে যান। স্বজনদের মরদেহগুলোর মধ্যে একটি আকারে অনেক ছোট। সেটি ছিল তাঁর নাতনি তালিনের। আলিনের ছোট বোন সে। তালিনের বয়স দুই বছর পূর্ণ হয়নি।

মাথা ও ডান হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে নাসের সাইদ নীরবে শোক পালন করছিলেন, আর তাঁর চারপাশে থাকা নারীরা আকাশের দিকে মুখ তুলে আহাজারি করছিলেন।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, ঘটনাটি তদন্ত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে তারা বলেছে, হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সময় বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে তারা পদক্ষেপ নিয়ে থাকে।

গত ২ মার্চ লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েলি স্থাপনাগুলোতে হামলা শুরু করার পর দেশটিতে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। ইসরায়েল দেশটিতে আকাশ ও স্থল অভিযান আরও জোরদার করেছে। এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৬৫ শিশু এবং প্রায় ২৫০ জন নারী রয়েছে।

ভ্যাটিকান পোপ লিও রোববার লেবাননের জনগণের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে দেওয়া সাপ্তাহিক বক্তব্যে লিও বলেন, বেসামরিক জনগণকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করাটা একটি ‘নৈতিক দায়িত্ব’।

লেবাননে গত বুধবার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী দিন ছিল। হামলায় আলিনের মা ঘিনওয়া আহত হয়েছেন। তিনি এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল থেকে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আলিনের দাদা নাসের সাইদ বলেন, ‘এটা মানবতাবিরোধী। এটা যুদ্ধাপরাধ।’

নাসের সাইদ আরও বলেন, ‘মানবাধিকার কোথায়? যদি ইসরায়েলে কোনো শিশু আহত হয়, পুরো বিশ্ব নড়ে ওঠে। আমরা কি মানুষ নই? আমরা কি তাদের মতো মানুষ নই?’

তালিনের জন্ম ২০২৪ সালে। ওই সময়ও হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছিল। তালিনের নানা মোহাম্মদ নাজ্জাল বলেন, ‘সে যুদ্ধের মধ্যে জন্মেছিল এবং যুদ্ধের মধ্যেই মারা গেছে।’

ব্যাপক বোমা হামলা অব্যাহত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে লেবাননে যুদ্ধবিরতি চায় ইরান। রোববার কোনো অগ্রগতি ছাড়াই সে আলোচনা শেষ হয়েছে। তবে ইসরায়েল চায়, লেবাননের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা পথে আলোচনা চালাতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত আছে। গত শনিবার হামলায় প্রায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন।

তিয়ার শহরে জাবাল আমেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান আব্বাস আতিয়েহ বলেন, গত সপ্তাহের বোমা হামলার ঘটনা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র ছিল। আতিয়েহ বলেছেন, তাঁর হাসপাতালে আসা অনেক রোগীই শিশু।

আতিয়েহ রয়টার্সকে বলেন, ‘একই সময়ে বা ৩০ মিনিট অন্তর কিংবা এক ঘণ্টার মধ্যে বিপুলসংখ্যক আহত মানুষ আসছে। তাদের সামাল দেওয়াটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’