ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানে ট্রাম্পের ‘মাদুরো মডেল’ যে বিপদ ডেকে আনতে পারে

ভেনেজুয়েলায় মাদুরো-পর্বকে ইরানের ভবিষ্যৎ হিসেবে কল্পনা করা ভুল হিসাব হতে পারে। টাইম সাময়িকীর সানাম ভাকিল দেখিয়েছেন, বাইরের চাপ সব সময় শাসনব্যবস্থা ভাঙে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ভিন্নরূপে টিকিয়ে রাখে। ইরানের ক্ষেত্রে এমন কৌশল দমন-পীড়ন বাড়াতে ও আন্দোলনকে দুর্বল করতে পারে। কোনো দেশে জনগণের সামনে স্পষ্ট রাজনৈতিক বিকল্প না থাকলে বিদেশি হস্তক্ষেপ পরিবর্তন নয়; বরং অনিশ্চয়তাই ডেকে আনে।

যখন খবর এল যে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে; তখন ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের আরেক শত্রু (ইরান) সম্পর্কে একটি পরিচিত ধারণা দ্রুত দানা বাঁধতে শুরু করে। অনেকেই যুক্তি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কারাকাসে একজন ক্ষমতাসীন কর্তৃত্ববাদী নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কার্যকর করতে পারে, তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিরও একই পরিণতি হতে পারে।

কিন্তু এ ধারণা গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ, এমনকি বিপজ্জনকও; বিশেষ করে সেই সব ইরানির জন্য, যাঁরা ‘অর্থবহ’ রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা করেন।

ভেনেজুয়েলা নিয়ন্ত্রণ ও সেখানকার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটানো নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার বাগাড়ম্বর করা সত্ত্বেও বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন। মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে এবং বিচারের মুখোমুখি করতে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে মাদুরোর দীর্ঘদিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর শাসনের প্রতি অনুগত দেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট ও সামরিক বাহিনীর বড় অংশের সমর্থন নিয়ে মাদুরোর অনুগত দেলসির এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েনি এবং শাসকগোষ্ঠী এখনো তাদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে। এমনকি নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর মতো বিরোধী দলের নেতাদেরও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। ট্রাম্প যা চান, সেই প্রকৃত রাজনৈতিক রূপান্তরের সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করে এটি।

‘মাদুরো পর্বের’ পুনরাবৃত্তি ইরানেও সম্ভব, এ বিশ্বাস একটি বিভ্রান্তিকর তুলনার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। ভেনেজুয়েলা ও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো, কৌশলগত পরিবেশ ও টিকে থাকার পদ্ধতিতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। সামরিক পদক্ষেপ ইরানের নেতৃত্বকে ভেঙে দেবে, অথচ বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে না—এ ধারণা বিশেষভাবে বিপজ্জনক।

ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে যা গড়ে উঠেছে, তা এমন এক ব্যবস্থা, যা নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, চাপ সহ্য করে ফেলেছে এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজিয়েছে। তবে এটি ভেতরের ক্ষমতার ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখেছে। এই ফলাফল ট্রাম্পের কৌশল বা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে। সেটি হলো, তাঁর লক্ষ্য—কোনো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা গণতন্ত্রে উত্তরণ নয়; বরং এমন একটি নমনীয় ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য শাসনকাঠামো তৈরি, যা মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে কাজ করবে।

ট্রাম্পের পদক্ষেপের সম্ভাব্য ফলাফল বিবেচনায় নিলে ইরান-ভেনেজুয়েলার পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা মনে করেন যে ট্রাম্প ইসলামী প্রজাতন্ত্রটিকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করবেন; তাঁরা তাঁর অতীত রেকর্ড বুঝতে ভুল করছেন। মাদুরো পর্ব এটিই ইঙ্গিত দেয়, ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার প্রকৃতপক্ষে ‘মুক্তি’ নয়, বরং ‘সুবিধা আদায়’ এবং শাসনব্যবস্থার ‘পতন’ নয়, বরং ‘বাধ্য বা অনুগত’ করা। ইরানের জনগণের জন্য এটি একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ। কারণ, একটি দুর্বল কিন্তু টিকে থাকা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র প্রায়ই আরও বেশি সহিংস ও কম জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে।

ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে যা গড়ে উঠেছে, তা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যা নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, চাপ সয়ে ফেলেছে এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজিয়েছে। তবে ভেতরের ক্ষমতার ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখেছে। এই ফলাফল ট্রাম্পের কৌশল সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে। সেটি হলো, তাঁর লক্ষ্য, কোনো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা গণতন্ত্রে উত্তরণ নয়, বরং এমন একটি নমনীয় ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য শাসনকাঠামো তৈরি করা, যা মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে কাজ করবে।

‘মাদুরো-পর্বের’ পুনরাবৃত্তি ইরানেও সম্ভব, এ বিশ্বাস একটি বিভ্রান্তিকর তুলনার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। ভেনেজুয়েলা ও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো, কৌশলগত পরিবেশ ও টিকে থাকার পদ্ধতিতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। সামরিক পদক্ষেপ ইরানের নেতৃত্বকে ভেঙে দেবে, অথচ বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে না—এ ধারণা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। বিশেষ করে তা এমন এক সময়, যখন ইরানের বহু শহর ও জনপদে ধারাবাহিক বিক্ষোভ চলছে এবং দেশটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে)

একই সঙ্গে মাদুরো-পর্ব ইরানের ক্ষমতাসীন অভিজাত মহলেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনৈতিক ক্লান্তি, ক্রমহ্রাসমান বৈধতা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা এ শাসকগোষ্ঠীর কাছে ভেনেজুয়েলা টিকে থাকার একটি উদাহরণ। বার্তাটি স্পষ্ট—চরম চাপেও কোনো শাসন টিকে থাকতে পারে; যদি তারা অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখে, কঠোরভাবে ভিন্নমত দমন করে ও বাইরের শক্তিগুলোর কাছে সামান্য নমনীয়তা দেখিয়ে চাপ কিছুটা কমাতে পারে। এ শিক্ষা যদি তেহরান গ্রহণ করে; তবে একদিকে তারা ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কৌশলগত সমঝোতার পথ খুঁজবে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে আরও কঠোর দমননীতি গ্রহণ করতে পারে।

বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বর্তমান প্রজাতন্ত্রের শাসন তাঁরা আর মানতে রাজি নন। কিন্তু এ শাসনের পতনের পর কোন ধরনের রাষ্ট্র, সরকার বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে; সে বিষয়ে তাঁরা এখনো কোনো ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত ধারণা দিতে পারেননি। রাজনৈতিক কাঠামো, শাসনপ্রণালি ও সামাজিক সমঝোতা নিয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে আন্দোলন সহজেই দেশের ভেতরের ক্ষমতাবান গোষ্ঠী বা বিদেশি শক্তির হাতে ব্যবহার হয়ে যেতে পারে।

ইরানি সমাজের জন্য এ পথচলা অত্যন্ত অস্বস্তি-উদ্বেগের। জনগণের বড় একটি অংশ এখন আর শুধু সংস্কারের দাবি করছে না। তারা ক্ষমতাসীনদেরই প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করছে। কিন্তু স্পষ্ট কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিকল্প ছাড়া বাইরের চাপ তাদের ক্ষমতাশালী করবে না; বরং আরও সীমাবদ্ধ করবে। এ কারণে বর্তমান মুহূর্ত ইরানিদের জন্য জরুরি হিসাব-নিকাশের সময়; যদিও তা কঠিন।

বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বর্তমান প্রজাতন্ত্রের শাসন তাঁরা আর মানতে রাজি নন। কিন্তু এই শাসনের পতনের পর কোনো ধরনের রাষ্ট্র, সরকার বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে; সে বিষয়ে তাঁরা এখনো কোনো ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত ধারণা দিতে পারেননি। রাজনৈতিক কাঠামো, শাসনপ্রণালি ও সামাজিক সমঝোতা নিয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে আন্দোলন সহজেই দেশের ভেতরের ক্ষমতাবান গোষ্ঠী বা বিদেশি শক্তির হাতে ব্যবহার হয়ে যেতে পারে। অথচ এসব শক্তির কেউ প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের ব্যাপারে আগ্রহী নয়।

তেহরানের বাজারে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়েন

ইতিহাসে দেখা যায়, কখনো কখনো বাইরের চাপ কোনো ব্যবস্থার পতনের সঙ্গে মিলে গেছে, যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে। তবে অধিকাংশ সময়ই এ চাপ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে উচ্ছেদ না করে নতুনভাবে গড়ে তোলে। যখন কোনো একটি সরকার খুব চাপে পড়ে; তখন সে সমস্যার সমাধান না করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করে। এ জন্য দমন-পীড়ন বাড়ায়, জনগণ থেকে দূরে সরে যায় এবং কখনো কখনো দেশের বাইরে বিপজ্জনক কাজেও জড়িয়ে পড়ে। ‘ভেনেজুয়েলার ছক’ ইরানের ওপর প্রয়োগের চেষ্টা বড় ধরনের ভুল হিসাবের ঝুঁকি তৈরি করবে এবং তা এমন এক সময়ে আঞ্চলিক ভারসাম্যকে আরও নড়বড়ে করে তুলবে, যখন ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা আবার বিপজ্জনক মাত্রার দিকে এগোচ্ছে।

‘মাদুরো–পর্বের’ মূল শিক্ষা হওয়া উচিত সতর্ক থাকা। নির্ভরযোগ্য কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া শুধু বাহ্যিক চাপ স্বাধীনতা এনে দেয় না। পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগকে ‘পরিবর্তন’ বলে ভুল করার অর্থ—ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে হয়তো ক্ষতবিক্ষত করা, কিন্তু টিকিয়ে রাখা। আর ইরানিদের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে মুক্তির আশা করার অর্থ হলো—নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন কাজকে আরও পিছিয়ে দেওয়া। কারণ, তাঁরা শুধু বর্তমান অবস্থা থেকেই বাঁচতে চান, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট কিছু ভাবেন না।

[নিবন্ধটি টাইম সাময়িকীর অনলাইন সংস্করণে ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। লেখক সানাম ভাকিল চাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌]