হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধের প্রভাব হবে মারাত্মক

একটি জলপথ কীভাবে ‘কৌশলগত অস্ত্র’ হয়ে উঠতে পারে, হরমুজ প্রণালি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে এরই মধ্যে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রণালির উভয় পাশে আটকা পড়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী দেড় শতাধিক জাহাজ ও ট্যাংকার।

আক্রান্ত হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হবে—ইরান বারবার এমন হুঁশিয়ারি দিলেও গতকাল রোববার পর্যন্ত তা কার্যকর করেনি। আল-জাজিরাকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘এই মুহূর্তে এই জলপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটে’, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা ইরানের নেই।

তবে এর আগে গত শনিবার রাতে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। ওই এলাকায় থাকা জাহাজগুলো বারবার ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) একটি বার্তা পাচ্ছে। বার্তায় বলা হচ্ছে, কৌশলগত এই প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নৌ মিশনের একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একই কথা বলেন।

এদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজ কোম্পানি মায়ার্সক গতকাল ‘নিরাপত্তা’র কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তাদের কার্গো জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। অনলাইন নির্দেশনায় ডেনমার্কের কোম্পানিটি জানায়, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আমরা হরমুজ প্রণালিতে আমাদের সব জাহাজের যাতায়াত স্থগিত রাখছি।’

হরমুজ প্রণালি এলাকায় গতকাল পর্যন্ত অন্তত তিনটি জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার খবর জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্যবিষয়ক সংস্থা ইউকেএমটিও।

হরমুজ প্রণালি কোথায়

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনারে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এই প্রণালির পূর্ব পাশে ইরান এবং পশ্চিম পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) অবস্থিত। প্রণালির উত্তর দিকে পারস্য উপসাগর। দক্ষিণে ওমান উপসাগর। অর্থাৎ প্রণালিটি এই দুই উপসাগরকে যুক্ত করেছে। ওমান উপসাগরের দক্ষিণে আরব সাগর। আরব সাগর থেকে ভারত মহাসাগর বা বঙ্গোপসাগর যেকোনো দিকে যাওয়া যায়।

হরমুজ প্রণালির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৬ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ১৫৪ থেকে ১৬৭ কিলোমিটার। সবচেয়ে সংকীর্ণ বা সরু অংশে প্রণালি প্রশস্ত মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। তবে এখানে জাহাজ চলাচলের মূল পথটি (শিপিং লেন) উভয় দিকে মাত্র তিন কিলোমিটার চওড়া। ফলে সরু কিন্তু গভীর এই পথে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ প্রণালির বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ইরান। প্রণালির আশপাশে দেশটি বিপুল  নৌ-শক্তি মোতায়েন করেছে।

ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপের অদূরে হামলার শিকার হওয়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত একটি তেলবাহী ট্যাংকার থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ১ মার্চ, ২০২৬

কী পরিমাণ তেল ও গ্যাস যায়

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাবমতে, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে। বার্ষিক বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে যার মূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলার।

এই প্রণালির মাধ্যমে প্রধানত ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল ও এলএনজি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করা হয়।

ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট এলএনজি চালানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যার  বেশির ভাগ এসেছে কাতার থেকে।

ইআইএ বলছে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে যায়। এ ছাড়া এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ এলএনজি পরিবহন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের মতে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনের পথ।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাচ্ছে একটি তেলবাহী ট্যাংকার। ২১ ডিসেম্বর ২০১৮

এসব জ্বালানি কোথায় যায়

এই প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাসের রপ্তানি ও আমদানি হয়ে থাকে। যেমন কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশ থেকে এই প্রণালি দিয়ে জ্বালানি আমদানি করে।

ইআইএর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হওয়া অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উপজাতের (কনডেনসেট) ৮৪ শতাংশ গেছে এশিয়ার বাজারে। এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত এলএনজির ৮৩ শতাংশও গেছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।

গত বছর এই পথ দিয়ে মোট তেল ও কনডেনসেটের ৬৯ শতাংশ এশিয়ার চার দেশ—চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যায়। তাই বলতে গেলে এসব দেশের কলকারখানা, পরিবহনব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক গ্রিড পুরোপুরি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে চীন, ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ শতাংশ বেড়ে ৮০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সংঘাত অব্যাহত থাকলে তা দ্রুত ১০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও এলএনজি রপ্তানিনির্ভর সব দেশে এর প্রভাব পড়বে। হু হু করে মূল্যস্ফীতির হার বাড়বে।