
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের উপায় নিয়ে ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ ৩ এপ্রিল ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাময়িকীতে লিখেছেন। পাঠকদের জন্য লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে এই যুদ্ধের সূচনা ইরান করেনি। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর এক মাসের বেশি সময় পর স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান এতে জয়লাভ করছে। সরকারের পতন ঘটানোর আশায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের ভূখণ্ডে অবিরাম বোমা হামলা চালিয়েছে; কেড়ে নিয়েছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ এবং ধ্বংস করেছে শত শত ভবন। তা সত্ত্বেও ইরান নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং সফলভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছে।
ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা গুপ্তহত্যার শিকার হওয়ার পরও তাঁরা নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। সামরিক–বেসামরিক ও শিল্প স্থাপনায় হামলার পরও হামলাকারীদের ওপর বারবার পাল্টা আঘাত হেনেছে। ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলিরা যুদ্ধ শুরু করে এখন এমন এক চোরাবালিতে আটকে গেছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো কৌশল তাদের জানা নেই। অন্যদিকে ইরানিরা প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
কিছু ইরানির মতে, আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার পথ খোঁজার বদলে হামলাকারীদের যথোপযুক্ত শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এই সাফল্যের একটি বড় কারণ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতি রাতে দেশের নানা প্রান্তে অগণিত গর্বিত ইরানি জড়ো হচ্ছেন। ‘কোনো আত্মসমর্পণ নয়, কোনো আপস নয়, আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়ো’—এমন স্লোগান দিয়ে তাঁরা নিজেদের অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে, আলোচনায় তাদের বিশ্বাস করা যায় না। তারা ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে না। এই যুক্তিতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপস করার বা তাদের পিছু হটার সুযোগ দেওয়ার কোনো কারণ নেই । বরং ওয়াশিংটন তাদের আঞ্চলিক উপস্থিতি ও অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তন না আনা পর্যন্ত তেহরানের উচিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখা।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মনস্তাত্ত্বিকভাবে তৃপ্তিদায়ক মনে হলেও এটি কেবল বেসামরিক মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর আরও ধ্বংসই ডেকে আনবে। নিজেদের উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে এসব পক্ষ মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ, জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি তারা সাধারণ নাগরিকদেরও নির্বিচারে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
এই যুদ্ধ–সংঘাত ধীরে ধীরে আরও অনেক দেশকে টেনে আনছে, যা একটি আঞ্চলিক সংঘাতকে বৈশ্বিক সংঘাতে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। দুঃখজনকভাবে, যুদ্ধের প্রথম দিনে শিশু মেয়েদের স্কুলে মার্কিন হামলায় ১৭০ জন নিহত হয়েছে। ওয়াশিংটনের অসংখ্য নৃশংসতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রেখেছে।
অতএব, তেহরানের উচিত তাদের এই সুবিধাজনক অবস্থানকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কাজে না লাগিয়ে, বরং নিজেদের বিজয় ঘোষণা করে এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ব্যবহার করা, যা বর্তমান সংঘাতের অবসান ঘটাবে ও ভবিষ্যতের সংঘাত প্রতিরোধ করবে। সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আনা এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া এবং এমন একটি চুক্তি করা উচিত যা ওয়াশিংটন আগে গ্রহণ করত না, কিন্তু এখন হয়তো করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশেরই ভবিষ্যতে একে অপরের ওপর হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পারস্পরিক অনাক্রমণ চুক্তি গ্রহণে প্রস্তুত থাকা উচিত। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রস্তাবও থাকতে পারে, যা মার্কিন ও ইরানি—দুই দেশের জনগণের জন্যই লাভজনক হবে। এসব পদক্ষেপের ফলে ইরানি কর্মকর্তারা বিদেশি শত্রুদের হাত থেকে দেশকে রক্ষার চেয়ে অভ্যন্তরীণভাবে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। অন্য কথায়, তেহরান ইরানিদের প্রাপ্য নতুন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দুর্বল অবস্থানের কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক—আলোচনা নিয়ে ক্রমাগত পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। বুধবার এক ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে নিতে বোমাবর্ষণের হুমকি দিয়ে সব ইরানিকে একযোগে অপমান করেছেন। আবার একই সঙ্গে তিনি বারবার যেমনটা করে আসছেন, তেমনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—ওয়াশিংটনের সামরিক অভিযান শেষ হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি।
কিন্তু হোয়াইট হাউস স্পষ্টতই উদ্বিগ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের ফলে জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিকল্পনাটি ট্রাম্পকে সময়োপযোগী একটি প্রস্থানের পথ দিতে পারে। বস্তুত এটি তাঁর বিশাল ভুল হিসাব-নিকাশকে শান্তির জন্য দীর্ঘস্থায়ী এক বিজয় হিসেবে দাবি করার সুযোগে পরিণত করতে পারে।
ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের এখনকার আগ্রাসনের জন্য যে এই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা নয়। নতুন শতাব্দীর শুরু থেকে ইরান এবং দেশটির জনগণ বারবারই মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রতারণার শিকার হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর আফগানিস্তানে আল-কায়েদার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে মার্কিন সরকার। ওই সময় আল–কায়েদাবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছিল ইরান। শুধু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের জন্য এ সহযোগিতা দেওয়া হয়েছিল। প্রতিদানে বুশ তেহরানকে তাঁর ‘শত্রুপক্ষের তালিকায়’ যুক্ত করে হামলার হুমকি দেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন ২০১৫ সালে ইরানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও পারমাণবিক চুক্তি করেছিল। তবে তেহরান চুক্তির শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসন তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরানের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কাজ করেনি।
ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চললেও তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সেই চুক্তি বাতিল করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। বরং ট্রাম্প ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের এক নির্মম নীতি অনুসরণ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ৯ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পরও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতি অব্যাহত থাকে। অথচ বাইডেন কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরলে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে। হোয়াইট হাউস নতুন চুক্তির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলে ইরান আলোচনার জন্য তাদের সবচেয়ে দক্ষ কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের পাঠায়। তবে ট্রাম্প দ্রুতই প্রমাণ করেন, তিনি বিষয়টিকে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অভিজ্ঞ দূতের বদলে তিনি জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের মতো আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দুই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে আলোচনার জন্য পাঠান।
অথচ ভূরাজনীতি বা পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে তাঁদের বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইরানের উদার প্রস্তাবগুলো বুঝতে তাঁরা ব্যর্থ হলেন। তখন হোয়াইট হাউস ইরানি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক সশস্ত্র হামলা শুরু করল।
এ কারণে ইরানি জনগণের একটা বড় অংশ মনে করেন, আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রতিরোধ ও চাপ তৈরির পরিবর্তে কূটনীতির মাধ্যমে এই যুদ্ধ শেষ করার যেকোনো আলোচনাই বৃথা।
বারবার প্রতারণা করা মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে ইরানিদের তেমন একটা আগ্রহ নেই। ইরানিদের এমন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণের কারণ বুঝতে পারছি। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র শেষ পর্যন্ত যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারলে বেশি লাভবান হবে।
শত্রুতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু মূল্যবান জীবন নষ্ট করবে এবং অপূরণীয় সম্পদের আরও বেশি ক্ষতি করবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে, তখন বিদ্যমান অচলাবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।
প্রতিশোধ হিসেবে এই অঞ্চলের অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের থাকলেও, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আসে–যায় না বললেই চলে। কারণ, তারা এই অঞ্চলে তাদের তথাকথিত আরব মিত্রদের কেবলই ইসরায়েলকে রক্ষার ঢাল হিসেবে বিবেচনা করে।
আর এই অঞ্চলের অবকাঠামো ধ্বংস হলেই যে ইরানের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে, তা নয়। লড়াই চালিয়ে গেলে তা হয়তো মার্কিন স্থল অভিযানেরও জন্ম দিতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা বেপরোয়া এক পদক্ষেপ হবে, যা ওয়াশিংটনকে আরও গভীর চোরাবালিতে ঠেলে দেবে।
তবে স্থল অভিযান ইরানের জন্যও খুব একটা লাভজনক কিছু হবে না। শেষ পর্যন্ত দুপক্ষ কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আগেই যদি যুক্তরাষ্ট্র তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যায়, তবে ওয়াশিংটনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের সব সুফল ইরান ঘরে তুলতে পারবে না।
যদি দুপক্ষ আলোচনার পথ বেছে নিতে পারে, তবে তারা দুটি সম্ভাব্য ফলাফলের যেকোনো একটি নিয়ে এগোতে পারে। প্রথমত, একটি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সর্বোৎকৃষ্ট পথ বলে মনে হতে পারে। এটি অবশ্যই সবচেয়ে কম বাধাবিপত্তির পথ।
তবে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি পেতে হলে তেহরান, ওয়াশিংটন ও তাদের মিত্রদের শুধু অস্ত্র নামিয়ে রাখলেই হবে না। মৌলিক মতবিরোধগুলোর কোনো সুরাহা না হলে দুই রাষ্ট্র একে অপরের প্রতি গভীরভাবে সন্দিহান ও সংশয়ী থেকে যাবে। তাই আবারও গোলাগুলি শুরু হতে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হবে না।
আর তাই কর্মকর্তাদের উচিত দ্বিতীয় ফলাফলের দিকে লক্ষ্য স্থির করা। আর তা হচ্ছে একটি সামগ্রিক শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো। অন্যভাবে বললে, এই বিপর্যয়কে তাদের ৪৭ বছরের বৈরিতার অবসান ঘটানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
বর্তমান যুদ্ধ যত ভয়াবহই হোক না কেন, তা এই ধরনের একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কাজকে সহজ করে তুলতে পারে। কারণ, এ সংঘাত পশ্চিম এশিয়া সম্পর্কে এমন কিছু সত্যকে উন্মোচন করেছে, যা তেহরান এবং ওয়াশিংটন উপেক্ষা করতে পারে না। শুরুতেই এটি দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করতে অক্ষম। এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে এবং পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের আর্থিক ও সরঞ্জামগত সহায়তা নিয়ে কাজ করার পরও তাদের সে সক্ষমতা নেই।
এসব কর্মসূচি এতটাই সুপ্রতিষ্ঠিত এবং এতটাই ছড়ানো-ছিটানো যে বোমা মেরে এগুলো ধ্বংস করা সম্ভব নয়। পারমাণবিক ক্ষেত্রে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলা উল্টো এই বিতর্কেরই জন্ম দিয়েছে, ইরানের আসলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বের হয়ে আসা এবং তাদের অস্ত্র বিস্তার রোধ নীতি পরিবর্তন করা উচিত কি না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এটাও একেবারে স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইরানের আঞ্চলিক সহযোগীদের নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ (প্রতিরোধের অক্ষ)—এর পতনের খবরটি চরম অতিরঞ্জিত ছিল। উল্টো এই আগ্রাসন গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণজুড়ে, ইউরোপের কিছু অংশে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। সেখানে ট্রাম্পের মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (এমএজিএ) প্রচারের কিছু সমর্থক তাঁর ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’ নীতি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে বা তাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা কিনে নেওয়ার চেষ্টা এই অঞ্চলের জন্য একটি ব্যর্থ কৌশল। বছরের পর বছর ধরে আরব দেশগুলো বিশ্বাস করত, তারা তাদের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।
ইরান বারবার আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তাব দিলেও তারা সেগুলোর বেশির ভাগই উপেক্ষা বা প্রত্যাখ্যান করেছে। ১৯৮৫ সালে (জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজোল্যুশন ৫৯৮-এ অন্তর্ভুক্ত) পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তাব থেকে শুরু করে, ২০১৫ সালের অনাক্রমণ চুক্তির প্রস্তাব এবং ২০১৯ সালের ‘হরমুজ শান্তি উদ্যোগ’—কোনোটিই আরব দেশগুলো গ্রহণ করেনি।
আরব রাষ্ট্রগুলো ভেবেছিল, এ ধরনের প্রস্তাব অপ্রয়োজনীয়। কারণ, বিপদের সময় মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে নিতে এবং আঞ্চলিক সংঘাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
কিন্তু এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মৌখিক—এমনকি কারও কারও গুরুতর আপত্তি সত্ত্বেও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে বোমাবর্ষণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই অভিযান চালানোর জন্য তাদের ভূখণ্ডে থাকা ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে। যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে এটা আগে থেকে বুঝতে পারা উচিত ছিল, এর পরিণামে আরব দেশগুলো যুদ্ধের রঙ্গমঞ্চে পরিণত হবে। অথচ ঠিক এটাই তারা এড়াতে চেয়েছিল।
যুদ্ধের এ ফলাফল তেহরানের নিজের ও আঞ্চলিক ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোকে বৈধতা দেয়।
তবে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেলেও ইরানকেও এ যুদ্ধ থেকে একটি শিক্ষা নিতে হবে। তাদের অবশ্যই মেনে নিতে হবে, তাদের পারমাণবিক প্রযুক্তি আগ্রাসন প্রতিহত করতে পারেনি। উল্টো এটি ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার অজুহাত হিসেবে কাজ করেছে।
এসব বাস্তবতার অর্থ হচ্ছে, যেকোনো মীমাংসার ক্ষেত্রে পারস্পরিক আদান-প্রদান বা ছাড় দেওয়ার মানসিকতাই হবে মূল চাবিকাঠি, এমনকি প্রাথমিক পর্যায়েও। উদাহরণস্বরূপ, শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু করতে পশ্চিম এশিয়ার সব পক্ষকে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই বন্ধে একমত হতে হবে।
ওমানের সহযোগিতায় ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদেরও ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে দিতে হবে।
ভৌগোলিক দিক দিয়ে সবচেয়ে পরিহাসের বিষয় হলো, ইরানের ভূখণ্ডের সীমান্তবর্তী হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বছরের পর বছর ধরে ইরানের জন্য বন্ধ রয়েছে।
এর ফলে ইরানের ভেতরে দুর্নীতি ভয়ংকর রূপ নিয়েছে এবং কিছু অকৃতজ্ঞ প্রতিবেশীর বিপুল মুনাফা লাভের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সুতরাং, একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে উপনীত হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ইরানের তেল ও তেল উপজাত পণ্যের অবাধ বিক্রি এবং সেখান থেকে পাওয়া আয়ের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অনুমতি দিতে হবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন এই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করবে, তখন তারা একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির রূপরেখা তৈরি শুরু করতে পারে। এই চুক্তির বেশির ভাগ অংশেই সম্ভবত পারমাণবিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। উদাহরণস্বরূপ, ইরানকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাইবে না এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সম্পূর্ণ মজুত ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনবে।
একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদের সব প্রস্তাব বাতিল করবে, একতরফা নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেবে এবং তাদের অংশীদারদেরও একই কাজ করতে উৎসাহিত করবে।
ইরানকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো বাধা বা বৈষম্য ছাড়াই সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দিতে হবে।
বিনিময়ে, ইরানের পার্লামেন্টকে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি অ্যাডিশনাল প্রটোকল’–কে অনুমোদন দিতে হবে, যাতে তাদের সব ধরনের পারমাণবিক অবকাঠামো স্থায়ীভাবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায় আসে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য আরও কঠোর শর্তের কথা বলেছিল। যেমন—শূন্য সমৃদ্ধকরণ। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা খুব ভালো করেই জানেন, এ ধরনের দাবি একেবারেই অবাস্তব। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে যা পেতে চাইছে, তা পাবে না। এমনকি বিনা উসকানিতে দুটি আগ্রাসনের যুদ্ধ শুরু করেও তারা সেটা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এসব সমঝোতা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সব পারমাণবিক বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে পারবে না। তবে বেশির ভাগ বিরোধ মিটিয়ে ফেলা সম্ভব এবং বাইরের দেশগুলো বাকি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সমাধানে সহায়তা করতে পারবে। যেমন—ইরানের ইউরেনিয়াম নিয়ে কী করা হবে। এ ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরান এবং পারস্য উপসাগরের আগ্রহী প্রতিবেশীদের জন্য একটি জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ সংস্থা স্থাপনে সাহায্য করতে পারে, যা পরে পশ্চিম এশিয়ার একমাত্র জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
ইরান তার সব সমৃদ্ধ উপাদান ও সরঞ্জাম সেই স্থানে স্থানান্তর করবে। শান্তি পরিকল্পনার আরেকটি আঞ্চলিক উপাদান হিসেবে বাহরাইন, ইরান, ইরাক, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মিলে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে অনাক্রমণ, সহযোগিতা ও নৌ–চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের আওতায় কাজ করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ চলাচলের জন্য ইরান ও ওমানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
শান্তিকে আরও সুসংহত করতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত পারস্পরিক লাভজনক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা শুরু করা।
উদাহরণস্বরূপ ইরান অবিলম্বে ক্রেতাদের কাছে তেল রপ্তানি সহজ করতে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানিসহ অন্যান্য তেল কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানাতে পারে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি ও উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িত প্রকল্পগুলোতে অংশীদার হতে পারে।
ওয়াশিংটনকেও ২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধে ইরানে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি পুনর্গঠনে অর্থায়ন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। সাধারণ নাগরিকদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দেওয়াও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা হয়তো এ ধরনের অর্থ দেওয়ার কথা শুনে পিছিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এটা না হলে, ইরানি কূটনীতিকেরা কোনো চুক্তি নিয়ে এগোতে পারবেন না। আর সম্ভবত এই ব্যয়বহুল ও অজনপ্রিয় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে ইরানের পুনর্গঠনে অর্থায়নের ব্যয় অনেক কমই হবে।
পরিশেষে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচিত একটি স্থায়ী অনাক্রমণ চুক্তি ঘোষণা ও তাতে স্বাক্ষর করা। চুক্তির মাধ্যমে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে।
এরপর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের ওপর চাপানো সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত বিভিন্ন তকমা বাতিল করবে।
দুই দেশ নিজ নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভাগে কাজ করার জন্য কূটনীতিক পাঠানো, কনস্যুলার পরিষেবা পুনরায় চালু এবং একে অপরের নাগরিকদের ওপর থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ খুঁজবে।
অবশ্য এই চুক্তিতে পৌঁছানো মোটেও সহজ হবে না। আলোচনার পুরোটা সময় ইরানিরা ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে সন্দিহান থাকবে।
অন্যদিকে ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তারা তেহরানকে সন্দেহের চোখেই দেখতে থাকবেন। চীন ও রাশিয়া, সম্ভবত আঞ্চলিক আরও কয়েকটি দেশ মিলে এই গুরুতর ও পারস্পরিক উদ্বেগগুলো দূর করতে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দিতে পারে।
এই যুদ্ধ—তা সে যতটা ভয়ানক হোক না কেন—এটি একটি টেকসই মীমাংসার দরজা উন্মুক্ত করেছে।
ইরানিরা ক্ষুব্ধ হতে পারে। তবে তারা এটা জেনে এগিয়ে যেতে পারে, দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের (ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা এখনো স্বীকার করেনি, তবে ধরা হয় তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে) ব্যাপক ও অবৈধ সামরিক হামলার মুখে তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
মার্কিন কর্মকর্তারা হয়তো এখনো ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে অপছন্দ করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা এখন বুঝতে পেরেছেন, সরকার কোথাও যাচ্ছে না এবং তাদেরকে একে পাশে নিয়েই চলতে হবে।
আবেগ হয়তো তুঙ্গে থাকতে পারে এবং প্রতিটি পক্ষই যুদ্ধের ময়দানে অর্জিত নিজেদের সাফল্য নিয়ে বড়াই করতে পারে। কিন্তু দিনশেষে যাঁরা শান্তি স্থাপন করেন, ইতিহাস সব সময় তাদেরই সবচেয়ে ভালোভাবে মনে রাখে।
এম জাভেদ জারিফ। ইরানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি। বর্তমানে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক।