
পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ ও দেশটির প্রধানমন্ত্রীর ইনস্টিটিউশনাল রিফর্মস অ্যান্ড অস্টারিটি উপদেষ্টা ইশরাত হুসাইন বলেছেন, বাংলাদেশ বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছে। একসময় সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বা ‘বাস্কেট কেস’ বলেছিলেন। অথচ সেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল।
দ্য ডনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইশরাত হুসাইন বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় আয় বেড়েছে ৫০ গুণ আর মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২৫ গুণ, যা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। দেশটির খাদ্য উৎপাদনও বেড়েছে চার গুণ। রপ্তানি বেড়েছে শতগুণ। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে ৬০ শতাংশ দারিদ্র্য ছিল। তা কমে এখন ২০ শতাংশে নেমেছে। গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে। অধিকাংশ সামাজিক সূচক শ্রীলঙ্কা ছাড়া আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় বেশ ভালো। দেশটির মানব উন্নয়ন সূচকের মান বেড়েছে ৬০ শতাংশ।
ইশরাত হুসাইন কর্মসূত্রে বাংলাদেশের পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ছিলেন। তিনি বাংলায় কথা বলতে পারেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বেশির ভাগ উন্নয়ন অর্জিত হয়েছে গত তিন দশকে। এর আগের দুই দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান ছিল।
এ সময়ে এতটাই অগ্রগতি হয়েছে যে ১৯৯০ সালে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ ছিল। কিন্তু আজ পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় কমে মাত্র সাত-দশমাংশে নেমে এসেছে। ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে (কোভিড পরিস্থিতির আগে) বাংলাদেশের গড় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ ও ৮ শতাংশ ছিল, যা পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
ইশরাত হুসাইন বলেন, বাংলাদেশের গল্পটি খুবই আকর্ষণীয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত একটি দেশ কীভাবে তার চেয়ে অনেক বড় ও উন্নত প্রতিবেশী দেশ—ভারত ও পাকিস্তানের অধিকাংশ আর্থসামাজিক সূচককে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ একটা কঠিন সময় পার করেছে। নতুন দেশের জন্য নতুন প্রশাসন গঠন, বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের হত্যাকাণ্ড এবং বেশ কয়েকটি বাতিল ও সফল সামরিক অভ্যুত্থান মোকাবিলা করতে হয়েছে দেশটিকে। দেশটিতে সামরিক বাহিনী ১৯৯১ সাল (প্রকৃত ১৯৭৫-১৯৯০) পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। তখন জেনারেল এরশাদ দেশটির সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর পর থেকে দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দল—শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে শুরু করে।
২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ টানা তিনবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসীন। এ সময়ে খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জন করেন। তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা গ্রেপ্তার হন। তাঁকেও কারাগারে যেতে হয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে যেভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তা সত্যিই আকর্ষণীয়।
এর কারণ হিসেবে বলা যায়—প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের বিপরীতে বাংলাদেশ একই ভাষা, জাতিসত্তা এবং ইতিহাসের অংশীদারত্বের সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে এক। দেশটিতে কার্যত কোনো ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক ও সামন্ত বিভাজন নেই। দেশটিতে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিভাজন রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন অসন্তোষ না থাকায় বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পেরেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো মারাত্মক বাহ্যিক হুমকিও নেই।
দ্বিতীয়ত, দেশটির সরকারের একক রূপ কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, আইনি ও আর্থিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিয়েছে। এতে কারও কোনো হস্তক্ষেপ নেই। নীতি ও এর বাস্তবায়ন একটি নির্দিষ্ট চেইন অব কমান্ড অনুসরণ করে। একটি দুর্বল বিরোধী দলের কারণে ক্ষমতাসীন দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নিজেদের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছে। এতে আমলাদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তৃতীয়ত, ১৯৭১ সালের আগেও নারীর ক্ষমতায়ন প্রবল ছিল। পরিবার পরিকল্পনা, নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে সব স্তরে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) সঙ্গে দেশটির সরকার অব্যাহতভাবে প্রচারাভিযানে অংশ নেয়। ব্র্যাক, গ্রামীণ, আশার মতো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধা দেওয়া এবং নারীদের ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সংকটের কথা ভেবে সরকার সুশীল সমাজের সংস্থাগুলোকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে এবং এনজিওকে স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে। দেশে নারীদের কাজে অংশগ্রহণ ও লিঙ্গবৈষম্যের হার কমেছে।
চতুর্থত, তিক্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক নীতি, প্রকল্প ও কর্মসূচিতে দেশটির ধারাবাহিকতা রয়েছে। কোনো দল মূল জায়গা—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব বিচক্ষণতা, মুক্তবাণিজ্য, বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা এবং সামাজিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হয়নি।
পঞ্চমত, বাণিজ্য উদারকরণ, মুক্তবাজার, বিদেশি প্রযুক্তি আনা এবং রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা প্রদানে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনের ঠিক পেছনে থেকেও সফল বাংলাদেশ। বিশ্বের নামকরা অনেক ব্র্যান্ডের পোশাক বাংলাদেশেই তৈরি হয়। পোশাকশিল্প খাতে নারীর কর্মসংস্থান তাদের সামাজিক মর্যাদা ও পরিবারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলেছে। তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে।
ষষ্ঠত, টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছিল যখন দেশীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হার ১৫ থেকে ৩০ শতাংশে দ্বিগুণ হয়। ক্রমবর্ধমান সামগ্রিক চাহিদার কারণে দেশটি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে আয় করছে। এ কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
ইশরাত হুসাইন বলেন, ‘এ দেশ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত অবস্থানের চেয়ে কর্মক্ষমতা, জনপ্রিয়তা ও দলের রেকর্ড বেশি গুরুত্ব পায়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেভাবেই হয়। বেসরকারি খাত, রাজনীতিক ও আমলাদের মধ্যে স্থিতিশীল ভারসাম্য রয়েছে। রাজনীতিকেরা নির্বাচনী প্রচারের জন্য ব্যবসা থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন, আমলারা তাঁদের অল্প বেতনকে উপহার ও পারিশ্রমিক দিয়ে পরিপূরক করেন এবং ব্যবসায়ীরা শ্রম ও পরিবেশের মাধ্যমে ব্যবসার প্রসার ঘটান। তাঁরা টাকা বিদেশে নিয়ে যাননি।’
ট্যাক্স-টু-জিডিপির হার এখনো ৮ থেকে ৯ শতাংশে আছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, রপ্তানি উন্নয়ন, মানব পুঁজিতে বিনিয়োগ (বিশেষত নারী) এবং সরকারি–বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করায় বাংলাদেশ এ সফলতা পেয়েছে।