২২ মানেই জাদুকর ইমরান!

ইমরান খান। ছবি: এএফপি
ইমরান খান। ছবি: এএফপি

রাজনীতিতে আসার আগে ক্রিকেট পিচের ২২ গজে ভালোই ছড়ি ঘুরিয়েছেন ইমরান খান। ক্রিকেটের সংজ্ঞায় তিনি ছিলেন অলরাউন্ডার। নিজের অলরাউন্ডার নৈপুণ্যকে আরও ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতেই হয়তো বিশ্বকাপ জয়ের চার বছরের মধ্যেই রাজনীতির মাঠেও নামেন। এবার পাকিস্তানের ২২ তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারপ্রধানের চেয়ারে বসলেন তিনি। সময় লেগেছে কত? গুণে গুণে ২২টি বছর!

‘বাইশ’ যেন ইমরান খানের জাদুকরী সংখ্যা। ১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) গঠন করেন তিনি। ২২ বছর পর শপথ নিলেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ১৯৭৪ সালে ওয়ানডে অভিষেকের পর বিশ্বকাপ জিততেও এত সময় লাগেনি ইমরানের।

নিন্দুকদের প্রশ্ন, ইমরান কি আরেকটি ‘২২’ পাবেন? সেটি হলো ২০২২ সাল। তত দিন পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কিনা—তা নিয়ে এখনই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ দেশটির কোনো প্রধানমন্ত্রীই এখন পর্যন্ত নির্ধারিত পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পূর্ণ করতে পারেননি। ক্ষমতা থেকে নওয়াজ শরিফের সরে যাওয়ার স্মৃতি তো টাটকাই আছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৩ সালে দেশটির ১৬ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা।

রাজনীতির মাঠে শুরুতে ইমরান খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। বার্তা সংস্থা এএফপি জানাচ্ছে, ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত তাঁর দল সংসদে কোনো আসন লাভ করেনি। ২০০২ সালের নির্বাচনে ইমরানই প্রথম ব্যক্তি যিনি পিটিআইর প্রার্থী হিসেবে জয়ের দেখা পান। আবার ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন তাঁর দল বর্জন করেছিল।

কিন্তু ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইমরানের দল উঠেপড়ে লাগে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওই নির্বাচনে অল্পের জন্য পিটিআই দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। তবে এবার হয়ে গেছে একেবারে প্রথম। গত ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ১৫ তম নির্বাচন। এতে তাঁর দল পিটিআই ২৭২ টির মধ্যে ১১৭টি আসন পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে। যদিও কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক এতে সামরিক উর্দিধারীদের ক্যারিশমাই দেখছেন।

রাজনীতির মাঠে ইমরান কীভাবে এগিয়ে গেলেন? সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে রাজনীতিতে এগোনোর জন্য ক্রিকেটার হিসেবে নিজের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েছেন ইমরান। এতে তাঁর ক্রিকেট জীবনের ‘প্লেবয় ইমেজ’ও সাহায্য করেছে। এর সঙ্গে ছিল দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ডাক। এভাবেই তিনি তরুণদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

রাজনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, চতুর ইমরান ভোটারদের আকৃষ্ট করতে কিছু পরস্পরবিরোধী কৌশল নিয়েছেন। এবং সেগুলো কাজেও দিয়েছে। এক সময় নিজে পশ্চিমা ঘেঁষা জীবনযাপন করলেও, কখনো তিনি অতিমাত্রায় রক্ষণশীল হয়ে উঠেছেন। পশ্চিমা ধ্যানধারণার কঠোর সমালোচনাও করেছেন। আবার সন্ত্রাসবাদবিরোধী প্রচারণায় যেমন অংশ নিয়েছেন, তেমনি তালেবান তথা দেশটির কট্টরপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। এককথায় যেদিকে বৃষ্টি ঝরেছে, সেদিকেই ছাতা ধরেছেন তিনি।

পাকিস্তানের আধ্যাত্মিক নেতাদের ভক্ত কূলের আশীর্বাদ পেতেও ইমরান কৌশল নিয়েছেন। সর্বশেষ তিনি যে নারীকে বিয়ে করেছেন—সেই বুশরা মানেকা আধ্যাত্মিক গুরু বলে পরিচিত। ভোটের আগমুহূর্তের এই বিয়ে ইমরানের পক্ষেই গিয়েছে।

দেশের ভেতরে ইমরানের মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যবিত্ত ও অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্ম। যেমন, তিনি প্রচারণা চালান দুর্নীতি ও রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, পরিবারতন্ত্রের বাইরে গিয়ে পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। সর্বোপরি ইমরান এমন একটি পাকিস্তান গড়ার প্রতিশ্রুতি দিতে থাকেন যেখানে মুদ্রা, পানি ও বিদ্যুতের কোনো সংকট থাকবে না।

দুর্নীতিবিরোধী স্লোগানও ছেড়ে দেননি ইমরান খান। ব্যবহার করেছেন সুবিধা অনুযায়ী। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নওয়াজ শরিফ ও তাঁর মেয়ের নাম জড়ানোয় পোয়াবারো হয় তাঁর। ফলে ইমরানের ক্ষমতায় আসার প্রধান বাধা পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এক ধরনের ফাঁদে পড়ে যায়। অন্যদিকে ইমরানের বিরুদ্ধে মাথা তুলতে পারেনি পাকিস্তান পিপলস পার্টিও (পিপিপি)। কারণ সেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও আছে দুর্নীতির অভিযোগ।

সব জল্পনা-কল্পনা শেষে ইমরানই বসে গেছেন পাকিস্তানের নয়া প্রধানমন্ত্রীর আসনে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তিনি কত দিন সহাবস্থান করতে পারবেন-এটিই মূল শঙ্কা। আর অন্যান্য সংকট তো আছেই। সব বাউন্সার সামলে ইমরান নিখুঁত হুক শটে ছক্কা পেটাতে পারবেন কিনা, তার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ কে না জানে, ক্রিকেটের ২২ গজের চেয়ে রাজনীতির মাঠ ঢের অনিশ্চিত। আর দেশটির নাম পাকিস্তান হলে তো কথাই নেই!