ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের একটি ছোট কিন্তু শক্তিশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে দেশটির ক্ষমতার লাগাম নিজেদের হাতে ধরে রেখেছে। রাজনৈতিকভাবে তাদের একদল বিশ্বস্ত অনুসারী রয়েছে। সেই সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর এক বড় অংশের সমর্থনও।
এমনকি মার্কিন বাহিনী সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরও দেশটিতে শক্তিশালী ওই গোষ্ঠী ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়ে গেছে।
ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতাশালী এ গোষ্ঠীতে কে কে আছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন কর্মকর্তাই–বা ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন? এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
দেলসি রদ্রিগেজ
মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এখন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট। ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ৬ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি শপথ নেন। যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে দেলসি রদ্রিগেজ এখন দেশ পরিচালনা করছেন।
রদ্রিগেজ একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে যুক্ত ও দলীয় প্রভাবশালী নেতা হিসেবে কাজ করছেন তিনি। ভাইস প্রেসিডেন্ট, তেলমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রভাবশালী এই নারী ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে ‘সারিনা’ নামে পরিচিত।
মাদুরো সরকারের অংশ হওয়ার কারণে দেলসি যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন; তবে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রশাসন তাঁর ওপরই ভরসা করছে।
মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিরা দেলসিকে ভেনেজুয়েলার ক্ষয়িষ্ণু জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনে তাঁদের সঙ্গে কাজ করার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে দেখছেন।
ভেনেজুয়েলার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করা নিশ্চিত করতে রুবিও নিজেই সরাসরি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
জর্জ রদ্রিগেজ
জর্জ রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসির ভাই। জর্জ ২০২১ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; যেখানে মাদুরোর দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা (পিএসইউভি) এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ।
জর্জ রদ্রিগেজ দীর্ঘদিন ধরে মাদুরো সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করেছেন। তিনি অতীতে নির্বাচনের শর্ত নির্ধারণ এবং বন্দী মুক্তির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ওয়াশিংটন ও কারাকাসের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, বিদেশি সরকারগুলোর কাছে জর্জ রদ্রিগেজ ও তাঁর বোন দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তিসংগত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হন।
আশা করা হচ্ছে, জর্জ রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলায় তেল আইন সংশোধনের উদ্যোগে নেতৃত্ব দেবেন; যাতে আরও বিদেশি কোম্পানি দেশটিতে কার্যক্রম চালাতে পারে।
দিওসদাদো কাবেলো
দিওসদাদো কাবেলো ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোকে নিয়ে চিন্তিত। তাঁকে ভয় করার কারণ রয়েছে। কাবেলো ভেনেজুয়েলার মিলিটারি কাউন্টার-ইনটেলিজেন্স এজেন্সি (ডিজিসিআইএম) ও কথিত মোটরসাইকেল বাহিনী ‘কালেক্টিভোস’–এর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। মাদুরোর দলের সঙ্গে এ মোটরসাইকেল বাহিনীর যোগসূত্র রয়েছে। বিরোধী সমর্থকদের দমন ও ভয় দেখাতে কালেক্টিভোসকে ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
কাবেলোকে ভেনেজুয়েলায় বিরোধীদের ওপর দমনমূলক কার্যক্রমের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দেখা হয়। একই সঙ্গে তাঁকে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের আদর্শভিত্তিক রাজনীতি ‘চাভেজমো’–এর প্রধান প্রতীকী নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়।
কাবেলোর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রে ‘নারকো–টেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসের অভিযোগে মামলা রয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পুরস্কারও ঘোষণা করা আছে। কাবেলো তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ওয়াশিংটন কাবেলোকে সতর্ক করে বলেছে, যদি তিনি দেলসি রদ্রিগেজকে সহযোগিতা না করেন, তবে তিনি গ্রেপ্তারের পরবর্তী নিশানা হতে পারেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, মাদক পাচার করছে সন্দেহে নৌযানের ওপর প্রাণঘাতী হামলা বা ঝোড়োগতিতে অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পেছনে হেগসেথ কলকাঠি নেড়েছেন বলে মনে করা হয়।
ভ্লাদিমির পাদ্রিনো
ভ্লাদিমির পাদ্রিনো ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, দেশটিতে রূপান্তরের এ সময়ে ক্ষমতার শূন্যতা এড়াতে পাদ্রিনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাদ্রিনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেলোর মতো কট্টরপন্থী নন। তিনি দেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। ধারণা করা হয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বেশি আগ্রহী হবেন, পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজের নিরাপদ প্রস্থানের পথও খুঁজবেন।
পাদ্রিনো ১১ বছর ধরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের মামলা রয়েছে এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা আছে।
মারিয়া কোরিনা মাচাদো
২০২৫ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনেজুয়েলার শীর্ষ বিরোধী নেতা। তিনি মাদুরো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কাজ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আছে। কয়েক মাস আগে পালিয়ে ভেনেজুয়েলার বাইরে চলে গেছেন তিনি।
মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিল, মাচাদোকে হয়তো ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার কেন্দ্রে দেখা যাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্প খোলাখুলিই বলেছেন, তিনি মাচাদোর দেশ পরিচালনার সক্ষমতায় ভরসা রাখতে পারছেন না।
মার্কো রুবিও
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবা বংশোদ্ভূত আমেরিকান। স্প্যানিশভাষী রুবিও দীর্ঘদিন ধরেই লাতিন আমেরিকা সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন। মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে বহুদিন ধরে কাজ করছেন তিনি। সামরিক অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি বলেছেন, পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে কিউবা সরকার।
ভেনেজুয়েলার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করা নিশ্চিত করতে রুবিও নিজেই সরাসরি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
জন র্যাটক্লিফ
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলা নিয়ে যাঁরা নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেই মূল দলের একজন র্যাটক্লিফ।
সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলেছে, মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা থেকে ধরে নিয়ে আসতে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক অভিযান চালিয়েছে; সেখানে সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
স্টিফেন মিলার
হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলারকে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির কারিগর বলা হয়। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলাসহ লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ট্রাম্পের এ কঠোর নীতির মূল লক্ষ্যবস্তু।
হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিলারের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসীদের গ্রেপ্তার ও নির্বাসন কার্যক্রম জোরদার করেছে। তিনি ‘বল প্রয়োগ করে’ হলেও বিশ্বজুড়ে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখার সমর্থক।
পিট হেগসেথ
মাদুরোকে ধরে নিয়ে আসাসহ বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, মাদক পাচার করছে সন্দেহে নৌযানের ওপর প্রাণঘাতী হামলা বা ঝোড়োগতিতে অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পেছনে হেগসেথ কলকাঠি নেড়েছেন বলে মনে করা হয়।
ক্রিস রাইট
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক জ্বালানি নীতি তিনিই নির্ধারণ করেন। ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প খাতের আকার ও বাণিজ্য কেমন হবে, তা নির্ধারণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর ওপর ভেনেজুয়েলার তেল খাত পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাইট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল খাতে কাজ করবে। ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলাকে চীনের ক্লায়েন্ট হতে দেবে না। তবে চীনের কাছে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি অব্যাহত রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।