যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি মোকাবিলার মতো সামরিক শক্তি কি লাতিন আমেরিকার আছে

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে গত শনিবার শেষ রাতে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। এ ঘটনা লাতিন আমেরিকাজুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছে।

এরপর গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী কয়েকটি দেশকে রীতিমতো নিকোলা মাদুরোর পরিণতি ভোগ করানোর হুমকি দেন। কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোর সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তারা যদি ‘নিজেদের ব্যবস্থা ঠিক না করে’, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, তিনি মাদক পাচার ঠেকাতে এবং পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় এসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে পুরোনো ও গভীর উত্তেজনাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্পের নিশানায় থাকা অঞ্চলটির অনেক দেশ ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য এমন ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিহত করার মতো সামরিক সক্ষমতা তাদের নেই।

লাতিন আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীই বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী। শক্তিমত্তায় নিজেদের পরে থাকা বাকি ১০টি সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সমন্বিত সামরিক বাজেটের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক সামরিক বাজেট বেশি। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল ৮৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ।

ট্রাম্পের দাবি, তিনি মাদক পাচার ঠেকাতে এবং পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় এসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

২০২৫ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচক অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আছে ব্রাজিলের। বৈশ্বিক তালিকায় দেশটির সামরিক বাহিনীর অবস্থান ১১তম।

সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বে মেক্সিকো ৩২তম, কলম্বিয়া ৪৬তম, ভেনেজুয়েলা ৫০তম এবং কিউবা ৬৭তম স্থানে রয়েছে। এসব দেশ সক্রিয় সেনার সংখ্যা, সামরিক বিমান, যুদ্ধ ট্যাংক, নৌবাহিনী ও সামরিক বাজেটসহ সব দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

যুদ্ধে সাধারণত ট্যাংক, বিমান ও নৌ শক্তি ব্যবহার করা হয়। এসব সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার সব দেশের তুলনায় স্পষ্টভাবে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোর প্রতি হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানে করে ফ্লোরিডা থেকে ওয়াশিংটনে আসার পথে, ৪ জানুয়ারি ২০২৬

লাতিন আমেরিকার উল্লিখিত দেশগুলো শুধু একটি সূচকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। তা হলো আধা সামরিক বাহিনী। এসব বাহিনী সাধারণত নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করে এবং প্রচলিত সামরিক কৌশলের মোকাবিলায় অসম ও অপ্রচলিত যুদ্ধ ও সামরিক কৌশল ব্যবহার করে।

লাতিন আমেরিকার আধা সামরিক বাহিনী

লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে আধা সামরিক বাহিনী ও একাধিক অনিয়মিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এসব শক্তি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় প্রায় সময় ভূমিকা রাখে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সাধারণত সুসংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তবে তারা নিয়মিত সামরিক বাহিনীর কমান্ডের বাইরে কাজ করে।

গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তথ্যমতে, কিউবার আধা সামরিক বাহিনী বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম। এর সদস্যসংখ্যা ১১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত মিলিশিয়া এবং পাড়া-মহল্লার প্রতিরক্ষা কমিটি আধা সামরিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত। এসব বাহিনীর মধ্যে ‘টেরিটোরিয়াল ট্রুপস মিলিশিয়া’ সবচেয়ে বড়। সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে গঠিত এই মিলিশিয়া সংরক্ষিত বাহিনী হিসেবে কাজ করে। বিদেশি হুমকি বা অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় নিয়মিত সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে।

ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে মার-আ-লাগো রিসোর্টে বসে সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাডক্লিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাশে বসিয়ে অভিযানের লাইভ স্ট্রিম দেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ভেনেজুয়েলায় সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে গঠিত সরকারপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মোর্চার নাম ‘কালেকটিভোস’। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও বিরোধীদের ভয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে মোর্চাটি আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর অংশ নয়।

তবে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, রাষ্ট্রের আশ্রয়ে তারা কার্যক্রম চালায় এবং প্রয়োজনে সরকারকে সহায়তা করে। বিশেষ করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোর্চাটি মাদুরো সরকারকে সহায়তা করেছে।

শক্তিমত্তায় নিজেদের পরে থাকা বাকি ১০টি সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সমন্বিত সামরিক বাজেটের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক সামরিক বাজেট বেশি।

কলম্বিয়ায় বামপন্থী বিদ্রোহীদের দমন করতে ১৯৮০-এর দশকে ডানপন্থী একাধিক গোষ্ঠী জন্ম নিয়েছিল। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব গোষ্ঠীর বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব গোষ্ঠীর কয়েকটি অপরাধী বা নতুন আধা সামরিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এসব গোষ্ঠী বা আধা সামরিক বাহিনী মূলত গ্রামাঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে।

কলম্বিয়ার শুরুর দিকের সশস্ত্র গোষ্ঠী বা মিলিশিয়াগুলো গত শতকের শীতল যুদ্ধের সময় দেশটির সেনাবাহিনীর সহায়তায় গঠিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্রোহ দমন পরামর্শকেরা দেশটির সেনাবাহিনীকে এসব গোষ্ঠী ও মিলিশিয়া গঠনে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা দিয়েছিল।

ভেনেজুয়েলায় হামলার পর কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোকে হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্র গত ২০০ বছরে লাতিন আমেরিকা তথা মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে অনেকগুলো সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে ১৮০০ সালের শেষ দিক থেকে বিশ শতকের শুরু পর্যন্ত মধ্য আমেরিকায় পরিচালিত অভিযানগুলো ‘বানানা ওয়ারস’ নামে পরিচিত। এ অঞ্চলে মার্কিন কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় এসব অভিযান চালানো হয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের আমলে ১৯৩৪ সালে ‘গুড নেইবার পলিসি’ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে দক্ষিণ বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে আক্রমণ কিংবা দখলদারি না চালানো ও তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের নির্বাচিত বামপন্থী নেতাদের উৎখাতের লক্ষ্যে অসংখ্য অভিযানে অর্থায়ন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ

ফাইল ছবি: এএফপিযুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযানের কিছু সফল হয়, আর কিছু ব্যর্থ হয়। এসব অভিযানের প্রায় সব কটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সমন্বয়ে পরিচালনা করা হয়েছিল। সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে।

লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে আধা সামরিক বাহিনী ও একাধিক অনিয়মিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এসব শক্তি দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় প্রায় সময় ভূমিকা রাখে।

তবে গত শনিবার ভেনেজুয়েলার আগে কেবল পানামায় আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা, অগণতান্ত্রিক শাসনের অবসান, দুর্নীতি ও অবৈধ মাদক ব্যবসা বন্ধের অজুহাতে ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযান চালিয়েছিল। অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন জাস্ট কজ’।
ওই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর অভিজাত বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’ অংশ নিয়েছিল। বাহিনীটি ভেনেজুয়েলার অভিযানেও অংশ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এ অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ অভিযানের মাধ্যমে পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল আন্তোনিও নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মাদক পাচার ও অন্যান্য অপরাধে তিনি দণ্ডিত হন। ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে আটক ছিলেন। ওই বছর আরেকটি মামলার বিচারকাজ চালানোর জন্য তাঁকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। এর এক বছর পর তাঁকে পানামায় ফেরত পাঠানো হয়। নিজ দেশে ২০১৯ সালে কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়।