
গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করা আর পানামা ক্যানেলে (পানামা খাল) মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন ট্রাম্প। এখন তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে উৎখাত করলেন। এরপর কোন দেশগুলো তাঁর নিশানা হতে যাচ্ছে?
‘একেবারে বুদ্ধিমানের কাজ’—ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে তখন ছিল উচ্ছ্বাস। সময়টা ছিল ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২। ভ্লাদিমির পুতিন কেবলই পূর্ব ইউক্রেনের কিছু অংশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং কথিত ‘শান্তিরক্ষী’ হিসেবে সেখানে রুশ সেনা পাঠিয়েছেন। পুতিনের পদক্ষেপে বেশ মুগ্ধ, এমনকি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সাবেক ও বর্তমান এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। অবচেতন মনে ট্রাম্প তখন বলে ফেলেন, ‘আমাদের দক্ষিণ সীমান্তেও আমরা এ কৌশল কাজে লাগাতে পারি।’
ট্রাম্প তখন জানতেন না যে তিনি একটি পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সূচনালগ্নে এ কথা বলছেন। যে আগ্রাসন প্রায় চার বছর ধরে চলছে এবং এখন পর্যন্ত ১৫ লাখের বেশি মানুষের হতাহতের কারণ হয়েছে এবং আরও হতাহত হচ্ছেন। একইভাবে ট্রাম্প এখন বুঝতে পারছেন না যে ভেনেজুয়েলায় তিনি আসলে কী শুরু করেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ ইউক্রেন নয়, এমনকি এটি আফগানিস্তান, ইরাক বা লিবিয়ার মতোও নয়। কিন্তু নিকোলা মাদুরোকে ধরার জন্য সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের একটি দেশকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি গত কয়েক দশকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা থেকে পাওয়া সবচেয়ে স্পষ্ট ও কষ্টার্জিত শিক্ষাটিকেও ছুড়ে ফেলেছেন; ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু জয়ী হওয়া কঠিন। আর একে প্রকৃত সাফল্যে রূপান্তর করা তো আরও দুরূহ।
এখন পর্যন্ত ট্রাম্প কেবল প্রথম পদক্ষেপটি নিয়েছেন বলা যায়। তিনি ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থাকে এখনো পতনের দ্বারপ্রান্তে আনতে পারেননি; বরং কেবল শীর্ষ ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে আসার মাধ্যমে এর মাথা ভেঙে দিয়েছেন মাত্র। যাহোক, যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া ভাষণে ট্রাম্পকে এক বিজয়ী বীরের ভূমিকায় দেখা গেছে। তিনি দীর্ঘক্ষণ তাঁর প্রদর্শিত ‘প্রচণ্ড সামরিক শক্তি’ নিয়ে বড়াই করেছেন, যেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এমন কোনো ‘অপারেশনাল ট্রায়াম্ফ’ বা আভিযানিক সাফল্য নেই, যা পরবর্তী সময়ে কৌশলগত বিপর্যয়ের পথ তৈরি করেনি। এ ক্ষেত্রে বাগদাদে চালানো চোখধাঁধানো সামরিক অভিযানের কথা স্মরণ করা যায়।
ট্রাম্পের কথা শুনলে মনে হতে পারে, কঠিন অংশটুকু বোধহয় শেষ হয়ে গেছে। এখন কেবল শান্তি, সমৃদ্ধি আর স্বাধীনতার শুরু। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমরা দেশটি চালাতে যাচ্ছি।’ আর তা করার জন্য ট্রাম্প দেশটিতে স্থলবাহিনী পাঠাতে আগ্রহী এবং দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলনে উন্মুখ। মাদুরো-পরবর্তী শাসনের জন্য ট্রাম্পের ‘প্ল্যান এ’ ছিল মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় রাখা। কারণ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মতো করে কাজ করতে সাহায্য করবেন। কিন্তু সেই ঘোষণার দুই ঘণ্টার মধ্যেই রদ্রিগেজ জোর দিয়ে বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার বৈধ নেতা। সেই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অবৈধ, সাম্রাজ্যবাদী দখলদার শক্তি হিসেবে অভিহিত করেন, যারা দেশটি লুণ্ঠন করতে চাইছে।
ভেনেজুয়েলায় পরবর্তী সময়ে যা-ই ঘটুক না কেন, এর পরিণতি কেবল দেশটিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই এ হামলার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য জাহির করতে চেয়েছেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নিয়ে আর কখনোই কোনো প্রশ্ন উঠবে না।’ গত মাসে প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ট্রাম্প প্রশাসন ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’–এর একটি ‘ট্রাম্প করোলেরি’ বা সংযোজন ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে আমেরিকা অঞ্চল থেকে যেকোনো ধরনের বাহ্যিক প্রভাব দূর করতে প্রয়োজনীয় যেকোনো উপায় অবলম্বনের অধিকার দাবি করা হয়েছে। প্রশাসন তাদের এ বহুল প্রচারিত নীতিটি কেবল প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। ট্রাম্প নিজের দেশের কাছাকাছি থাকা পক্ষগুলোকে, যেমন অভিবাসী, গ্যাং এবং মাদক কার্টেল (মাদক কারবারি গোষ্ঠীগুলো)—যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করতে পছন্দ করেন; যারা বাইরে থেকে দেশটিতে অনুপ্রবেশ করছে এবং ভেতর থেকে একে ধ্বংস করছে।
ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের এ হামলা ক্যারিবীয় অঞ্চলে কয়েক মাস ধরে স্পিডবোটে চালিয়ে আসা তাঁর হামলার মাধ্যমে কী ইঙ্গিত দিতে চেয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করেছে—যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের ক্লান্তিকর ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে’ কথিত ‘নারকো-টেরর’ বা মাদক-সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে রূপান্তর করছে। একসময় মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসীদের প্রতি যে শত্রুতা ছিল, তা এখন পশ্চিম গোলার্ধের আন্তসীমান্ত নানাবিধ হুমকির দিকে মোড় নিচ্ছে। এসব হুমকির বিষয়ে ট্রাম্পের সংজ্ঞায় এতটাই ফাঁকফোকর রয়েছে যে এর আওতায় তিনি যাঁদের বারবার ‘ভেতরের শত্রু’ বলে বর্ণনা করেছেন, তাঁরাও পড়েন। ভেনেজুয়েলা নিয়ে দেওয়া ভাষণের মাঝপথে ট্রাম্প হঠাৎ থেমে গিয়ে মার্কিন শহরগুলোতে টহল দেওয়ার জন্য পাঠানো সেনাদের সম্পর্কে যে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেছেন, তা মোটেও অকারণে ছিল না।
আজকের লক্ষ্য ছিল কারাকাস। আগামীকাল কী হবে? ট্রাম্প ইতিমধ্যে একটি তালিকা তৈরি করে ফেলেছেন। গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করা আর পানামা ক্যানেলে (পানামা খাল) মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন তিনি। এখন যেহেতু তিনি মাদুরোকে উৎখাত করেছেন, তাই একই যুক্তি ব্যবহার করে তিনি যেকোনো সংখ্যক দেশে হামলা চালাতে পারেন। গতকাল ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘মেক্সিকো চালাচ্ছে মাদক কার্টেলগুলো’। এ একটি দাবিই মেক্সিকোতে আগ্রাসন চালানোর জন্য ট্রাম্পের কাছে যথেষ্ট অজুহাত হতে পারে। এদিকে কিউবা সরকারের ‘উদ্বিগ্ন’ হওয়া উচিত বলে সতর্ক করে দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
যদি ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিও তৈরি হয়, অর্থাৎ যদি একটি স্থিতিশীল, তেলসমৃদ্ধ এবং মার্কিনপন্থী গণতন্ত্র হঠাৎ যাত্রা শুরু করে, তাহলে সেই সাফল্য এ প্রশাসনকে আরও উৎসাহী করে তুলতে পারে। এটি তারা নিজেদের পছন্দমতো এ অঞ্চলকে পুনর্গঠন করতে আর কত দূর যেতে পারে, সেটি খতিয়ে দেখতে উৎসাহী করতে পারে।
তবে সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি বাস্তবে খুব কমই ঘটে; বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ঝটিকা সামরিক হামলার (হিট অ্যান্ড রান) ভাগ্য এবার ফুরিয়ে আসার সম্ভাবনাই বেশি। নিজের প্রথম মেয়াদে তিনি বলেছিলেন, ‘শক্তিশালী দেশগুলো অন্তহীন যুদ্ধে লিপ্ত হয় না।’ তাহলে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখন কোন ধরনের দেশ?
লেখক: স্টিফেন ওয়ার্থাইম, কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের আমেরিকান স্টেটক্রাফট প্রোগ্রামের একজন সিনিয়র ফেলো এবং ইয়েল ল স্কুলের একজন ভিজিটিং লেকচারার।