ভেনেজুয়েলার লা গুয়ারায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে হতাহতদের খোঁজ করছেন উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা
ভেনেজুয়েলার লা গুয়ারায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে হতাহতদের খোঁজ করছেন উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের খোঁজে প্রাণপণ চেষ্টা, নিহত বেড়ে ২৩৫

ভেনেজুয়েলায় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ২৩৫ এ দাঁড়িয়েছে। সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আহত মানুষের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি।

এদিকে ধসে পড়া বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা জীবিতদের উদ্ধারে দিনরাত কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও উপকূলীয় শহর লা গুয়ারায় বহু ভবন ধসে পড়েছে। অনেক জায়গায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের সাহায্যের জন্য আর্তনাদ শোনা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। কয়েক সেকেন্ড পর ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়।

রাজধানী কারাকাস ও উপকূলীয় শহর লা গুয়ারায় বহু ভবন ধসে পড়েছে। অনেক জায়গায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের সাহায্যের জন্য আর্তনাদ শোনা গেছে।

দুটি ভূমিকম্পই ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়েছে। অনেক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। অনেকে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে। ফলে তাঁরা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।

ভেনেজুয়েলায় সরকারি ছুটির দিন এ জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেদিন দেশটিতে সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট দিবস এবং স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের স্মরণে অনুষ্ঠান চলছিল। ফলে সাধারণ দিনের তুলনায় বেশি মানুষ বাড়িতে কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

লা গুয়ারায় ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে আটকে পড়া এক ব্যক্তিকে উদ্ধারের চেষ্টা

এ বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, অন্তত ২৫০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে উপকূলীয় শহর লা গুয়ারায়। সেখানে একটি ১০ তলা হোটেল সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
লুইস হার্নান্দেজ, কারাকাসভিত্তিক সাংবাদিক

লা গুয়ারার বাসিন্দা হুয়ান অর্তিজ বিবিসিকে বলেন, তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারা গেছেন। আরেক বন্ধু এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় তাঁর পরিচিত প্রায় ২০ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

কারাকাসের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী অর্তিজ বলেন, ‘আমি হতবাক, দিশাহারা। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে, আমি কাউকে সাহায্য করতে পারছি না।’

লা গুয়ারায় একটি অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আহত ব্যক্তিরা

ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসেরও বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ত্রুহিয়ো, ইয়ারাকুই, কারাবোবো, আরাগুয়া ও মিরান্দা অঙ্গরাজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কারাকাস মহানগর এলাকার অন্তর্ভুক্ত পৌরসভা ‘চাকাও’-এর মেয়র গুস্তাভো দুকে বলেন, একটি ধসে পড়া ভবন থেকে এ পর্যন্ত ১১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে আরও ২৩ জনকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মেয়র বলেন, উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে বিশেষজ্ঞ দলকে ভেতরে প্রবেশের পথ করে দিচ্ছেন। তাঁদের আশা, এখনো অনেকে জীবিত অবস্থায় আটকে আছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার চেষ্টা করছি।’

রাজধানীর উপকণ্ঠে অবস্থিত ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মাইকেতিয়া গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের ভেতরের ভিডিওতে ছাদের অংশ থেকে ধুলা ও ধ্বংসাবশেষ পড়তে দেখা গেছে।

ভূমিকম্পের পর অন্তত ৩০টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। এতে মানুষের আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

ইউএসজিএস সতর্ক করে বলেছে, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা ৪২ শতাংশ। আর ১ লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। দুটি প্লেট একে অপরের সঙ্গে আটকে থাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছিল। হঠাৎ করেই এ চাপ ছুটে যায় এবং জমে থাকা শক্তি একবারে বেরিয়ে আসায় এ শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটেছে।

ভয়াবহ ভূমিকম্পে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন অনেক মানুষ

কারাকাসভিত্তিক সাংবাদিক লুইস হার্নান্দেজ বলেন, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ভেনেজুয়েলায় ১৯৬৭ সালে সর্বশেষ বড় ধরনের ভূমিকম্পে প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, এবারের দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি ১৯০০ সালের পর দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।

কারাকাসের লস পালোস গ্রান্দেস এলাকার বাসিন্দা ও সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার বলেন, ‘জীবনে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প আমি কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল, পুরো ভবনটা আমার ওপর ভেঙে পড়বে।’

ভেনেজুয়েলাকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, এল সালভাদর ও কাতার। যুক্তরাষ্ট্র ১৫ কোটি ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। উদ্ধারকাজে সহায়তায় পরিবহন জাহাজ, উড়োজাহাজ, উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি ভূমিকম্প ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সহায়তা দিতে প্রস্তুত।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সহায়তা ও মানবিক ত্রাণ পাঠাচ্ছে।