
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে। স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার রাত দশটা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা) ভোট দেওয়া যাবে। ভোটের আগে বিভিন্ন জরিপে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তাতে কোনো দল বা জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। নির্বাচনী ফলাফলে চারটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ১২০ আসনের মধ্যে সরকার গঠন করতে ৬১টি আসন প্রয়োজন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। যদিও আইজেনকটের জোটের দলগুলোর নিজেদের মধ্যেও অনেক মতবিরোধ রয়েছে। কোনো জোট শুরুতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ভোটের পর কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে সরকার গঠনের জন্য কঠিন দর-কষাকষি চলতে পারে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচন। সমালোচকদের অভিযোগ, নেতানিয়াহু ও তাঁর অতি ডানপন্থী সরকার ওই হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা দেশটির উদার গণতন্ত্রকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর শক্ত সমর্থকগোষ্ঠী এখনো রয়েছে। এই সমর্থকেরা তাঁর নেতৃত্বকে অপরিহার্য মনে করেন।
আইজেনকটের জোটে নানা মতাদর্শের মানুষ ও দল রয়েছে। বামপন্থী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী থেকে শুরু করে পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরাও আছেন। আছেন মধ্যপন্থী টেকনোক্র্যাট ও ফিলিস্তিনি আরব দলগুলোও। তবে সবার লক্ষ্য একটিই—নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো।
ভোট গণনার পর প্রতিটি দলকে তাদের পাওয়া ভোটের অনুপাতে আসন দেওয়া হবে। ভোটের পর সম্ভাব্য যে চার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিচে তুলে ধরা হলো।
ভোটের পর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। যে জোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করবেন, সেই দল বা জোটের নেতাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন প্রেসিডেন্ট।
আইজেনকটের ক্ষমতায় যাওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট পথ হলো নেতানিয়াহুর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে জোট গড়া। তাঁরা নিজেদের ‘পরিবর্তনের জোট’ বলে পরিচয় দেন। তাঁদের মধ্যে ডানপন্থী ইসরায়েল বেইতেনু দলের আভিগদর লিবারম্যান যেমন আছেন, তেমনি আছে ইয়াইর গোলানের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী দ্য ডেমোক্র্যাটস দলও।
নেতানিয়াহুকে সরাতে চান এমন নেতাদের মধ্যে আইজেনকটই সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন বলে ধারণা। তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন। বেনেট বা লিবারম্যানের মতো অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রধানমন্ত্রীর পদ দাবি করতে পারেন।
বিরোধী নেতাদের অনেকে ২০২১ সালেও এমন একটি জোট গড়েছিলেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এক বছর পরই সেই জোট ভেঙে যায়। এবারও একই ধরনের জোটের একই পরিণতি হতে পারে। ২০২১ সালে নেতানিয়াহুর লিকুদ এবং ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ইয়েশ আতিদ সবচেয়ে বেশি ভোট পায়। দুই দলই জোট গড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে দর-কষাকষি চলে। এরপর নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন অনেক ছোট ডানপন্থী দল ইয়ামিনাকে জোটে আনতে প্রধানমন্ত্রীর পদ ভাগাভাগিতে রাজি হয় ইয়েশ আতিদ। ঠিক হয়, পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন দুই দলের নেতা। প্রথমে দায়িত্ব পাবেন বেনেট।
জনমত জরিপ বলছে, ৬১ আসনের সীমা ছুঁতে আইজেনকটকে হয়তো মনসুর আব্বাস ও তাঁর দল রামের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের সরকারে কোনো আরব দলকে যুক্ত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন আরব ইসলামপন্থী দল রামও এতে যোগ দেয়। এর ফলে জোটটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তবে এই জোটের গড়া সরকার শুরু থেকেই বিভক্ত ছিল। ২০২২ সালে ইয়ামিনার সংসদ সদস্যরা দল ছাড়তে শুরু করেন। এতে সরকারের পতন ঘটে। নভেম্বরে আবার ভোট দিতে হয় ইসরায়েলিদের। সেই ভোটে জিতে আসে নেতানিয়াহুর জোট। প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।
জনমত জরিপ বলছে, ৬১ আসনের সীমা ছুঁতে আইজেনকটকে হয়তো আব্বাস ও তাঁর দল রামের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের সরকারে কোনো আরব দলকে যুক্ত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুকে সরাতে চান এমন নেতাদের মধ্যে আইজেনকটই সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন। বেনেট বা লিবারম্যানের মতো অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রধানমন্ত্রীর পদ দাবি করতে পারেন। সেই পদ না পেলে সমর্থন দেবেন না বলেও হুমকি দিতে পারেন তাঁরা।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো, জরিপের হিসাব ভুল প্রমাণিত হবে। কোনো একটি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। ২০২২ সালে এমনটাই হয়েছিল। সে সময় নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা নভেম্বরের নির্বাচনে ৬৪টি আসন পান। যদিও তাঁরা মোট ভোটের প্রায় ৪৮ শতাংশ পেয়েছিলেন।
সে সময় ইসরায়েলের নির্বাচনব্যবস্থা থেকে সুবিধা পেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এই ব্যবস্থায় পার্লামেন্টে ঢুকতে কোনো দলকে মোট ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়। আপনি এমন কোনো দলকে ভোট দিলেন, যারা এই সীমা পার হতে পারল না। সে ক্ষেত্রে আসন বণ্টনের চূড়ান্ত হিসাবে আপনার ভোট কোনো প্রভাব ফেলবে না।
নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি দল প্রয়োজনীয় ভোট পায়নি। একটি বামপন্থী মেরেৎস। অন্যটি ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী দল ব্যালড। ফলে বিরোধী জোটের দুই লাখের বেশি ভোট কাজে আসেনি। তাদের এই ক্ষতিতে লাভ হয় নেতানিয়াহুর। মোট ভোটের হিসাবে তাঁর জোটের আনুপাতিক অংশ বেড়ে যায়।
নেতানিয়াহু সম্ভবত ২০২২ সালের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি চাইছেন। ২০২২ সালের সাফল্য তাঁকে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থী সরকার গড়ার সুযোগ দিয়েছিল। বছরের পর বছর যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যেও তাঁর জোট স্থিতিশীল থেকেছে। টিকে আছে চার বছর ধরে।
প্রায় কোনো জনমত জরিপেই নেতানিয়াহুর মিত্রদের আবার সেই সাফল্য পাওয়ার ইঙ্গিত নেই। এবার নির্বাচনের অঙ্ক তাঁর বিরুদ্ধেও যেতে পারে। নতুন অতি ডানপন্থী দল আমখা ইসরায়েলের সমর্থন জরিপে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। ফলে সংসদে একটিও আসন না পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে দলটি।
ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ভোট দেওয়ার হার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন দুই পক্ষের রাজনীতিকেরা। ঐতিহাসিকভাবে ইহুদি ইসরায়েলিদের তুলনায় আরব নাগরিকেরা কম হারে ভোট দেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এবার তাঁরা বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে এলে বিরোধীরা সুবিধা পেতে পারেন।
আরেকটি সম্ভাব্য পরিণতির কথা খুব কম ইসরায়েলিই ভাবতে চান। তা হলো, কেউই স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবেন না। এতে আরেক দফা নির্বাচনের পথ তৈরি হবে।
আগেও এমন হয়েছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছিল ইসরায়েল। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচটি নির্বাচন হয়।
জনমত জরিপ বলছে, নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট ৬১ আসনের সীমা থেকে অনেক পিছিয়ে থাকতে পারে। তাঁর বিরোধীরা চাইলে তাঁর সঙ্গে মিলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করতে পারেন। তবে তাঁদের বেশির ভাগই তেমন কোনো ইঙ্গিত দেননি। নেতানিয়াহুর শাসন টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করলে তাঁরা নিজেদের সমর্থকদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে পারেন।
অচলাবস্থা চলতে থাকলে সবচেয়ে লাভবান হতে পারেন নেতানিয়াহু। নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন তিনি।
তবে বড় কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে সাময়িক জাতীয় ঐক্যের জোট গঠনের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। যেমন ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে। ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলার পর নেতানিয়াহুর কয়েকজন বিরোধী সাময়িকভাবে তাঁর সঙ্গে ‘যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায়’ যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে আইজেনকটও ছিলেন। গাজায় সামরিক অভিযানে সমর্থন দিতে তাঁরা যোগ দেন।
নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও সমস্যা থেকে যেতে পারে। তাঁদের কেউ কেউ নেতানিয়াহুকে যতটা কঠোরভাবে বর্জন করেন, একে অপরকেও ততটাই করেন। যেমন আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী জোট জয়েন্ট লিস্ট কয়েকটি আসন পেতে পারে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ইসরায়েল বেইতেনুর মতো ডানপন্থী দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
নতুন ডানপন্থী দল রিজার্ভিস্টস পার্লামেন্টে যাওয়ার মতো ভোট পেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। দলটি ঘোষণা দিয়েছে, অতি রক্ষণশীল ইহুদি দল কিংবা আরব দলগুলো আছে, এমন কোনো জোটে তারা যাবে না। অতি রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলো নেতানিয়াহুর সবচেয়ে সম্ভাব্য মিত্র। অন্যদিকে আরব দলগুলো আইজেনকটকে সহযোগিতা করতে পারে।
অচলাবস্থা চলতে থাকলে সবচেয়ে লাভবান হতে পারেন নেতানিয়াহু। নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন তিনি। ইসরায়েল আরেকটি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কয়েক মাস এভাবে দায়িত্বে থাকতে পারেন তিনি।
কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে আইজেনকট বা তাঁর কোনো মিত্র সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে পারেন। ইসরায়েলে এমন ঘটনা বিরল। এ জন্য আরব দলগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে না এনেও তাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে আইজেনকটকে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এমন জোটের পক্ষে সরকার চালানো কঠিন হবে। এ জন্য নেতানিয়াহুর তুলনামূলক বাস্তববাদী ডানপন্থী মিত্রদের কয়েকজনকেও পক্ষ বদলাতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে নিজের জোটের ওপর নেতানিয়াহুর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্ত। এই নিয়ন্ত্রণের জোরে তাঁর সমর্থকদের ভাঙিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ঠেকিয়ে দিতে পেরেছেন তিনি।