
এডি হার্ট যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স ও সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন এবং ২০২৪ সালে স্নাতক হয়েছেন।
এডি বলছিলেন, তিনি জানতেন প্রযুক্তি খাতে চাকরি পাওয়া চ্যালেঞ্জের হবে। তবে ‘তিনি ভেবেছিলেন (তাঁর জন্য হয়তো) বিষয়টা খানিকটা হলেও সহজ হবে’।
কিন্তু চাকরির জন্য আবেদন করতে গিয়ে এডি দেখেন, এমনকি ‘জুনিয়র’ পদের জন্য দেওয়া বিজ্ঞাপনেও পেশাগত কাজে প্রায়ই দুই বা ততোধিক বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়।
এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘এটা বাস্তবসম্মত নয়। এটা এমনকি ভালো প্রার্থীদেরও চাকরির জন্য চেষ্টা করা থেকে নিরুৎসাহিত করে।’
এডির কাছে স্পষ্টতই মনে হচ্ছে, সম্ভাব্য নিয়োগকর্তারা কোডারের কাজের সহজ অংশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে করার জন্য এআই টুল ব্যবহার করছেন। সেসব কাজ, যা সাধারণত নতুনদের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দিত।
যুক্তরাজ্যের এই কম্পিউটার সায়েন্সের স্নাতক বলেন, কোম্পানিগুলো তাদের কিছু কার্যক্রমে এআই ব্যবহার করে নিঃসন্দেহে সুবিধা পাচ্ছে। তবে ডেভেলপারদের জায়গায় পুরোপুরি এআইয়ের ব্যবহার টেকসই হবে না বলেই তিনি মনে করেন।
চ্যাটজিপিটি ও অন্য কোডিং টুলগুলোকে প্রযুক্তি খাতে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী করা হচ্ছে, বিশেষ করে তরুণ সফটওয়্যার ডেভেলপার ও প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর এডুকেশন রিসার্চের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে প্রযুক্তি খাতের চাকরির বিজ্ঞাপন ৫০ শতাংশ কমে গেছে, বিশেষ করে একেবারে প্রাথমিক স্তরের পদগুলো প্রভাবিত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর এডুকেশন রিসার্চের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে প্রযুক্তি খাতের চাকরির বিজ্ঞাপন ৫০ শতাংশ কমে গেছে, বিশেষ করে একেবারে প্রাথমিক স্তরের পদগুলো প্রভাবিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর পেছনের একটি কারণ হলো ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রত্যাশিত প্রভাব’।
একই সময়ে, সফটওয়্যার ডেভেলপাররা ব্যাপকভাবে এআই কোড টুল ব্যবহার করছেন। যদিও এআইয়ের কাজের প্রতি তাঁরা এখনো পুরোপুরি আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারছেন না।
সফটওয়্যার জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘স্ট্যাক ওভারফ্লো’ গবেষণা করে দেখিয়েছে, প্রায় অর্ধেক সফটওয়্যার ডেভেলপার প্রতিদিন এআই টুল ব্যবহার করেন। যদিও কেবল এক-তৃতীয়াংশই সত্যিকার অর্থে এই টুলের ফলাফলের প্রতি বিশ্বাস রাখেন।
স্ট্যাক ওভারফ্লোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রশান্ত চন্দ্রশেখর বলেন, স্নাতকদের জন্য এটি একটি জটিল সময়।
যদি কেউ তরুণ ডেভেলপারকে নিয়োগ না দেয়, তাহলে আপনি এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছাবেন, যেখানে জ্যেষ্ঠ ডেভেলপারও থাকবেন না; কারণ, আপনি আপনার প্রতিস্থাপনপ্রক্রিয়াটি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছেন।—পল ডিক্স, ইনফ্লাক্সডেটার সিটিও ও সহপ্রতিষ্ঠাতা
প্রশান্ত আরও বলেন, তাঁদের গবেষণা দেখিয়েছে, বৃহত্তরভাবে প্রযুক্তি খাতে ডেভেলপাররা তাঁদের বর্তমান চাকরিতেই থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যদিও অনেকেই নিজের কাজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। খানিকটা নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে লোকজন সম্ভবত এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে মনে করেন প্রশান্ত।
এই সবকিছুর অর্থ, তরুণ প্রযুক্তিবিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রথম চাকরি জোগাড় করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
চাকরির আবেদনপ্রক্রিয়ায় এআইয়ের ব্যবহারের কারণেও চাকরি খুঁজে পাওয়ার চাপ বাড়ছে। এডি হার্ট বলেন, তিনিও এর মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁকে আট ধাপের একটি অত্যন্ত স্বয়ংক্রিয় আবেদনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, যেটির প্রথম ধাপে তাঁকে পরীক্ষার মতো করে নিজের সম্পর্কে ২০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল। এগুলো পূরণ করতে কয়েক ঘণ্টার প্রয়োজন পড়ে।
বন্ধুদের সাক্ষাৎকার ধরনের ওই প্রশ্নের উত্তর রেকর্ড করে আপলোড করার জন্য বলেছিলেন এডি।
এডি বলেন, ‘তারপর কেবল এআই দ্বারা ওই উত্তর মূল্যায়ন করা হয় এবং একটি কম্পিউটার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে এমনটা মনে হয়, অন্তত একজন মানুষের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্মানটুকুও মিলছে না।’
পুরো নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া কলিন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে লেখাপড়া করেছেন এবং ২০২৪ সালে স্নাতক হয়েছেন।
এই শিল্প সব সময় একটি ‘শিক্ষানবিশকাল’ মডেলে চলে। এখানে তরুণেরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন এবং জ্যেষ্ঠ ডেভেলপারদের সঙ্গে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
কলিন্স বলেন, তিনি প্রায় এক বছর ধরে নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি বড় কোম্পানিতে কাজ পাওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেননি।
এই শিক্ষার্থী বলেন, এমনকি ছোট কোম্পানিগুলোও প্রায়ই আবেদন যাচাই করতে এআই ব্যবহার করে। এর মানে হলো, জীবনবৃত্তান্ত এমনভাবে তৈরি করতে হয় যেন তা ‘এআইবান্ধব’ হয়।
পরে কলিন্স বুঝতে পারেন, এমন লোকজন তাঁর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, যাঁরা ঠিকঠাকমতো তাঁর জীবনবৃত্তান্তই পড়েননি।
আমার তো মনে হয় গত বেশ কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিভাবানদের জন্য (চাকরির) বাজারে এখনই সবচেয়ে সেরা সময় চলছে।—রাজীব রামাস্বামী, নুটানিক্সের সিইও
এডি ও কলিন—দুজনই বলেছেন, তাঁরা জানেন, জ্যেষ্ঠ পদের চাকরিগুলো এখনো রয়েছে। যদি তাঁদের মতো তরুণ ডেভেলপাররা চাকরি না পান, তবে ভবিষ্যতে জ্যেষ্ঠ পদগুলো কে পূরণ করবে, তা ভেবে তাঁদের আশ্চর্য লাগে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেটাবেজ কোম্পানি ইনফ্লাক্সডেটার সিটিও ও সহপ্রতিষ্ঠাতা পল ডিক্স বলেন, কোনো অর্থনৈতিক মন্দা বা অর্থনৈতিক সংকটের সময় জুনিয়র সফটওয়্যার ডেভেলপারদের ওপরই সবচেয়ে বেশি আঘাত আসে।
তবে পল ডিক্স এটাও বলেন, ‘যদি কেউ তরুণ ডেভেলপারকে নিয়োগ না দেয়, তাহলে আপনি এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছাবেন, যেখানে জ্যেষ্ঠ ডেভেলপারও থাকবেন না। কারণ, আপনি আপনার প্রতিস্থাপনপ্রক্রিয়াটি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছেন।’
যেসব নির্বাহী ও কোম্পানি এআই প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করেছে, তারা সেই বিনিয়োগের ফলাফল দেখানোর চাপের মধ্যে থাকে এবং সেই ফলাফল, এমনকি শুধু নিয়োগ কমিয়ে দেখানোর মাধ্যমেই হতে পারে।
তরুণদের নিয়ে এর চেয়েও ইতিবাচক কথা বলেছেন মার্কিন এন্টারপ্রাইজ ক্লাউড কোম্পানি নুটানিক্সের সিইও রাজীব রামাস্বামী। তিনি বলেন, কলেজ থেকে বের হওয়া এই তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ আসলে প্রচলিত প্রোগ্রামিং পদ্ধতির তুলনায় এআই টুল ব্যবহারে অনেক বেশি অভিজ্ঞ।
রাজীব আরও বলেন, ‘আমার তো মনে হয় বেশ কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিভাবানদের জন্য (চাকরির) বাজারে এখনই সবচেয়ে সেরা সময় চলছে।’
অন্যদিকে প্রশান্ত বলেন, এই শিল্প সব সময় একটি ‘শিক্ষানবিশকাল’ মডেলে চলে। এখানে তরুণেরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন এবং জ্যেষ্ঠ ডেভেলপারদের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
যেসব নির্বাহী ও কোম্পানি এআই প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করেছে, তারা সেই বিনিয়োগের ফলাফল দেখানোর চাপের মধ্যে থাকে এবং সেই ফলাফল, এমনকি শুধু নিয়োগ কমিয়ে দেখানোর মাধ্যমেই হতে পারে বলে মনে করেন প্রশান্ত।
স্ট্যাক ওভারফ্লোর গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ ডেভেলপার তাঁদের চাকরির জন্য এআইকে হুমকি হিসেবে দেখেন। তবে এ সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ কম।
বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করে প্রশান্ত আরও বলেন, এআইয়ের কিছু সীমাবদ্ধতা এখন তাঁদের নজরে এসেছে। এখানে মানুষের পর্যবেক্ষণ থাকা জরুরি।
প্রশান্ত আরও যোগ করেন, আগে প্রযুক্তি খাতে বিশৃঙ্খল সময়ে আশঙ্কা করা হতো, জ্যেষ্ঠ ও প্রাথমিক—উভয় স্তরের চাকরিই বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু এখন আরও পদ সৃষ্টি হতেই দেখা যাচ্ছে। কারণ, মানুষের সামনে নতুন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে।
কিন্তু চাহিদার সেই উল্লম্ফন সম্ভবত আজকের দিনের কিছু কিছু স্নাতকের জন্য সময়মতো আসবে না।
কলিন্স প্রযুক্তি খাতে তাঁর পেশাজীবন শুরু করার আশা ত্যাগ করে পুলিশ হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার কথা ভাবছেন।