নিউইয়র্ক থেকে মিশিগান

পোর্ট অথোরিটি বাস টার্মিনালের বাইরের অংশ
পোর্ট অথোরিটি বাস টার্মিনালের বাইরের অংশ

টাইম স্কয়ার পোর্ট অথোরিটি বাস টার্মিনাল থেকে গ্রেহাউন্ডের বাসে উঠেছি মিশিগানের উদ্দেশে। সঙ্গে আমার ১০ বছরের মেয়ে ঈশায়া। স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। তাই এই আয়োজন। হঠাৎ করে অ্যানাউন্সমেন্ট, বিল্ডিংয়ের ভেতরে বোর্ডিং এরিয়ায় কালো লাগেজ এবং সঙ্গে একটা কালো জ্যাকেট কেউ ফেলে এসেছে। এত বিশাল লবি ৫৬-৮৫ পর্যন্ত কাউন্টার এই পাশে ছিল। আমরা ৭০ নম্বরে ছিলাম। যাই হোক, শুরুতে এই অঘটনের কথায় মনে মনে হাসলাম, আবার চিন্তিতও হলাম। কালো লাগেজ আছে এবং নিজের হাতেই রেখে এসেছি ব্যাংকে। ট্যাগ নেই, যারা তদারক করছে তাদের সঙ্গে ট্যাগ নেই—এ কথা বলে মনের দ্বিধা দূরও করেছি। এখানে নিজের হাতেই সব রাখতে হয়। আমার অভিভাবক আমাকে নিশ্চিন্ত করলেন যে আমাদের কোনো কালো জ্যাকেট নেই। সো ডোন্ট ওরি মম। পরে কী হলো জানি না। বাস ছাড়ল রাত সাড়ে ১০টায়, দেখলাম আন্ডারগ্রাউন্ড টার্মিনালটি ৪২-এর বিশাল বড় এলাকা দখল করে আছে। কয়েক শ বাস এখান থেকে প্রতিদিন ছাড়ে।

বিদেশের মাটিতে এটা আমার তৃতীয় বাসভ্রমণ। প্রথমটা দিল্লি টু আজমির আর দ্বিতীয়টা আজমির টু রাজস্থান, যা ভয়ংকর দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়। তবে এখন প্লেনে উঠতে আরও বেশি ভয় লাগে। কেননা, ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটছে। আল্লাহর নাম নিয়ে রওনা হলাম। দুর্বল মনে অসংখ্য ভয় কাজ করে। প্লেন, ট্রেন, বাস—এই তিনটি নিয়ে চিন্তা করতে করতে অবশেষে বাসে যাব বলে ঠিক করলাম। অবশ্যই টাকা একটা বিষয় বটে। এক ডলার যে আমার দেশের আশি টাকা, এটা ভাবলে এক ডলার বিনা কারণে খরচ করতে মনে বাধে। তবে সেটা বিদেশিদের দেখেই শিখেছি। নতুবা আমার হাত দিয়ে টাকা বের হতে সময় লাগে না। এ জন্য ভাই-বোন অনেক নসিহত দিয়েছে জীবনে। যদিও আমার প্রথম প্রেফারেন্স ছিল ট্রেন। ট্রেনে ইকোনমি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সোল্ডআউট আর ফার্স্টক্লাস ২৫৭ ডলার, যেখানে প্লেনের ভাড়া ২০৪ ডলার, বাসে ১০৪ করে। তার ওপর এয়ারে ২৫ ডলার করে লাগেজের জন্য দিতে হয়। আমার প্রায় ২৫০ ডলার বেঁচে গেছে, বেশ আনন্দ বোধ হলো নিজেকে সাশ্রয়ী ভেবে।
যাই হোক, বাসের ড্রাইভার একজন মহিলা। হিসাব-নিকাশ শেষ করে নিজেই আবার ঘোষণা দিলেন—এই বাসের যাত্রীরা মিশিগান, ডেট্রয়েট ও শিকাগো যাবে। মোবাইল রিংগার সাইলেন্ট রাখতে, কেউ যেন জোরে কথা না বলে, যাতে পাশের লোকের বা বাসে কারও অসুবিধা না হয়। কোনো হেলপার নেই, গাইডও নেই। ড্রাইভিং সিট যথারীতি বাঁ পাশে। ট্রান্সপারেন্ট শিট দিয়ে পার্টিশন দেওয়া। সিটগুলো প্লেনের সিটের মতো ছোট যদিও, ফ্লেক্সিবল, বাসের কোয়ালিটিও ভালো। আস্তে আস্তেই কথা বলছিলাম। ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, এক্সকিউজ মি। আমরা... একেবারে চুপ।
আমার তখন সিলেট-ঢাকা-সিলেট জার্নি বাই বাসের কথা মনে হয়ে গেল। সারা দিন ছোটাছুটি। আমি খুব ক্লান্ত। রাতের কফিটাও খাওয়া হয়নি। ঈশায়া অবাক চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে। একসময় দেখাল মেটলাইফ স্টেডিয়াম, যেখানে তার ড্রিমবয় হেইরি স্টাইল প্রোগ্রাম করে গেছে। বললাম, ‘আমাকে আগে বলতি, আমি অবশ্যই নিয়ে আসতাম।’ সে বলল, ডাজ নট ম্যাটার। আমি চোখ বন্ধ করলেও আমার ভাবনা থেকে মুক্তি পেলাম না। সেখানে যেমন আনন্দ আছে, তেমনি বেদনা আছে। আরও আছে কত বিচিত্র ঘটনা। তবে এই প্রথম নোটিশ করলাম পুরোনো স্মৃতি মনে করে আমি কাঁদিনি। তার কারণ ঈশায়া। ঠান্ডা লাগছে দেখে ঈশায়ার ওপরে তার জিনসের জ্যাকেটটা রাখলাম এবং পেটে কাতুকুতু দিলাম। বিনিময়ে সে-ও দুষ্টুমি করল এবং বলল, ‘ইউ আর নট মাই মম নাও, ইউ আর মাই ফ্রেন্ড’ এবং খুব সত্য এই প্রথমবার কারও অভাব ভুলে গেলাম।
আমার ভাবনা শুরু হয়েছিল ড্রাইভারদের ব্যবহার দিয়ে। আমি দেশেও সোহাগ গ্রিন লাইনের বাসে প্রথম বা দ্বিতীয় সারিতে বসতাম। আর প্রচণ্ড বিরক্ত হতাম তাদের তিনজনের খোশগল্পে। ভয়ও পেতাম ড্রাইভার অ্যাক্সিডেন্ট করে কি না! আমি ঘুমাতাম না, তবু ভান করে থাকতাম। বলতাম, আপনারা কথা কম বলেন। ড্রাইভার ফোনেও কথা বলে। এই মহিলা নিশ্চুপ। যেন কোনো রোবট গাড়ি চালাচ্ছে। স্পিড সামান্য বাড়িয়েছে, নতুবা স্কেল একই ছিল। তাকে আমাদের দেশের পাইলটের সঙ্গে তুলনা করলে বেশি করা হবে না। দুঃখজনক দুর্ঘটনা দেখেছি। কষ্ট পেয়েছি। থাক এগুলো। মজার একটি ঘটনা বলি:
আমার ক্লাসফ্রেন্ড মিনু হঠাৎ একদিন বলে সিলেট যাবে। এটা ’৯৯-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বর হবে। বৃহস্পতিবার হরতাল। শুক্র-শনি বন্ধ। সাধারণত হরতাল ইস্যুতে আমি যেতাম না। মিনুর বাসা মোহাম্মদপুর আসাদগেটের কাছে। আমি ধানমন্ডি ১৯ নম্বরে থাকি। ফোন করে কোথাও টিকিট পেলাম না। যেটা পেলাম, সেটা শ্যামলী ওভারব্রিজের কাছ থেকে ছাড়বে। এখান থেকে কখনো যাইনি। তাই ঠিক মনে নেই, তবে সিটি লিংকই হবে। রাত ৯-১০টায় বাস। আমরা বাস কাউন্টারে ঢুকতে পারিনি। হরতাল উৎসবের শুরু বাস পুড়িয়ে। ঠাসঠুস শব্দে ভয়ে শেষ। বাস মালিবাগ আসতে পারে নাই। এসি কাজ করে না। আমিই গলাবাজি যা করার করলাম যে এখানে থাকতে থাকতে ঠিক করান। চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনি। বলল, যাত্রাবাড়ী গিয়ে ঠিক করবে। ছাদের ওপরের দিকে কী একটা খুলে দিচ্ছে। গাদা গাদা মশা ঢুকছে। বলি, অ্যারোসলের ব্যবস্থা করেন। সে এয়ারফ্রেশনার মারে। মশার কামড় খাওয়ার পর পুরুষ জাতি ভাইয়ারা জেগে উঠলেন। মিনু বলে, ‘সুরমা এ তো বোম্বে টু গোয়ার অবস্থা।’ এ রকম অসংখ্য ঘটনা আছে।
এখন রাত দেড়টা বাজে। নীরব রাত। আকাশ পুরোটাই অন্ধকার। মাঝে মাঝে অদ্ভুত সুন্দর লাইটিং করা সিটি। সে গান শুনছে আর বাইরে তাকিয়ে আছে। আমি আর আমার ভাবনা। রাত আড়াইটায় মাইলসবার্গে ২০ মিনিটের ব্রেক। ট্রাভেল সেন্টারে ফ্রেশ হয়ে খাবার নিয়ে বের হয়ে আসছি। শুনি, একজন আপা আপা করে ডাকছে। কাছে গিয়ে দেখি তিয়াসের মা-বাবা। আমাদের আগের প্রতিবেশী। বলেছে, ওরা একেবারে চলে যাচ্ছে নিউইয়র্ক থেকে মিশিগানে। সেটা যে আজকে, তা জানা ছিল না। এই জায়গাটা অনেকটা তেলিয়াপাড়ার বাসস্টপেজের মতো। সেই রাজমণি বা সোহাগের প্যাসেঞ্জারদের রেস্টুরেন্টের মতো। শুধু ব্যবধান একটু ঝকমকে আর রাস্তা একটু বড়।
বাসে উঠে ঘুরেফিরে পুরোনো কথাই মনে হলো। ঘুমাতেও পারছিলাম না। ফোন চার্জের ব্যবস্থা আছে। তাই বসে বসে এই এলোমেলো গল্প লেখা।
সকাল সাতটায় ক্লিভল্যান্ডে এসে গ্রেহাউন্ডের টার্মিনালে নামতে হলো। অনেকটা ট্রানজিট বিমানযাত্রীর মতো চেকিং শেষে অন্য একটা বাসে উঠতে হলো। বলা যায় ছোটখাটো এয়ারপোর্ট। রেস্টুরেন্ট আছে, লাইনেও দাঁড়িয়েছি। কিন্তু কফি আর খাওয়া হলো না। ঈশায়া টিকিট চেক থেকে ডাকতে শুরু করেছে। ফর্মালিটি শেষ করে বাসে উঠলাম।
ক্লিভল্যান্ডে থাকতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। অনেকটা সিলেটি বৃষ্টি, যা আমি নিউইয়র্কে দেখিনি। কিছুটা উঁচু ভূমি ছিল। তারপর শুধু সবুজ আর সবুজ। মাঝেমধ্যে দু-একটা বাড়ি। এগুলোই হয়তো কান্ট্রি সাইড। মনে হচ্ছিল ঢাকা-সিলেটের পথে কোনো গ্রাম। যাই হোক, একসময় ১১টায় এসে মিশিগান ডেট্রয়েট টার্মিনালে নামলাম। তারপর সেখান থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে আমার খালার বাসায় গিয়ে পৌঁছালাম। যাই হোক, সর্বোপরি অভিজ্ঞতা খারাপ না। সাহস করে এটা অর্জন করতে পেরে আমি খুশি। হয়তো ভবিষ্যতে অন্য স্ট্যাটাসে বেড়াতে গেলে কাজে লাগবে। আনন্দের বিষয় হলো, বিনা ঝুটঝামেলায় নিউইয়র্ক থেকে মিশিগানে পৌঁছাতে পেরেছি।