মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

নেপথ্যের গল্প

ট্রাম্প কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান যুদ্ধে টেনে নিয়েছিলেন

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলায় যোগ দেওয়ার যে সায় দেন, তার পেছনে প্রভাব রেখেছিল ফেব্রুয়ারিতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি উপস্থাপনা। তা নিয়ে পরের কয়েক দিন ও সপ্তাহজুড়ে হোয়াইট হাউসের ভেতরে একের পর এক আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত কীভাবে ট্রাম্প সেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন, ইরানে যুদ্ধবিরতির পর নেপথ্যের সেই গল্পটি শুনিয়েছেন নিউইয়র্ক টাইমসের দুই সাংবাদিক জোনাথন সোয়ান ও ম্যাগি হাবারম্যান।

দিনটি ছিল ১১ ফেব্রুয়ারি (২০২৬), বেলা ১১টা। কালো রঙের একটি গাড়ি ঢুকল হোয়াইট হাউসে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে। সাংবাদিকদের চোখের আড়াল করে খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তাঁকে দ্রুত ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটির জন্য তখন প্রস্তুত ছিলেন নেতানিয়াহু, যিনি ইরানে হামলা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করাতে বহু মাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন।

প্রথমে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ওভাল অফিসের পাশের কেবিনেট রুমে জড়ো হন। তারপর মূল বৈঠকের জন্য নিচের তলায় নেমে যান নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তাদের জন্য একটি অত্যন্ত গোপনীয় দলিল উপস্থাপনা করেন। এই উপস্থাপনা হয় হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে। বিদেশি নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের জন্য এই কক্ষ খুব কমই ব্যবহার করা হয়।

ট্রাম্প বসলেন, তবে কক্ষটির মেহগনি কাঠের টেবিলের মাথায় তাঁর চেনা জায়গায় নয়। বরং তিনি এক পাশে বসেন, দেয়ালে লাগানো বড় পর্দার দিকে মুখ করে। নেতানিয়াহু বসেন অন্য পাশে, ঠিক ট্রাম্পের বিপরীতে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর পেছনের পর্দায় দেখা যাচ্ছিল তাদের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান দাভিদ বার্নিয়াকে। সেখানে আরও ছিলেন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা। দৃশ্যত তাঁরা নেতানিয়াহুর পেছনে সারি বেঁধে ছিলেন। এতে এমন একটি পটভূমি তৈরি হয়, যেন তিনি সহযোগী পরিবেষ্টিত যুদ্ধকালীন এক নেতা।

হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি উইলিস বসেছিলেন টেবিলের দূর প্রান্তে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, যিনি একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করছিলেন, তাঁর নির্ধারিত আসনেই বসেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, যাঁরা সাধারণত এমন পরিবেশে পাশাপাশি বসতেন, ছিলেন এক পাশে। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ। প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফও ছিলেন সেখানে। ইরানের সঙ্গে আলোচনা উইটকফই চালিয়ে নিচ্ছিলেন।

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

তথ্য ফাঁস ঠেকাতে ইচ্ছা করেই এই বৈঠকটির পরিসর রাখা হয়েছিল ছোট। ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার অন্য শীর্ষ সদস্যদের কেউই জানতেন না যে এমন একটি বৈঠক হচ্ছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সেখানে ছিলেন না। তিনি তখন ছিলেন আজারবাইজানে। খুব অল্প সময়ের নোটিশে বৈঠক ঠিক হওয়ায় তিনি সময়মতো ফিরতে পারেননি।

পরের এক ঘণ্টায় নেতানিয়াহু যে উপস্থাপনা দেন, তা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটিই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির অঞ্চলগুলোর একটির মাঝখানে বড় এক সশস্ত্র সংঘাতের পথে এগিয়ে দেয়। এরপরের কয়েক দিন ও সপ্তাহে হোয়াইট হাউসের ভেতরে একের পর এক আলোচনা হয়, যেগুলোর বিস্তারিত আগে কখনো প্রকাশিত হয়নি। সেই আলোচনাগুলোয় ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলায় যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়ার আগে নিজের বিকল্পগুলো এবং ঝুঁকিগুলো ভেবে দেখার সুযোগ পান।

ট্রাম্প কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে নিয়ে গেলেন, তার এই বিবরণ নেওয়া হয়েছে আসন্ন একটি বইয়ের জন্য করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। বইটির নাম ‘রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দি ইমপেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’। প্রশাসনের ভেতরের এই আলোচনা প্রেসিডেন্টের স্বভাবগত প্রবৃত্তি, তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের ভাঙন এবং তিনি কীভাবে হোয়াইট হাউস চালান, তা স্পষ্ট করে তুলে ধরে বইটি। ভেতরের আলোচনা ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তুলে ধরতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নেওয়া বিস্তৃত সাক্ষাৎকারের ওপর দাঁড়িয়েছে এই বিবরণ।

এর প্রতিবেদনগুলো দেখায়, বহু মাস ধরে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানরে সঙ্গে কীভাবে নেতানিয়াহুর ভাবনার মিলমিশ হয়েছিল। এমনকি প্রেসিডেন্টের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টাও বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেননি। দুই প্রশাসনজুড়েই তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য ছিল। আর এই সম্পর্ক, যদিও মাঝেমাঝে টানাপোড়েন ছিল, আমেরিকার রাজনীতির বাম ও ডান, দুই দিকেই তীব্র সমালোচনা ও সন্দেহ তৈরি করেছে।

রেজিম চেঞ্জ : ইনসাইড দি ইমপেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প বইটির প্রচ্ছদ

এটি আরও দেখায়, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের যুদ্ধবিষয়ক পরামর্শকদের তুলনামূলক বেশি সংশয়ী সদস্যেরাও তাঁর প্রবৃত্তির কাছে নতি স্বীকার করেন। এর বড় ব্যতিক্রম ছিলেন ভ্যান্স। হোয়াইট হাউসের ভেতরে তিনিই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিরোধী ছিলেন। তবু শেষ পর্যন্ত অন্যরা প্রেসিডেন্টের কথাকেই মেনে নেন। বিশেষ করে, যুদ্ধ দ্রুত হবে এবং সিদ্ধান্তমূলক হবে, তাঁর এমন প্রবল আত্মবিশ্বাসকে।

হোয়াইট হাউস অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

১১ ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহু নিজের প্রস্তাব তুলে ধরেন জোরালোভাবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানে শাসন পরিবর্তনের সুর্বণ সুযোগ এখনই। তিনি একথাও বলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান শেষ পর্যন্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটাতে পারে।

একপর্যায়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ছোট্ট একটি ভিডিও দেখান ট্রাম্পকে। সেখানে এমন কয়েকজন সম্ভাব্য নতুন নেতার ছবি একসঙ্গে দেখানো হয়, যাঁরা ইরানে গোঁড়া সরকার পড়ে গেলে দেশটির দায়িত্ব নিতে পারেন। যাঁদের দেখানো হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন রেজা পাহলভি। তিনি ইরানের শেষ শাহ বা রাজার নির্বাসিত ছেলে। এখন তিনি থাকেন ওয়াশিংটনে। তিনি নিজেকে এমন এক ধর্মনিরপেক্ষ নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, যিনি ইরানকে ধর্মতান্ত্রিক শাসনের পরের এক নতুন ব্যবস্থার দিকে নিতে পারেন।

নেতানিয়াহু ও তাঁর কর্মকর্তারা কয়েকটি পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন, যেগুলোকে তাঁরা প্রায় নিশ্চিত জয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখান। তাঁদের মতে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধ্বংস করা সম্ভব। তখন সরকার এতটাই দুর্বল হয়ে পড়বে যে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারবে না। আর আশপাশের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইরানের আঘাত হানার সম্ভাবনাও খুব কম। এমন মূল্যায়নই তুলে ধরা হয়।

এ ছাড়া মোসাদের গোয়েন্দা তথ্য বলছিল, ইরানের ভেতরে রাস্তায় আবার বিক্ষোভ শুরু হবে। একদিকে বোমা হামলা চলবে, অন্যদিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা দাঙ্গা ও বিদ্রোহ উসকে দিতে সাহায্য করবে, তাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে যে ইরানের বিরোধী পক্ষই সরকারকে উৎখাত করে ফেলতে পারবে।

ইসরায়েলিরা এই সম্ভাবনার কথাও তোলে যে ইরানি কুর্দি যোদ্ধারা ইরাক থেকে সীমান্ত পেরিয়ে উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে স্থলযুদ্ধের একটি নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারে। এতে সরকারি বাহিনীকে আরও ছড়িয়ে পড়তে হবে এবং এতে সরকারের পতন ত্বরান্বিত হবে।

নেতানিয়াহু আত্মবিশ্বাসী হয়ে, তবে একঘেয়ে ভঙ্গিতে তাঁর উপস্থাপনা দেন। তখন মনে হচ্ছিল, কক্ষটিতে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অর্থাৎ আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে এটি ভালোই লেগেছে।

‘আমার কাছে তো ভালোই শোনাচ্ছে,’ ট্রাম্প এমনটাই বলেছিলেন নেতানিয়াহুকে। এটা নেতানিয়াহুকে এই ইঙ্গিতই দিচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের জন্য সবুজসংকেত পেয়েছে।

কেবল নেতানিয়াহুই নয়, বৈঠকে থাকা সবাই বুঝে নিয়েছিলেন যে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়েই ফেলেছেন। প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টারাও বুঝতে পেরেছিলেন, নেতানিয়াহুর সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করতে পারে, এই প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। যেমনটি হয়েছিল জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের আগে দুই নেতার কথা হওয়ার সময়ও।

গত ৬ফেব্রুয়ারি মাসকাটে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে আলোচনা তারাই এগিয়ে নিচ্ছিলেন, তার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু হয়

১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউস সফরের আরও আগে কেবিনেট রুমে জড়ো হওয়া আমেরিকানদের মনোযোগ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির (চলমান যুদ্ধের শুরুতেই নিহত) কারণে তৈরি হওয়া অস্তিত্বগত হুমকির দিকে টানার চেষ্টা করেছিলেন নেতানিয়াহু।

কক্ষে অন্যরা যখন ইরান অভিযানের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন করেন, নেতানিয়াহু সেগুলো স্বীকার করেন। কিন্তু তিনি একটি কথা বলেন, তা হলো—কিছু না করার ঝুঁকি, পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকির চেয়ে বেশি। তিনি যুক্তি দেন, তারা যদি হামলা পিছিয়ে দেয় এবং ইরানকে আরও সময় দেয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে এবং পারমাণবিক কর্মসূচির চারপাশে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলতে, তখন পদক্ষেপ নিতে গেলে আরও বড় মূল্য চুকাতে হবে।

কক্ষে থাকা সবাই এটা বুঝতেন, ইরান অনেক কম খরচে এবং অনেক দ্রুত নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত বাড়াতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও সরবরাহ করা, যাতে অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থ ও মিত্রদের রক্ষা করা যায়, তা তুলনামূলকভাবে অনেক কঠিন।

নেতানিয়াহুর উপস্থাপনাগুলো এবং তা নিয়ে ট্রাম্পের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মার্কিন গোয়েন্দা মহলের জন্য জরুরি একটি কাজ তৈরি করে। তারা চুলচেরা বিশ্লেষণে বসেন, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা যা বলেছেন, তা কতটা বাস্তবসম্মত।

যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ২০২৫ সালে ইরানে অভিযান নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে

‘প্রহসনমূলক’

মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ফলাফল জানানো হয় পরের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি, সেই সিচুয়েশন রুমে আরেকটি বৈঠকে। এই বৈঠকে শুধু আমেরিকান কর্মকর্তারা ছিলেন। ট্রাম্প আসার আগে জ্যেষ্ঠ দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তা প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠজনদের সারকথা তুলেও ধরেন।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গভীর আস্থা ছিল। তাঁরা ইরানের ব্যবস্থাকে এবং এর ভেতরের খেলোয়াড়দেরও খুঁটিনাটি জানতেন। তাঁরা নেতানিয়াহুর উপস্থাপনাকে চার ভাগে ভাগ করেছিলেন। প্রথমটি ছিল নেতৃত্ব ছেঁটে ফেলা, অর্থাৎ আয়াতুল্লাহকে হত্যা করা। দ্বিতীয়টি ছিল ইরানের শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা পঙ্গু করে দেওয়া এবং প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া। তৃতীয়টি ছিল ইরানের ভেতরে গণ–অভ্যুত্থান। আর চতুর্থটি ছিল শাসন পরিবর্তন, যেখানে একজন ধর্মনিরপেক্ষ নেতাকে বসিয়ে দেশ চালানো হবে।

মার্কিন কর্মকর্তারা মূল্যায়ন করেন, প্রথম দুটি লক্ষ্য আমেরিকার গোয়েন্দা ও সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু নেতানিয়াহুর প্রস্তাবের তৃতীয় ও চতুর্থ অংশ, যার মধ্যে কুর্দিদের ইরানে স্থল আক্রমণ চালানোর সম্ভাবনাও ছিল, বাস্তবতা বিবর্জিত।

ট্রাম্প বৈঠকে যোগ দেওয়ার পর তাঁর সামনে গোয়েন্দা মূল্যায়ন তুলে ধরেন র‍্যাটক্লিফ। সিআইএর পরিচালক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর শাসন পরিবর্তনের সম্ভাব্য চিত্রগুলোর বর্ণনা দিতে একটিমাত্র শব্দ ব্যবহার করেন—‘প্রহসনমূলক।’ এই সময় মার্কো রুবিও বলে ওঠেন, ‘ফালতু।’

ইরানে হামলার দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ফ্লোরিডার মার–এ–লাগোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কথা বলছেন হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি উইলিসের সঙ্গে; পাশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও

র‍্যাটক্লিফ যোগ করেন, যেকোনো সংঘাতে ঘটনাপ্রবাহ অনিশ্চিত হয়। তাই শাসন পরিবর্তন ঘটতেই পারে। কিন্তু এটিকে অর্জিত হবে, এমনটা ধরে নেওয়া উচিত হবে না।

আরও কয়েকজনও এ নিয়ে কথা বলেন। তাঁদের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সও ছিলেন, যিনি ততক্ষণে আজারবাইজান থেকে ফিরে আসেন। তিনিও শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেন।

ট্রাম্প এরপর জেনারেল কেইনের দিকে ঘুরে বলেন, ‘জেনারেল, আপনি কী মনে করেন?’

কেইন জবাব দেন, ‘স্যার, আমার অভিজ্ঞতায়, ইসরায়েলিরা সাধারণত এমনটাই করে। তারা বেশি বাড়িয়ে বলে। আর তাদের পরিকল্পনা সব সময় খুব ভালোভাবে তৈরি করা থাকে না। তারা জানে, তাদের আমাদের দরকার। আর এ কারণেই তারা এত জোর দিয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করছে।’

ট্রাম্প দ্রুত এই মূল্যায়ন ভেবে দেখেন। তিনি বলেন, শাসন পরিবর্তন ‘তাদের সমস্যা’। তবে তিনি ইসরায়েলিদের কথা বলছিলেন, নাকি ইরানের জনগণের কথা, তা স্পষ্ট হচ্ছিল না। তার মূল কথা ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত তিনি নেতানিয়াহুর উপস্থাপনার ৩ ও ৪ নম্বর অংশের ভিত্তিতে নেবেন না।

মনে হচ্ছিল, ট্রাম্প এখনো উপস্থাপনার ১ ও ২ নম্বর অংশ অর্জনে খুবই আগ্রহী। অর্থাৎ আয়াতুল্লাহসহ ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা এবং ইরানের সামরিক বাহিনী ভেঙে ফেলা।

জেনারেল কেইন, যাঁকে ট্রাম্প ‘রেইজিন কেইন’ বলতে পছন্দ করতেন, কয়েক বছর আগেই প্রেসিডেন্টকে মুগ্ধ করেছিলেন। তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, অন্যরা যত সময়ের কথা বলছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করা সম্ভব। এই আত্মবিশ্বাসের পুরস্কার হিসেবে ট্রাম্প ওই জেনারেলকে নিজের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা করেন। জেনারেল কেইন রাজনৈতিক আনুগত্যের লোক ছিলেন না। আর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে তাঁর গুরুতর উদ্বেগ ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্টের সামনে নিজের মতামত তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন খুব সতর্ক।

পরের কয়েক দিনে এই উপদেষ্টা দল যখন আলোচনা চালিয়ে যায়, ট্রাম্প ও অন্যদের সামনে উদ্বেগজনক সামরিক মূল্যায়ন তুলে ধরেন জেনারেল কেইন। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালালে আমেরিকার অস্ত্রভান্ডার ভয়াবহভাবে কমে যাবে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী সমরাস্ত্রও রয়েছে, যার জোগান ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে বছরের পর বছর সহায়তা দেওয়ার কারণে আগেই চাপে ছিল। জেনারেল কেইন দ্রুত এই মজুত আবার পূরণ করার কোনো পরিষ্কার পথ দেখছিলেন না।

জেনারেল কেইন হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখার বিশাল কঠিন কাজটির কথাও তোলেন এবং ইরানের দিক থেকে এটি বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকির কথাও বলেন। তবে ট্রাম্প এই সম্ভাবনাকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তাঁর ধারণা ছিল, পরিস্থিতি এত দূর যাওয়ার আগেই ইরানের সরকার নতি স্বীকার করবে। প্রেসিডেন্টের মনে হচ্ছিল, যুদ্ধটি খুব দ্রুত শেষ হবে। জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বোমা হামলার পর তুলনামূলক দুর্বল প্রতিক্রিয়া তাঁর এই ধারণাকে জোরদার করেছিল।

যুদ্ধের আগে জেনারেল কেইনের ভূমিকা সামরিক পরামর্শ আর প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যে চিরাচরিত টানাপোড়েনকে সামনে আনে। কেইন এতটাই অনড় ছিলেন যে তিনি কোনো পক্ষ নেননি। তিনি বারবার বলছিলেন, প্রেসিডেন্টকে কী করতে হবে, তা বলা তাঁর কাজ নয়। বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের সম্ভাব্য পরিণতিসহ বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরা তাঁর কাজ। ফলে যাঁরা শুনছিলেন, তাঁদের কারও কারও কাছে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন একই সঙ্গে একটি বিষয়ের সব দিকেই যুক্তি দিচ্ছেন।

কেইন সব সময় জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তারপর কী?’ কিন্তু ট্রাম্প অনেক সময়ই যেন কেবল সেটাই শুনতেন, যা তিনি শুনতে চাইতেন।

জেনারেল কেইন প্রায় সব দিক থেকেই আগের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক এ মিলির থেকে আলাদা ছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনে তাঁর সঙ্গে জোরালো তর্কে জড়িয়েছিলেন মিলি। তিনি নিজের ভূমিকা দেখতেন প্রেসিডেন্টকে বিপজ্জনক বা বেপরোয়া পদক্ষেপ নেওয়া থেকে থামানোর দায়িত্ব হিসেবে।

তাঁদের সম্পর্কে জানেন, এমন একজন বলেন, ট্রাম্পের একটি অভ্যাস ছিল: জেনারেল কেইনের কৌশলগত স্তরের পরামর্শকে তিনি প্রায়ই বৃহত্তর কৌশল নির্ধারণের পরামর্শের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতেন। বাস্তবে এর মানে ছিল, জেনারেল একদিকে অভিযানের একটি অংশের কঠিন দিক নিয়ে সতর্ক করতেন, আর পরের বাক্যেই বলতেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় সীমাহীন পরিমাণ সস্তা ও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদী বোমা আছে এবং একবার আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে হামলা চালানো যাবে।

চেয়ারম্যানের কাছে এগুলো ছিল আলাদা দুটি পর্যবেক্ষণ। কিন্তু ট্রাম্প যেন ভাবতেন, দ্বিতীয়টি সম্ভবত প্রথমটিকে বাতিল করে দেয়।

আলোচনার পুরো সময়ে কোনো একপর্যায়েও চেয়ারম্যান সরাসরি প্রেসিডেন্টকে বলেননি যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ভীষণ খারাপ ধারণা। যদিও জেনারেল কেইনের কিছু সহকর্মীর বিশ্বাস ছিল, তিনি ভেতরে ভেতরে ঠিক সেটাই ভাবতেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

শিকারি ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনেক উপদেষ্টা নেতানিয়াহুকে বিশ্বাস করতেন না। তবু পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের মতের কাছাকাছি ছিল। বহু বছর ধরেই তা সত্য ছিল।

দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প যেসব পররাষ্ট্রনীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, তার মধ্যে ইরানের বিষয়টি ছিল আলাদা। তিনি একে একেবারে আলাদা ধরনের বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতেন। আর এই সরকারকে যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা থেকে ঠেকাতে বা পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার পথ বন্ধ করতে তিনি বড় ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত ছিলেন।

আরও একটি বিষয় নেতানিয়াহুর প্রস্তাবের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল, তা হলো ১৯৭৯ সালে ক্ষমতা নেওয়া ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের সময় ট্রাম্পের বয়স ছিল ৩২। তারপর থেকে এই শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটানা কাঁটার মতো ছিল।

বলা হচ্ছে, ইরান যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নামতে প্রভাবিত করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

ট্রাম্প ভাবতে চাইছিলেন, তিনিই হতে পারবেন প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি ইরানে শাসন পরিবর্তন ঘটাবেন। সাধারণত সরাসরি বলা হতো না, কিন্তু আরেকটি বিষয় কাজ করছিল। তা হলো, হয়তো ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। যুক্তরাষ্ট্রে সোলাইমানিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে ইরানের অভিযানের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হতো।

দ্বিতীয় মেয়াদে আবার ক্ষমতায় ফিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে তাঁর প্রাসাদ থেকে ধরে আনার নাটকীয় কমান্ডো অভিযানের পর তিনি আরও সাহসী হয়ে ওঠেন। এই অভিযানে কোনো মার্কিন প্রাণহানি হয়নি। এতে প্রেসিডেন্ট আরও একটি প্রমাণ পান যে, মার্কিন বাহিনীর ক্ষমতা তুলনারহিত।

সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ

মার্কিন সরকারের ভেতরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা যুদ্ধমন্ত্রী হেগসেথ।

রুবিও সহকর্মীদের বুঝিয়েছিলেন যে তিনি অনেক বেশি দোটানায় ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল না যে ইরানিরা আলোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তিতে রাজি হবে। কিন্তু তাঁর পছন্দ ছিল পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার বদলে সর্বোচ্চ চাপের অভিযান চালিয়ে যাওয়া। তবে ট্রাম্পকে এই অভিযান থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেননি রুবিও। বরং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষে ব্যাখ্যা দিতে তিনি পুরো দৃঢ়তা নিয়েই কথা বলেন।

বিদেশে নতুন একটি সংঘাত কী বয়ে আনতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল উইলিসের। কিন্তু বড় বৈঠকগুলোতে তিনি সাধারণত সামরিক বিষয়ে খুব জোর দিয়ে মত দিতেন না। বরং তিনি উপদেষ্টাদের উৎসাহ দিতেন, যেন তাঁরা ওই পরিবেশে প্রেসিডেন্টের সামনে নিজেদের মত ও উদ্বেগ তুলে ধরেন।

অন্য অনেক বিষয়ে উইলিস প্রভাব খাটাতেন। কিন্তু ট্রাম্প ও জেনারেলদের সঙ্গে একই ঘরে তিনি চুপচাপ থাকতেন। তাঁর ঘনিষ্ঠরা বলেন, অন্যদের সামনে কোনো সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে নিজের উদ্বেগ জানানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করতেন না। আর তাঁর বিশ্বাস ছিল, জেনারেল কেইন, র‍্যাটক্লিফ ও রুবিওর মতো উপদেষ্টাদের কথা প্রেসিডেন্টের শোনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবু উইলিস সহকর্মীদের বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র টেনে নেওয়া হতে পারে, এ নিয়ে তিনি চিন্তিত। ইরানের ওপর হামলা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে জ্বালানির দাম লাফিয়ে বেড়ে যায়। সেই নির্বাচন ঠিক করতে সাহায্য করতে পারে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর সাফল্যের বছর হবে, নাকি প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটদের সমন আর তদন্তের বছর হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উইলিস এই অভিযানের পক্ষেই ছিলেন।

ইরান যুদ্ধের মধ্যে গত ২৮ মার্চ ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ হয় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে

সংশয়প্রবণ ভ্যান্স

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের আর কেউ ভাইস প্রেসিডেন্টের মতো এতটা চিন্তিত ছিলেন না। আর এটি ঠেকানোর জন্যও আর কেউ তাঁর মতো এত চেষ্টা করেননি।

ভ্যান্স তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়েছেন ঠিক সেই ধরনের সামরিক দুঃসাহসিকতার বিরোধিতা করে, যা এখন সত্যিই বিবেচনায় ছিল। তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে বলেছেন ‘সম্পদের এক বিশাল অপচয়’ এবং ‘খুবই ব্যয়বহুল’।

তবে সব বিষয়ে তিনি যুদ্ধবিরোধী ছিলেন না। জানুয়ারিতে যখন ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে বলেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে সাহায্য আসছে; তখন মি. ভ্যান্স ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্টকে তাঁর টানা লাল দাগ কার্যকর করতে উৎসাহ দেন। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট যা চেয়েছিলেন, তা ছিল সীমিত, শাস্তিমূলক হামলা। অর্থাৎ ২০১৭ সালে সিরিয়ায় বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের জবাবে ট্রাম্প যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছিলেন, তার কাছাকাছি ধরনের কিছু।

ভাইস প্রেসিডেন্ট মনে করতেন, ইরানে শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ হবে এক বিপর্যয়। তাঁর পছন্দ ছিল, কোনো হামলাই না করা। কিন্তু তিনি জানতেন, ট্রাম্প সম্ভবত কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করবেন। তাই তিনি চেষ্টা করেন বিষয়টিকে সীমিত পদক্ষেপের দিকে নিতে। পরে যখন মনে হলো, প্রেসিডেন্ট বড় আকারের অভিযানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তখন ভ্যান্স বলেন, যদি করতেই হয়, তবে অত্যন্ত শক্তিশালী আঘাতের মাধ্যমে করা উচিত, যাতে দ্রুত লক্ষ্য অর্জন করা যায়।

ভ্যান্স সহকর্মীদের সামনে ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। এতে অসংখ্য প্রাণহানি হতে পারে। এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটও ভেঙে দিতে পারে। আর নতুন কোনো যুদ্ধ হবে না, এই প্রতিশ্রুতিতে যাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁদের অনেকের কাছে এটি বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স

ভ্যান্স আরও কিছু উদ্বেগের কথা তোলেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি জানতেন, আমেরিকার গোলাবারুদের সংকট কতটা। নিজেদের টিকিয়ে রাখার প্রবল ইচ্ছা থাকা এমন এক সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কয়েক বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য সংঘাতে লড়ার ক্ষেত্রে অনেক বাজে অবস্থায় ফেলে দিতে পারে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট ঘনিষ্ঠদের বলেছিলেন, সরকারের টিকে থাকা যখন প্রশ্ন, তখন ইরান প্রতিশোধ হিসেবে কী করবে, তা কোনো সামরিক বিশ্লেষণই সত্যিকারভাবে মাপতে পারবে না। যুদ্ধ সহজেই ভিন্ন দিকে যেতে পারে। তা ছাড়া, এর পর শান্তিপূর্ণ একটি ইরান গড়ে তোলার সম্ভাবনাও খুব কম বলে তাঁর মনে হচ্ছিল।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়তো ছিল এসবের বাইরে। হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল ইরান। বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী এই সরু জলপথ যদি আটকে দেওয়া হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে। শুরুটা হবে পেট্রলের দাম বাড়া দিয়ে।

ডানপন্থায় হস্তক্ষেপবিরোধী আরেকজন উল্লেখযোগ্য সন্দেহপ্রবণ কণ্ঠ হিসেবে উঠে আসা ভাষ্যকার টকার কার্লসন আগের এক বছরে কয়েকবার ওভাল অফিসে গিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ তাঁর প্রেসিডেন্সিকেই ধ্বংস করে দেবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে বহুদিনের পরিচিত কার্লসনকে ফোনে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি জানি তুমি এটা নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কার্লসন জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কীভাবে জানেন। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘কারণ শেষ পর্যন্ত সব সময় ঠিকই হয়।’

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের দিনগুলোয় আমেরিকান ও ইসরায়েলিরা একটি নতুন গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন, যা তাদের সময়সূচি অনেক এগিয়ে দেয়। আয়াতুল্লাহ খামেনি বাংকার ছেড়ে মাটির ওপরে বৈঠক করবেন অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সেটি হবে দিনের আলোয় আর আকাশপথে হামলার জন্য জায়গাটি পুরো খোলা থাকবে।

এটি ছিল ইরানের নেতৃত্বের কেন্দ্রে আঘাত হানার ক্ষণস্থায়ী একটি সুযোগ। এমন লক্ষ্য হয়তো আবার সামনে নাও আসতে পারত।

ট্রাম্প ইরানকে আরেকটি সুযোগ দেন, যাতে তারা এমন একটি চুক্তিতে আসে, যা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার পথ বন্ধ করবে। এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সম্পদ সরানোর জন্য বাড়তি সময়ও দেয়।

প্রেসিডেন্ট আসলে কয়েক সপ্তাহ আগেই কার্যত মনস্থির করে ফেলেছিলেন, তাঁর কয়েকজন উপদেষ্টা এমনটাই বলেছেন। কিন্তু তিনি এখনো ঠিক করেননি, কখন করবেন। নেতানিয়াহু তাঁকে দ্রুত এগোতে চাপ দিচ্ছিলেন।

সেই একই সপ্তাহে কুশনার ও উইটকফ জেনেভা থেকে ফোন করেন, ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকের পর। ওমান ও সুইজারল্যান্ডে তিন দফা আলোচনায় তাঁরা ইরান চুক্তি করতে কতটা প্রস্তুত, তা যাচাই করেছিলেন। একপর্যায়ে তাঁরা ইরানকে তাঁদের পুরো কর্মসূচির পুরো সময়ের জন্য বিনা মূল্যে পারমাণবিক জ্বালানি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এটি ছিল একধরনের পরীক্ষা। এর উদ্দেশ্য এটা বোঝা যে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে অনড় অবস্থান সত্যিই কি বেসামরিক জ্বালানির জন্য, নাকি বোমা তৈরির সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য?

ইরানিরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারা একে তাদের মর্যাদার ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করে।

কুশনার ও উইটকফ প্রেসিডেন্টের সামনে পুরো চিত্র তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, সম্ভবত কিছু একটা আলোচনা করে বের করা যেতে পারে। কিন্তু তাতে মাসের পর মাস লাগবে। ট্রাম্প যদি জানতে চান, তাঁরা তাঁর চোখে চোখ রেখে বলতে পারেন কি না যে তাঁরা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, তাহলে সেখানে পৌঁছাতে অনেক কিছু করতে হবে। কারণ, ইরানিরা খেলা খেলছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

‘এটা করতে হবে’

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি, বিকেল প্রায় ৫টার দিকে সিচুয়েশন রুমে চূড়ান্ত বৈঠক শুরু হয়। এ সময় ঘরে থাকা সবার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। আগের বৈঠকগুলোয় সবই আলোচনা হয়ে গেছে। সবাই অন্য সবার অবস্থান জানত। আলোচনা চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা।

ট্রাম্প টেবিলের মাথায় তাঁর নির্ধারিত জায়গায় ছিলেন। তাঁর ডান পাশে বসেছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ভ্যান্সের পাশে ছিলেন সুজি ওয়াইলস। তারপর ছিলেন র‍্যাটক্লিফ, এরপর হোয়াইট হাউসের আইন উপদেষ্টা ডেভিড ওয়ারিংটন। তারপর হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিয়াং। তার ঠিক বিপরীতে ছিলেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। তাঁর ডান পাশে ছিলেন জেনারেল কেইন, তারপর হেগসেথ ও রুবিও।

যুদ্ধপরিকল্পনার এই দলকে এতটাই ছোট রাখা হয়েছিল যে বৈশ্বিক তেলবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ–ব্যাঘাত সামলাতে যাঁদের ভূমিকা লাগত, সেই দুই গুরুত্বপূর্ণ দুজন, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট, এখানে ছিলেন না। জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডও বাদ পড়েন।

প্রেসিডেন্ট বৈঠক শুরু করেই বলেন, ‘ঠিক আছে, আমাদের হাতে কী আছে?’

হেগসেথ ও কেইন হামলার ধাপগুলো ব্যাখ্যা করেন। এরপর ট্রাম্প বলেন, তিনি সবার মতামত শুনতে চান।

ভ্যান্স তখন বলেন, ‘আপনি জানেন, আমি মনে করি এটি ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু আপনি যদি এটি করতে চান, আমি আপনার পাশে আছি।’

সুসি উইলিস বলেন, যদি প্রেসিডেন্টের মনে হয় যে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তাঁকে এগোতেই হবে, তাহলে তাঁর এগোনো উচিত।

ফ্লোরিডার মার–এ–লাগোতে বসে ইরানে হামলার দৃশ্য দেখেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

র‍্যাটক্লিফ সরাসরি কোনো মত দেননি। কিন্তু তিনি নতুন বিস্ময়কর গোয়েন্দা তথ্য তুলে ধরে বলেন যে ইরানের নেতৃত্ব তেহরানে আয়াতুল্লাহর প্রাসাদে জড়ো হতে যাচ্ছে। সিআইএর পরিচালক বলেন, ‘শাসন পরিবর্তন’ শব্দটির অর্থ কীভাবে ধরা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে সেটি সম্ভব হতে পারে। তিনি বলেন, ‘যদি আমরা শুধু সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করাকে বুঝি, তাহলে সম্ভবত আমরা তা করতে পারি।’

হোয়াইট হাউসের আইন উপদেষ্টা ওয়ারিংটন বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা যেভাবে পরিকল্পনাটি তৈরি করেছেন এবং প্রেসিডেন্টের সামনে যেভাবে তা উপস্থাপন করেছেন, তাতে এটি আইনি দিক থেকে অনুমোদনযোগ্য। তবে তিনি অভিযানের পক্ষ–বিপক্ষে ব্যক্তিগত মত দেননি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট যখন তাঁকে ব্যক্তিগত মত দিতে চাপ দেন, তিনি বলেন, মেরিন বাহিনীর সাবেক সদস্য হিসেবে বহু বছর আগে ইরানের হাতে নিহত এক মার্কিন সেনাসদস্যকে তিনি চিনতেন। বিষয়টি যদিও পুরোপুরি ব্যক্তিগত। তিনি প্রেসিডেন্টকে বলেন, ইসরায়েল যদি যেকোনো অবস্থায় এগোতেই চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রেরও এগোনো উচিত।

চিয়াং সম্ভাব্য জনসংযোগ–সংকটের কথা তুলে ধরেন। ট্রাম্প আরও যুদ্ধের বিরোধিতা করেই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। মানুষ বিদেশে সংঘাতের পক্ষে ভোট দেননি। জুনে ইরানের বিরুদ্ধে বোমা হামলার পর প্রশাসন যা যা বলেছে, এই পরিকল্পনা তারও বিপরীত। তাঁরা কীভাবে বোঝাবেন যে আট মাস ধরে বলে আসা ‘ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে’—সেটি এখন আর যথেষ্ট নয়?

চিয়াং সরাসরি হ্যাঁ বা না কোনোটাই বলেননি। তবে তিনি বলেন, ট্রাম্প যে সিদ্ধান্তই নেবেন, সেই সঠিক হবে।

লেভিটও কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে বলেন, এটি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত। আর সংবাদমাধ্যম সামলানোর কাজটি এটি যতটা সম্ভব, তাঁরা ভালোভাবে সামলাবেন।

হেগসেথ সীমিত অভিযানের একটি অবস্থান নেন। তাঁর কথা ছিল, ইরানিদের একসময় না একসময় সামলাতেই হবে, তাই এখনই তা করা ভালো। তিনি কারিগরি মূল্যায়নও দেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ বাহিনী নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই অভিযান চালানো সম্ভব।

জেনারেল কেইন ছিলেন সংযত। তিনি ঝুঁকি এবং এই অভিযানে গোলাবারুদ কতটা কমে যাবে, তা তুলে ধরেন। তিনি কোনো মত দেননি। তাঁর অবস্থান ছিল, ট্রাম্প যদি অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন, সামরিক বাহিনী তা কার্যকর করবে। প্রেসিডেন্টের দুই শীর্ষ সামরিক নেতা আগে থেকেই বুঝিয়ে দেন, এই অভিযান কীভাবে এগোবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারবে।

বলবার পালা এলে রুবিও আরও পরিষ্কারভাবে প্রেসিডেন্টকে বলেন, ‘যদি আমাদের লক্ষ্য হয় শাসন পরিবর্তন বা গণ–অভ্যুত্থান, তাহলে আমাদের এটি করা উচিত নয়। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা, তাহলে সেটি এমন একটি লক্ষ্য, যা আমরা অর্জন করতে পারি।’

সবাই প্রেসিডেন্টের প্রবৃত্তির কাছেই নতি স্বীকার করেন। তাঁরা দেখেছেন, তিনি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, অবিশ্বাস্য ঝুঁকি নিয়েছেন, এবং কোনো না কোনোভাবে শেষ পর্যন্ত জিতে গেছেন। এখন আর কেউ তাঁকে থামাবে না।

এরপর প্রেসিডেন্ট ঘরে থাকা সবাইকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের এটা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আর এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, ইরান যেন শুধু ইসরায়েল বা পুরো অঞ্চলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে না পারে।

জেনারেল কেইন তখন বলেন, তাঁর কিছু সময় সময় দরকার। পরদিন বিকেল ৪টা পর্যন্ত যেন হামলার অনুমোদন দেওয়া না হয়।

পরের দিন বিকেলে এয়ার ফোর্স ওয়ানে জেনারেল কেইনের দেওয়া সময়সীমার ২২ মিনিট আগে ট্রাম্প এই নির্দেশ পাঠান– ‘অপারেশন এপিক ফিউরি অনুমোদিত। কোনো বাতিল নয়। শুভকামনা।’