
সম্প্রতি নতুন প্রকাশিত এপস্টেইন নথিতে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের পাশাপাশি ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা মহলের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রকাশ হওয়া এফবিআইয়ের স্মারক, ই-মেইল ও তাঁর আইনি সুরক্ষার ধারাবাহিকতা এ প্রশ্ন জোরালো করেছে—এপস্টেইন কি দীর্ঘদিন কোনো রাষ্ট্রীয় ও গোয়েন্দা বলয়ের ছায়ায় ছিলেন?
জেফরি এপস্টেইনের পরিচয় শুধু একজন ভয়ংকর যৌন অপরাধী হিসেবেই নয়; তিনি এ কালের ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও প্রভাবের অন্ধকার জগতের প্রতীকও হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত লাখ লাখ পৃষ্ঠার নতুন নথি এ অন্ধকারকে আরও গভীর করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ছাড়াও অনেক বিলিয়নিয়ার ও রাজপরিবারের সদস্যের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্কের বিষয়টি আগেই নথিভুক্ত হয়েছে। তবে নতুন নথিপত্র (গত শুক্রবার প্রকাশিত) ইসরায়েলের রাজনৈতিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে তাঁর অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নতুন করে আলোকপাত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক।
এপস্টেইনের কর্মকাণ্ড আর এর আড়ালে থাকা সম্পর্কের প্রশ্ন এখন আর শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি তুলে ধরেছে রাষ্ট্রীয়, কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা এবং কয়েক দশক ধরে চলা সুরক্ষিত দায়মুক্তির রহস্যও।
যৌন নিপীড়নের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত এপস্টেইন ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান। যৌনকর্মের উদ্দেশ্যে নারীদের পাচারের অভিযোগে আরেকটি মামলায় বিচারকাজ চলা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নতুন নথিপত্র (শুক্রবার প্রকাশিত) ইসরায়েলের রাজনৈতিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে তাঁর অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নতুন করে আলোকপাত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক।
এ ঘটনার এক দশকের বেশি আগে এপস্টেইন অপ্রাপ্তবয়স্ক এক মেয়েকে যৌনকর্মে বাধ্য করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ জন্য তাঁকে যৌন নিপীড়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এমন মেয়েদের নিয়ে যৌনবৃত্তির এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন।
২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এহুদ বারাক ও তাঁর স্ত্রী নিলি প্রিয়েল একাধিকবার নিউইয়র্কে এপস্টেইনের অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করেছেন। এপস্টেইন ফাইলসে উল্লেখ করা ই-মেইলগুলোতে দেখা যায়, এপস্টেইনের সহকারী লেসলি গ্রফ ঘর পরিষ্কার, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ভ্রমণ পরিকল্পনার মতো প্রাত্যহিক বিষয় সমন্বয় করতেন।
এহুদ বারাক ২০০৩ সাল থেকে এপস্টেইনকে চেনেন বলে স্বীকার করেছেন। এমনকি ২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যৌনকর্মে বাধ্য করার অপরাধে এপস্টেইন দণ্ডিত হওয়ার পরও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি। তবে এহুদ বারাক কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা বা দেখার কথা বারবার অস্বীকার করেছেন। কিন্তু এপস্টেইন একজন নিবন্ধিত যৌন অপরাধী হওয়ার কয়েক বছর পরও তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ জনমনে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
২০২০ সালের একটি এফবিআই স্মারকে বিস্ফোরক সব তথ্য পাওয়া গেছে। মার্কিন নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব নিয়ে তদন্তের সময় তৈরি করা ওই স্মারকে এক গোপন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, এপস্টেইন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করতেন এবং ধারণা করা হয় মোসাদের একজন নিয়োগকৃত এজেন্টও ছিলেন।
জেফরি এপস্টেইন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তাঁর অধীনে গোয়েন্দা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
স্মারকে আরও বলা হয়, এপস্টেইন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং বারাক ক্ষমতায় থাকাকালে এপস্টেইন তাঁর অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের অংশ হিসেবে শুক্রবার এ স্মারকও প্রকাশ করা হয়।
যদিও এ স্মারক কোনো বিচারিক রায় নয় এবং গোপন সূত্রের ওপর নির্ভরশীল; তবে এটি এফবিআইয়ের দাপ্তরিক নথিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয় প্রমাণ করে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও এহুদ বারাকের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল।
২০২০ সালের একটি এফবিআই স্মারকে বিস্ফোরক সব তথ্য পাওয়া গেছে। মার্কিন নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব নিয়ে তদন্তের সময় তৈরি করা ওই স্মারকে গোপন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়, এপস্টেইন মোসাদের একজন নিয়োগকৃত এজেন্টও ছিলেন।
এপস্টেইন ও বারাকের মধ্যে ই-মেইল চালাচালিতেও মোসাদের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। ২০১৮ সালের এক বার্তায় এপস্টেইন বারাককে প্রকাশ্যে এটি স্পষ্ট করতে বলেছিলেন যে তিনি (এপস্টেইন) ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করেন না।
এফবিআইয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, সাবেক ফেডারেল কৌঁসুলি অ্যালেক্সান্ডার অ্যাকোস্টাকে নাকি বলা হয়েছিল, এপস্টেইন গোয়েন্দা সংস্থার (ইসরায়েলি) লোক। অ্যাকোস্টা প্রকাশ্যে এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত না করলেও এটি বছরের পর বছর ধরে চর্চিত হয়ে আসছে।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে কৌঁসুলিরা এপস্টেইনের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করেন। ফলে তিনি ফেডারেল মামলার হাত থেকে রেহাই পান। ওই মামলায় তাঁর আজীবন কারাদণ্ড হতে পারত। তবে তা না করে তাঁকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ সময় এপস্টেইনকে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা, সপ্তাহে ছয় দিন অফিসে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৩ মাস পর তাঁকে প্রবেশনে মুক্তি দেওয়া হয়।
মায়ামি হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাকোস্টা এমন একটি চুক্তি করেছিলেন, যেন এপস্টেইনের অপরাধের প্রকৃত মাত্রা চাপা পড়ে এবং আরও ভুক্তভোগী বা প্রভাবশালী জড়িত ব্যক্তিদের খোঁজে এফবিআইয়ের তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকাটি একে ‘শতাব্দীর চুক্তি’ বলে উল্লেখ করে।
এ কেলেঙ্কারির জেরে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে অ্যাকোস্টা পদত্যাগ করেন। যদিও তিনি দাবি করেছিলেন, এই চুক্তি হওয়ার কারণে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও এপস্টেইনের কারাদণ্ড হয়েছিল।
নতুন প্রকাশিত নথিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম অন্তত ১ হাজার ৮০০ বার এসেছে। ট্রাম্প কোনো ধরনের অপরাধের কথা অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে এপস্টেইন–কাণ্ডে কোনো অভিযোগও আনা হয়নি।
তবে এফবিআইয়ের স্মারকে অভিযোগ করা হয়েছে, ট্রাম্প ‘ইসরায়েলের মাধ্যমে এ বিষয়ে আপস করেছিলেন’ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে নিযুক্ত করেন। স্মারকে কট্টর অর্থোডক্স ‘চাবাদ-লুবাভিচ’ আন্দোলনের ভূমিকার কথাও বলা হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের মতাদর্শের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এদের। কুশনারকে এ গোষ্ঠীর সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ই-মেইলগুলো থেকে আভাস পাওয়া যায়, এপস্টেইন ইসরায়েলকে শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই নয়; বরং ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও দেখতেন। একটি বার্তায় এপস্টেইন দাবি করেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ইসরায়েল সফরের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। তবে ভারত সরকার এ দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যান্য নথি অনুযায়ী, এপস্টেইন ইসরায়েলি কর্মকর্তা, উপসাগরীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পশ্চিমা ক্ষমতাধরদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করতেন। নথিতে তাঁকে এমন এক অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; যিনি প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেলের বাইরে কাজ করতেন।
এপস্টেইনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক অন্য সব প্রভাবশালীর তুলনায় আলাদা। কারণ, এটি ছিল কয়েক দশকের ধারাবাহিক সম্পর্ক। অফিশিয়াল নথিতে বারবার মোসাদের নাম আসা ও এপস্টেইনের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার বিষয়টি একটি বিশেষ প্যাটার্ন তৈরি করেছে। কোনো আদালত এখনো প্রমাণ করতে পারেনি যে এপস্টেইন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করেছেন। তবে নথিপত্র, ই–মেইল ও স্মারকের স্তূপ একটি সিদ্ধান্তের দিকেই ইঙ্গিত করে—এপস্টেইন একা ছিলেন না; বরং গোয়েন্দা সংস্থা, অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি সুরক্ষিত বলয়ের ভেতরে ছিলেন। তাই লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথি এখন জনগণের সামনে আসার পর মূল প্রশ্নটি আর এটি নেই যে এপস্টেইনের শক্তিশালী বন্ধু ছিল কি না; বরং প্রশ্ন হলো, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতাই কি তাঁর অপরাধগুলো এতকাল আড়াল করে রেখেছিল?
[তথ্যসূত্র: দ্য প্যালেস্টাইন ক্রনিকল, বিবিসি, সিএনএন ও দ্য মিডল ইস্ট আই]