শান্তি পর্ষদের প্রথম বৈঠকে স্বাক্ষরিত একটি নথি তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র
শান্তি পর্ষদের প্রথম বৈঠকে স্বাক্ষরিত একটি নথি তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র

শান্তি পর্ষদের প্রথম বৈঠক: গাজায় ৭০০ কোটি ডলারের সহায়তা ঘোষণা ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর তথাকথিত ‘শান্তি পর্ষদ’ (বোর্ড অব পিস)–এর প্রথম বৈঠকে জানিয়েছেন, গাজা উপত্যকার পুনর্গঠন তহবিলে ৭০০ কোটি ডলার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে ৯টি সদস্যরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে ফিলিস্তিনি এ ভূখণ্ডে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনী (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স) মোতায়েনে রাজি হয়েছে পাঁচটি দেশ।

গতকাল বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে পর্ষদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি পর্ষদকে ১০ বিলিয়ন (১ হাজার কোটি) ডলার সহায়তা দেবে। তবে এই অর্থ ঠিক কী কাজে ব্যবহার করা হবে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে জানাননি।

ট্রাম্প জানান, গাজা পুনর্গঠনের জন্য প্রাথমিকভাবে একটি তহবিলের ব্যবস্থা করেছে কাজাখস্তান, আজারবাইজান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব, উজবেকিস্তান ও কুয়েত।

যেকোনো আন্তর্জাতিক বাহিনীকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং (ইসরায়েলি) দখলদারদের আগ্রাসন চালানো থেকে বিরত রাখতে হবে। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
হাজেম কাসেম, হামাসের মুখপাত্র

ট্রাম্প বলেন, ‘এখানে ব্যয় করা প্রতিটি ডলারই স্থিতিশীলতা এবং একটি নতুন ও সম্প্রীতিপূর্ণ (অঞ্চলের) আশায় করা বিনিয়োগ।’ তিনি আরও বলেন, ‘শান্তি পর্ষদ আজ এ কক্ষেই দেখিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যায়।’
প্রতিশ্রুত এ তহবিল তাৎপর্যপূর্ণ হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। কারণ, দুই বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজা পুনর্গঠনে আনুমানিক ৭ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হবে।

প্রস্তাবিত স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনী

গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার অংশ স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনী। ইতিমধ্যে এ বাহিনীতে সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, কাজাখস্তান, কসোভো ও আলবেনিয়া। আর বাহিনীর পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মিসর ও জর্ডান।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ঘোষণা করেছেন, ‘এ শান্তি প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে’ প্রস্তাবিত বাহিনীতে তাঁর দেশ আট হাজার পর্যন্ত সেনা পাঠাবে।

ফিলিস্তিনিদের বাদ দিয়ে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করায় শান্তি পর্ষদ সমালোচনার মুখে পড়েছে।

একজন মার্কিন জেনারেলের নেতৃত্বে ও একজন ইন্দোনেশীয় ডেপুটি জেনারেলের অধীন এ বাহিনী কাজ করবে। রাফাহ শহর থেকে তারা কাজ শুরু করবে এবং একটি নতুন পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ১২ হাজার পুলিশ সদস্য ও ২০ হাজার সেনা প্রস্তুত করা।

গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার একটি অংশ ছিল হামাসের নিরস্ত্রীকরণ। তবে ইসরায়েল যেহেতু গাজায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তাই অস্ত্র জমা দিতে নারাজ গোষ্ঠীটি।

হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক বাহিনীকে অবশ্যই ‘যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং (ইসরায়েলি) দখলদারদের আগ্রাসন চালানো থেকে বিরত রাখতে হবে।’ তিনি সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়ে জানান, তাঁর সংগঠনের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

৪০টির বেশি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন গতকালের এ বৈঠকে তাদের প্রতিনিধি পাঠানোর বিষয় নিশ্চিত করেছে। তবে জার্মানি, ইতালি, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যসহ এক ডজনের বেশি দেশ এ পর্ষদে যোগ দেয়নি। তারা শুধু পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নিচ্ছে।
হানি মাহমুদ, গাজায় আল–জাজিরার সংবাদদাতা

গাজা যুদ্ধ অবসানের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প প্রথম এ পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব দেন। তবে অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতির’ পর পর্ষদের ব্যাপারে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। তিনি এখন চান, বিশ্বব্যাপী অন্যান্য সংঘাত মোকাবিলায় পর্ষদটি আরও বড় পরিসরে কাজ করুক।

তবে ফিলিস্তিনিদের বাদ দিয়ে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করায় পর্ষদটি সমালোচনার মুখে পড়েছে।

গাজা সিটি থেকে আল-জাজিরার সংবাদদাতা হানি মাহমুদ জানান, ফিলিস্তিনিরা এখন শুধু প্রতিশ্রুতির বদলে কার্যকর সমাধান দেখতে চান।

হানি মাহমুদ বলেন, ‘পুনর্গঠন ও শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনগুলোর অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রতিবারই বিশাল অঙ্কের অর্থায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে; কিন্তু দেখা গেছে, সেই অর্থ পেতে অনেক দেরি হয়েছে অথবা পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।’

পুনর্গঠন ও শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনগুলোর অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রতিবারই বিশাল অঙ্কের অর্থায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে; কিন্তু দেখা গেছে, সেই অর্থ পেতে অনেক দেরি হয়েছে অথবা পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।

হানি মাহমুদ আরও উল্লেখ করেন, ‘ফিলিস্তিনিরা এসবের পুনরাবৃত্তি দেখতে চান না। তাঁরা এমনটা দেখতে চান না যে ফিলিস্তিন সংকটের মতো এ দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান না খুঁজে শান্তি পর্ষদ শুধু সংকট ব্যবস্থাপনার গণ্ডিতে আটকে থাকা আরেকটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে।’

৪০টির বেশি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বৃহস্পতিবারের এই বৈঠকে তাদের কর্মকর্তা পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে জার্মানি, ইতালি, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যসহ এক ডজনের বেশি দেশ এই পর্ষদে যোগ দেয়নি, তারা শুধু পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নিচ্ছে।