যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে জ্বালানি তেল শিল্পের নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে বক্তব্য দিচ্ছেন। ৯ জানুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে জ্বালানি তেল শিল্পের নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে বক্তব্য দিচ্ছেন। ৯ জানুয়ারি ২০২৬

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে আইন নয়, শক্তিই কি শেষ কথা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ভাষা ও আচরণ ক্রমে এমন এক রূপ নিচ্ছে, যাকে অনেকে রাজাসুলভ বলে মনে করছেন। দুই মাস আগে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা বিরোধীদের ‘নো কিংস’ আন্দোলনকে নাটকীয় বলে উপহাস করেছিলেন। তখন তাঁরা বলেছিলেন, ট্রাম্পকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতার বদলে রাজা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা বাড়াবাড়ি। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার, পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য বিস্তারের তৎপরতা এবং ভেনেজুয়েলায় হামলার মতো ঘটনা ট্রাম্পকে রাজা হিসেবে দেখানোর চেষ্টাকে অনেকটা সার্থক বলে প্রমাণ করেছে।

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, একমাত্র তিনি নিজে ছাড়া বাইরের কোনো কিছু তাঁকে থামাতে পারে না। তাঁর ভাষায়, ‘আমার নিজের নৈতিকতা এবং নিজের মনই একমাত্র সীমারেখা।’

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প চাপের মুখে আন্তর্জাতিক আইনের কথা স্বীকার করলেও শর্ত জুড়ে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলীয় এই প্রেসিডেন্টের মতে, কোন আইন তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, সেটি তিনি নিজে ঠিক করবেন। টাইমস এটাকে ট্রাম্পের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে স্পষ্ট স্বীকারোক্তি বলে আখ্যা দিয়েছে।

এই মনোভাব শুধু ট্রাম্পের কথাতে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর প্রশাসনের বক্তব্যেও একই সুর দেখা যাচ্ছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, ভেনেজুয়েলার মতো একটি সার্বভৌম দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও ন্যায্যতা আছে। তাই সে দেশের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রই ঠিক করে দেবে।

ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার সিএনএনকে বলেন, বাস্তব পৃথিবী শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতা দ্বারা পরিচালিত হয়। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের ক্ষমা চাওয়া ছাড়া নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে হবে।

ট্রাম্প ও ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠদের এসব দৃষ্টিভঙ্গি আইনের দিক থেকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। মিলার একাধিকবার বলেছেন, ট্রাম্পের ক্ষমতা ‘প্লেনারি’, অর্থাৎ প্রায় সীমাহীন। ভেনেজুয়েলায় হামলা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, এ জন্য তাঁর কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। তবে হামলার পর তাঁর প্রশাসন এটাকে সামরিক অভিযানের বদলে আইন প্রয়োগের পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিচারিক পর্যালোচনা ছাড়া সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের হত্যা করার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের রয়েছে।

সম্প্রতি কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ট্রাম্প সেনাবাহিনীকে অবৈধ আদেশ দিতে পারেন। তাঁর প্রশাসন সেই বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বলে আখ্যা দেয়। অথচ ট্রাম্প অতীতে নিজেই প্রকাশ্যে নির্যাতন, সন্ত্রাসীদের পরিবারের সদস্যদের হত্যার মতো অবৈধ আদেশ দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের মনোভাব—ট্রাম্পের আদেশ অবৈধ হতে পারে, এমন কোনো ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের এ মানসিকতা যুক্তরাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেও লক্ষ করা যাচ্ছে। ট্রাম্প কিছুদিন আগে এমন এক নির্বাহী আদেশে সই করেছেন, যাতে বিচার বিভাগের আইনি পরামর্শ কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আইনের প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট ও অ্যাটর্নি জেনারেলের মতোই চূড়ান্ত।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমে এমন এক পথে এগোচ্ছে, যেখানে আইন নয়, শক্তিই মূল নিয়ামক। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিনি ক্ষমতার সীমারেখা যেভাবে গায়ের জোরে ঠেলে বাড়াচ্ছেন, সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি তিনি বিশ্বমঞ্চেও প্রয়োগ করছেন। অনেকের চোখে, ঠিক এই জায়গাতে ট্রাম্পের রাজাসুলভ পররাষ্ট্রনীতির প্রকৃত রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।