মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ক্ষমতায় বসার পর এক বছরে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বকে নাড়িয়ে দিলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছরের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরেন তিনি। নতুন করে নামেন ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলার’ অভিযানে। এরপর ৩৬৫ দিন পেরিয়েছে। মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদের প্রথম বছর পূর্ণ হয়েছে।

এই এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন ট্রাম্প। পরিবর্তন এনেছেন অর্থনীতি, কূটনীতি ও সামাজিক নিয়মনীতিতে। এতে বদল এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে। একই সঙ্গে পরিবর্তন দেখা গেছে বৈশ্বিক চিত্রপটে। দেখে নেওয়া যাক গত বছরে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের জেরে কোন কোন বদল দেখেছে বিশ্ব।

২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে চলতি মাসের ৫ তারিখ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্ররা অন্তত ৬৫৮টি বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

২২৮ নির্বাহী আদেশে সই

প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে ওভাল অফিসে বসার দিনই ২৮টি নির্বাহী আদেশে সই করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্টই তাঁর মেয়াদের প্রথম দিনে এত নির্বাহী আদেশে সই করেননি। নির্বাহী আদেশ কখনো ফেডারেল আইন অতিক্রম করতে পারে না। তবে সমালোচকেরা বলছেন, ট্রাম্পের দেওয়া অনেক নির্বাহী আদেশ এই সীমা অতিক্রম করেছে।

নির্বাহী আদেশে সই করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

প্রথম দিনের মতো পুরো বছরজুড়েই ঝড়ের গতিতে নির্বাহী আদেশ দিয়ে গেছেন ট্রাম্প। কাগজে–কলমে তা মোট ২২৮টি। অন্যদিকে ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নিজের প্রথম মেয়াদের পুরো চার বছরে মোট ২২০টি নির্বাহী আদেশে সই করেছিলেন তিনি।

৬ লাখ ৫ হাজার জনকে বিতড়িত

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে গত ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৬ লাখ ৫ হাজার জন অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট৶ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। একই সময়ে স্বেচ্ছায় দেশটি ছেড়ে চলে গেছেন আরও ১৯ লাখ অভিবাসী।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজে করে বিতাড়িত করা হয় অনেক অবৈধ অভিবাসীকে

গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা প্রায় ১৬ লাখ অভিবাসী হিসেবে দেশটিতে থাকার বৈধতা হারিয়েছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের নির্দেশের আওতায় অন্তত ৬৬ হাজার ৮৮৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে মার্কিন অভিবাসন বিষয় কর্তৃপক্ষ ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)। সে হিসাবে প্রতিদিন দেশজুড়ে গড়ে ৮২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর গড়ে ১০ শতাংশ করে শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। সবচেয়ে বেশি ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয় ভারতের ওপর।

সবার জন্য শুল্ক

২০২৫ সালজুড়ে ট্রাম্পের কাছে প্রিয় একটি শব্দ ছিল শুল্ক। কার ওপর শুল্ক আরোপ করেননি তিনি? শত্রু, মিত্র, প্রতিবেশী—কেউই ছাড় পায়নি ট্রাম্পের শুল্কের খড়গ থেকে। এর বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে। উত্তেজনা বেড়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছেন

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর গড়ে ১০ শতাংশ করে শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। সবচেয়ে বেশি ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয় ভারতের ওপর। মার্কিন অর্থ বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্ক থেকে ২৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলার আয় করেছে দেশটি।

যদিও ইয়েল ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদন বলছে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি গৃহস্থালিতে গড়ে দেড় হাজার ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে।

সরকারি চাকরিতে কাটছাঁট

ক্ষমতায় বসার পর নির্বাহী আদেশ জারি করে নতুন একটি বিভাগ খোলেন ট্রাম্প। নাম দেওয়া হয় ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি (ডিওজিই)। বিভাগের প্রধান করা হয় ধনকুবের ইলন মাস্ককে। এই বিভাগের কাজ ফেডারেল সরকারের ব্যয় কমানো। পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল সরকারের অধীনে সবচেয়ে বেশি মানুষ চাকরি করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্ক

প্রতিষ্ঠার মাত্র ১০ মাস পরেই ফেডারেল সরকারের ৩ লাখ ১৭ হাজার কর্মচারীকে ছাঁটাই করে ডিওজিই। আকার কমানো হয় শিক্ষা দপ্তরের। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পের কাটছাঁট করা হয়। শেষ পর্যন্ত এই সংস্থাকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতি

প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প প্রথম যে দেশটি সফর করেছিলেন, সেটি ছিল সৌদি আরব। দ্বিতীয় মেয়াদেও প্রথম দেশ হিসেবে তাঁর গন্তব্য ছিল সৌদি। যদিও এই সফরের পথে ইতালি ও ভ্যাটিকান সিটিতে থেমেছিলেন ট্রাম্প। অংশ নিয়েছিলেন পোপ ফ্রান্সিসের শেষকৃত্যে।

গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা প্রায় ১৬ লাখ জন অভিবাসী হিসেবে দেশটিতে থাকার বৈধতা হারিয়েছেন।

ক্ষমতায় বসার প্রথম ১২ মাসে ১৩টি দেশ সফর করেছেন ট্রাম্প। সেগুলো হলো—ইতালি, ভ্যাটিকান সিটি, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, মিসর, মালয়েশিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। এর মধ্যে কাতার ও যুক্তরাজ্যে দুবার সফর করেছেন তিনি।

দ্বিতীয় দফা দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প তাঁর প্রথম বিদেশ সফর আরব দেশগুলো দিয়ে শুরু করেন

অথচ নিজের প্রথম মেয়াদে পুরো চার বছরে ২৫টি দেশ সফর করেছিলেন ট্রাম্প। যদিও সেবার মেয়াদের শেষের দিকে করোনার প্রকোপ দেখা দেয়। ফলে ট্রাম্পের বিদেশ সফর অনেকটাই সীমিত করা হয়।

সাত দেশে বোমাবর্ষণ

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার শুরুতেই ট্রাম্পের একটি প্রতিশ্রুতি ছিল—বিশ্বে চলমান সংঘাতগুলো শেষ করবেন তিনি। তবে তখন থেকে তাঁর প্রশাসন অন্তত সাতটি দেশে বোমাবর্ষণ করেছে। সেগুলো হলো—ইরাক, সোমালিয়া, ইরান, ইয়েমেন, সিরিয়া, নাইজেরিয়া ও সবশেষ ভেনেজুয়েলা।

বি–২ বোমারু বিমান দিয়ে ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বব্যাপী সংঘাতের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে চলতি মাসের ৫ তারিখ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্ররা অন্তত ৬৫৮টি বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

প্রথম মেয়াদে বেশ কিছু সংঘাত থামানোর দাবিও করেছেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষ্যমতে—এই সংখ্যা আটটির বেশি। তবে যেসব সংঘাত ট্রাম্প থামিয়েছেন বলে দাবি করেছেন, তার কয়েকটি এখনো চলছে।

জলবায়ু ও পরিবেশ

ক্ষমতায় বসার আগে ট্রাম্প একটি কথা বলেছিলেন, ‘ড্রিল বেবি ড্রিল’। ওই বক্তব্য ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে পা রাখার পর সমুদ্রে ২৫ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা খনন করেছে তাঁর সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের যে পরিবেশ সুরক্ষা নীতি রয়েছে, তাতে ইতি টানার ইঙ্গিত দিচ্ছে এই পদক্ষেপ।

এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব জলবায়ু নীতি হাতে নিয়েছিলেন, তার অন্তত ৩০টি নির্বাহী আদেশ জারি করে বাতিল করেছেন ট্রাম্প। এর মধ্যে রয়েছে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়া।