
যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার কয়েক দিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যেই একটি মন্তব্য করেছিলেন। বলেছিলেন, ইরানের ভেতর থেকেই ‘কেউ একজন’ যদি দেশটির দায়িত্ব নেন, তবে সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে।
এখন জানা যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একটি নির্দিষ্ট ও অত্যন্ত চমকপ্রদ নাম মাথায় নিয়েই এ সংঘাতে জড়িয়েছিল। সেই ব্যক্তিটি হলেন মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। বিস্ময়ের কথা, ইরানের এই সাবেক প্রেসিডেন্ট তাঁর চরম কট্টরপন্থী, ইসরায়েলবিরোধী ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত।
তবে ওই দুঃসাহসিক পরিকল্পনাটি খুব দ্রুতই ভেস্তে যায়। যাঁরা পরিকল্পনাটি সম্পর্কে অবগত ছিলেন, সেই মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ইসরায়েলের তৈরি করা এ পরিকল্পনার বিষয়ে আগে আহমাদিনেজাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছিল।
মার্কিন কর্মকর্তা ও আহমাদিনেজাদের একজন সহযোগীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনই তেহরানে আহমাদিনেজাদের বাড়িতে একটি ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়। মূলত তাঁকে গৃহবন্দী দশা থেকে মুক্ত করার জন্যই হামলাটি করা হয়েছিল। হামলায় তিনি আহত হন।
কর্মকর্তারা জানান, আহমাদিনেজাদ এ হামলায় বেঁচে গেলেও খুব অল্পের জন্য রক্ষা পান। আর এ ঘটনার পর ইরানের ক্ষমতা পরিবর্তনের এ পরিকল্পনা থেকে তিনি নিজের মন গুটিয়ে নেন।
ইসরায়েল ও ট্রাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা
ওই ঘটনার পর থেকে আহমাদিনেজাদকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। বর্তমানে তিনি কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন, তা-ও জানা যায়নি। ইরানের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি ছিল এক চরম বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আহমাদিনেজাদের দূরত্ব বাড়ছিল ও দেশটির কর্তৃপক্ষ তাঁর ওপর কড়া নজরদারি রাখছিল। অথচ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিনি ‘ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার’ আহ্বানের জন্য পরিচিত ছিলেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কট্টর সমর্থক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচকও ছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে নিজ দেশে ভিন্নমত দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্যও ছিল তাঁর পরিচিতি।
এ পরিকল্পনায় অংশ নেওয়ার জন্য আহমাদিনেজাদকে কীভাবে রাজি করানো বা দলে টানা হয়েছিল, তা এখনো জানা যায়নি।
ইরানের ধর্মীয় সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ইসরায়েলের তৈরি করা একটি বহুধাপ বিশিষ্ট পরিকল্পনার অংশ ছিল এটি, যা এর আগে কখনো সংবাদমাধ্যমে আসেনি।
এ ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁদের লক্ষ্য কত দ্রুত অর্জন করা সম্ভব, সে বিষয়ে শুধু ভুল মূল্যায়নই করেননি; বরং ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা নিয়ে জুয়া খেলেছিলেন, যা ট্রাম্পের কিছু উপদেষ্টার কাছেও অসম্ভব মনে হয়েছিল। বিশেষ করে আহমাদিনেজাদকে আবারও ক্ষমতায় বসানোর কার্যকারিতা নিয়ে বেশ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা সন্দিহান ছিলেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি ইরানে এ ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিকল্পনা ও আহমাদিনেজাদকে নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে বলেন, ‘শুরু থেকেই অপারেশন এপিক ফিউরি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল। তা হলো, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা, তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া, নৌবাহিনীকে ডুবিয়ে দেওয়া ও তাদের প্রক্সি বা সহযোগী গোষ্ঠীগুলো দুর্বল করা।’
মুখপাত্র দাবি করেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী তার সব লক্ষ্য অর্জন করেছে বা এর চেয়েও বেশি সফল হয়েছে। আর এখন আমাদের আলোচনাকারীরা এমন এক চুক্তি করার জন্য কাজ করছেন, যা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে বন্ধ করে দেবে।’
মার্কিন কর্মকর্তা ও আহমাদিনেজাদের একজন সহযোগীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনই তেহরানে আহমাদিনেজাদের বাড়িতে একটি ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়। মূলত তাঁকে গৃহবন্দী দশা থেকে মুক্ত করার জন্যই হামলাটি করা হয়েছিল। হামলায় তিনি আহত হন।
ইসরায়েলের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোয় মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে তৈরি করা এমন কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের দায়িত্ব নেওয়ার মতো একজন বাস্তববাদী নেতা খুঁজে বের করা।
কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছিলেন, তাঁদের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে, ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরেই এমন কিছু লোক আছেন, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক; যদিও তাঁদের পুরোপুরি ‘উদারপন্থী’ বলা যাবে না।
সে সময় মার্কিন বাহিনীর বিশেষ অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যাওয়ার সাফল্য ও দেশটির অন্তর্বর্তী নতুন নেতার হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের বিষয়টি বেশ উপভোগ করছিলেন ট্রাম্প। তিনি মনে করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার এ মডেল অন্য দেশেও সফলভাবে খাটানো সম্ভব।
আহমাদিনেজাদ মুক্ত হলেও ক্ষমতা বদলের ‘ব্যর্থ’চেষ্টা
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আহমাদিনেজাদ ইরানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। ফলে তাঁর আনুগত্য নিয়ে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়। এরপর তাঁকে বেশ কয়েকটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়, তাঁর সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং পূর্ব তেহরানের নারমাক এলাকায় নিজের বাড়িতেই তাঁর চলাচল ক্রমশ সীমিত বা তাঁকে গৃহবন্দী করে ফেলা হয়।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আহমাদিনেজাদকে ইরানের নতুন সরকারের সম্ভাব্য নেতা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। এ ঘটনা আরও একটি বিষয় প্রমাণ করে। সেটি হলো, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধটি তেহরানে বর্তমানকালের চেয়ে তুলনামূলক নমনীয় ও বাধ্যগত একটি নেতৃত্ব বসানোর আশা নিয়েই শুরু করা হয়েছিল। যদিও ট্রাম্প এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা দাবি করে আসছিলেন যে, এ যুদ্ধের লক্ষ্য শুধু ইরানের পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা করেছিল এবং যে বিমান হামলায় তিনি আহত হন, তার চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ে এখনো অনেক অজানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর চালানো ওই হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল, আহমাদিনেজাদের ওপর নজরদারি করা রক্ষীদের হত্যা করা; যাতে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গৃহবন্দী দশা থেকে তাঁকে উদ্ধার করা যায়।
যুদ্ধের প্রথম দিনই (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। মধ্য তেহরানে খামেনির কম্পাউন্ডে চালানো ওই হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার একটি বৈঠকও পণ্ড হয়ে যায়। এতে এমন কিছু কর্মকর্তাও নিহত হন, যাঁদের হোয়াইট হাউস চিহ্নিত করেছিল যে, তাঁরা তাঁদের ঊর্ধ্বতনদের চেয়ে সরকার পরিবর্তনের বিষয়েই আলোচনা করতে বেশি আগ্রহী।
সে সময় ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোয় প্রাথমিক কিছু প্রতিবেদন এসেছিল যে নিজ বাড়িতে হওয়া হামলায় আহমাদিনেজাদও নিহত হয়েছেন।
একটি কানাগলির শেষ মাথায় অবস্থিত আহমাদিনেজাদের বাড়িটি এই হামলায় খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে গলির প্রবেশমুখে থাকা নিরাপত্তাচৌকিতে আঘাত হানা হয়েছিল। স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে যে, সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
পরের দিনগুলোতে ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থাগুলো স্পষ্ট করে, আহমাদিনেজাদ বেঁচে গেছেন। তবে তাঁর ‘দেহরক্ষী’রা নিহত হয়েছেন। তাঁরা মূলত ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদস্য ছিলেন এবং একই সঙ্গে তাঁকে পাহারা দেওয়া ও গৃহবন্দী করে রাখার দায়িত্বে ছিলেন।
শুরু থেকেই অপারেশন এপিক ফিউরি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল। তা হলো, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা, তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া, নৌবাহিনীকে ডুবিয়ে দেওয়া ও তাদের প্রক্সি বা সহযোগী গোষ্ঠীগুলো দুর্বল করা।অ্যানা কেলি, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র
গত মার্চ মাসে মার্কিন সাময়িকী ‘দ্য আটলান্টিক’-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আহমাদিনেজাদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সহযোগীদের সূত্র দিয়ে বলা হয়, সাবেক এই প্রেসিডেন্ট তাঁর বাড়িতে হামলার পর সরকারের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। নিবন্ধটিতে এ ঘটনাকে ‘প্রকৃতপক্ষে একটি জেলব্রেক বা বন্দিমুক্তির অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
নিবন্ধটি প্রকাশের পর, আহমাদিনেজাদের একজন সহযোগী ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর কাছে নিশ্চিত করেন যে আহমাদিনেজাদ নিজেও ওই হামলাকে তাঁকে মুক্ত করার একটি চেষ্টা হিসেবেই দেখেছিলেন।
ওই সহযোগী জানান, মার্কিন প্রশাসন আহমাদিনেজাদকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিল, যিনি ইরানকে নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং দেশটির ‘রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক পরিস্থিতি’ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা যাঁর রয়েছে।
সেই সহযোগী আরও জানান, আহমাদিনেজাদ নিকট ভবিষ্যতে ইরানে ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন’ করতে পারতেন। যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের মতোই একজন ভাবছিল। মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে আটক করার পর দেলসি ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা নেন এবং এরপর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন।
প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন আহমাদিনেজাদ তাঁর কট্টরপন্থী নীতি এবং প্রায়শ অদ্ভুত ও উগ্রবাদী বক্তব্যের জন্য পরিচিত ছিলেন, যেমন তিনি দাবি করেছিলেন যে ইরানে একজনও সমকামী নেই এবং তিনি ইহুদি নিধনযজ্ঞ বা হলোকাস্টের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। এমনকি তেহরানে ‘জায়নবাদমুক্ত বিশ্ব’ শীর্ষক একটি সম্মেলনেও বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি।
পাশ্চাত্যের ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠানগুলোয় আহমাদিনেজাদের এসব মন্তব্য নিয়ে বেশ কৌতুক করা হতো। ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই পপ সংস্কৃতির এক কৌতূহলোদ্দীপক চরিত্রে পরিণত হন তিনি। এমনকি মার্কিন কমেডি শো ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’-এ তাঁকে নিয়ে প্যারোডি বা ব্যঙ্গাত্মক নাটক করা হয়েছিল।
আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট থাকাকালীনই ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের গতি বাড়িয়েছিল। দেশটি যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্ত্রে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এ ইউরেনিয়াম একদিন পারমাণবিক বোমা তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আহমাদিনেজাদ ধীরে ধীরে ইরানের ধর্মীয় সরকারের একজন প্রকাশ্য সমালোচকে পরিণত হন অথবা অন্ততপক্ষে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়।
মাহমুদ আহমাদিনেজাদ তিনবার-২০১৭, ২০২১ ও ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবার ইরানের বেসামরিক ও ইসলামিক আইনবিদদের সংগঠন ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ তাঁর নির্বাচনী প্রচার আটকে দেয়। আহমাদিনেজাদ ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অপশাসনের অভিযোগ তোলেন এবং তেহরান সরকারের কড়া সমালোচক হয়ে ওঠেন; যদিও তিনি কখনোই পুরোপুরি প্রকাশ্য বিদ্রোহী ছিলেন না। তবু বর্তমান সরকার তাঁকে সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা তৈরির একজন সহযোগী হিসেবে দেখতে শুরু করে।
পাশ্চাত্যের সঙ্গে আহমাদিনেজাদের সম্পর্ক অবশ্য অনেক বেশি ধোঁয়াশার। ২০১৯ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশংসা করেছিলেন এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন।
সে সময় আহমাদিনেজাদ বলেছিলেন, ‘ট্রাম্প একজন কাজের মানুষ। তিনি একজন ব্যবসায়ী, তাই লাভ–ক্ষতি হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে। আমরা তাঁকে বলতে চাই, আসুন, আমরা আমাদের দুটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি লাভ–ক্ষতি হিসাব করি এবং সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করি।’
আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা রাখা, এমনকি ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করারও অভিযোগ ছিল। তাঁর সাবেক চিফ অব স্টাফ এসফান্দিয়ার রহিম মাশাইকে ২০১৮ সালে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। সে সময় মামলার বিচারক ব্রিটিশ ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তোলেন, যা ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছিল।
গত কয়েক বছরে আহমাদিনেজাদ ইরানের বাইরে বেশ কিছু সফর করেন। এটি তাঁর ভূমিকা নিয়ে গুঞ্জন আরও বাড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউ লাইনস’ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ২০২৩ সালে গুয়াতেমালা এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাঙ্গেরি সফর করেন। এ দুটি দেশের সঙ্গেই ইসরায়েলের বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
হাঙ্গেরির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। হাঙ্গেরি সফরে আহমাদিনেজাদ অরবানের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্যও দেন।
ইরান যুদ্ধ শুরুর গত বছরের জুনে দেশটির ওপর ইসরায়েলের হামলা শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে আহমাদিনেজাদ বুদাপেস্ট থেকে ফিরেছিলেন। ইসরায়েলি হামলা শুরু হলে তিনি নিজেকে জনসমক্ষ থেকে আড়ালে নিয়ে যান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব কম পোস্ট করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আহমাদিনেজাদের দূরত্ব বাড়ছিল ও দেশটির কর্তৃপক্ষ তাঁর ওপর কড়া নজরদারি রাখছিল। অথচ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিনি ‘ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার’ আহ্বানের জন্য পরিচিত ছিলেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কট্টর সমর্থক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচকও ছিলেন তিনি।
দীর্ঘ সময় ধরে যে দেশকে ইরানের প্রধান শত্রু মনে করতেন আহমাদিনেজাদ, সেই দেশের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে তাঁর এ রহস্যজনক নীরবতা ইরানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেরই নজর কেড়েছিল।
জনমত পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ফিল্টারল্যাবসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মৃত্যুর খবর ছড়ানোর পর ইরানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে আলোচনা বেশ বেড়ে যায়। তবে এর পরের সপ্তাহগুলোয় আলোচনা কমে আসে এবং মূলত তিনি এখন কোথায় আছেন, তা নিয়ে জনমনে একধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
অভিযানের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ইসরায়েলের দুই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুরু থেকেই ইসরায়েল এ যুদ্ধকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করে পরিকল্পনা করেছিল। প্রথম ধাপে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাদের হত্যা ও ইরানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে কুর্দিদের সংগঠিত করা।
দ্বিতীয় ধাপে কুর্দিদের এ আক্রমণ ও ইসরায়েলের চালানো মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার যৌথ প্রভাবে ইরানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, যা দেখে মনে হবে দেশটির সরকার পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
তৃতীয় ধাপে ছিল, তীব্র রাজনৈতিক চাপ এবং বিদ্যুৎ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে বর্তমান সরকার ভেঙে পড়ার ধারণা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর তখনই ইসরায়েলিদের ভাষায় একটি ‘বিকল্প সরকার’ সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
তবে বিমান হামলা ও সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ঘটনা ছাড়া ইসরায়েলের পরিকল্পনার আর কোনো অংশই তাদের আশানুরূপ সফল হয়নি। এখন পেছনের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মার্কিন ও ইসরায়েলিদের নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার সক্ষমতাকে তাঁরা কতটা ভুল মূল্যায়ন করেছিলেন।
অবশ্য যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসের ধাক্কা সামলে ইরানের ধর্মীয় সরকার টিকে যাওয়ার পরও বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা তেহরানে ক্ষমতা পরিবর্তনের এ রূপরেখার ওপর বিশ্বাস বজায় রেখেছিলেন।
মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া বেশ কিছু আলোচনায় তাঁর সহযোগীদের বলেছেন, ইরানে কয়েক দশকের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সফল অভিযানের (গোয়েন্দা তৎপরতা) অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা তাঁদের এ পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার অনুমোদন পেলে এটি সফল হওয়ার খুব ভালো সম্ভাবনা ছিল।
বার্নিয়ে এখানে পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার অনুমোদন বলতে যুদ্ধ-পরবর্তী ধাপে আহমাদিনেজাদকে সরাসরি তেহরানের ক্ষমতায় বসানো ও সেখানে একটি ‘বিকল্প সরকার’ সক্রিয় করার চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও অপারেশনাল অনুমোদন বুঝিয়েছেন। কেননা, আগেই ট্রাম্পের নিজের কিছু উপদেষ্টা আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর এ পরিকল্পনাকে ‘অসম্ভব’ মনে করেছিলেন। বিশেষ করে মার্কিন কর্মকর্তারা তাঁকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র সন্দিহান ছিলেন।
ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে যুদ্ধ শুরু হলেও, আহমাদিনেজাদ আহত হওয়া এবং মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একাংশের আপত্তির কারণে মোসাদের তৈরি করা সেই ‘ক্ষমতা বদলের চূড়ান্ত ছকটি’ বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রাজনৈতিক সবুজসংকেত আর পাওয়া যায়নি।
অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্