সৌদি আরবের ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এফআইআই) সম্মেলনে বক্তব্য দেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
সৌদি আরবের ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এফআইআই) সম্মেলনে বক্তব্য দেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, ২৮ অক্টোবর ২০২৫

খেলাধুলায় রাজনীতি কতটা প্রভাব রাখছে, এবারের বিশ্বকাপ কি সেই প্রমাণ দিয়ে গেল

প্রাচীন গ্রিস থেকে নাৎসি জার্মানির ইতিহাস বলছে, খেলাধুলা ও রাজনীতি সব সময় একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। তবু আন্তর্জাতিক ক্রীড়াকে রাজনীতিমুক্ত রাখার ধারণা এখনো টিকে আছে। কেন তা বাস্তবে সম্ভব হয় না, তা ব্যাখ্যা করেছেন কূটনীতি–বিশেষজ্ঞ জিওফ্রে অ্যালেন পিগম্যান। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব আর্ট অ্যান্ড আইডিয়াসের (আইএআই) ওয়েবসাইটে গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) প্রকাশিত তাঁর একটি লেখার বাংলা অনুবাদ ছাপা হলো।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও বেশি আয়ের আয়োজন ফিফা বিশ্বকাপ নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সমর্থক ও দর্শকদের অনেকে খেলা দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের বিপক্ষে গেছে বলে মনে করা এক রেফারির সিদ্ধান্ত বদলাতে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে সেই সিদ্ধান্ত বদলানো হয়েছে।

এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন জাগে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজনের লক্ষ্য কী? আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসলে কাদের স্বার্থে কাজ করে? এটি কি জনস্বার্থ রক্ষা করে? নাকি মূলত বৈশ্বিক দর্শকদের বিনোদন দেওয়া ও মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে একটি বড় ধরনের স্রেফ বাণিজ্যিক আয়োজন, যেখানে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতারা প্রয়োজনমতো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ক্রীড়াকে ব্যবহার করেন?

ক্রীড়ার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো ‘ফেয়ার প্লে’ বা ন্যায্য প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর অর্থ, খেলাধুলা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত থাকবে। কিন্তু যতই দাবি করা হোক না কেন, বাস্তবে ক্রীড়া ও রাজনীতিকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

হাজার বছরের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার সবচেয়ে ইতিবাচক রাজনৈতিক ব্যবহার দেখা গেছে কূটনীতির ক্ষেত্রে। অন্তত প্রাচীন অলিম্পিক আসরের সময় থেকে এর নজির পাওয়া যায়। সে সময় অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ‘একেখেইরিয়া’ বা অলিম্পিক যুদ্ধবিরতি চালু ছিল। এর ফলে প্রতিযোগী নগর ও রাষ্ট্রের নাগরিকেরা নিরাপদে অলিম্পিকে যাতায়াত করতে পারতেন। ন্যায্য প্রতিযোগিতার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথও খোলা থাকত।

কূটনীতি গবেষক জেমস ডের দেরিয়ান তাঁর ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘অন ডিপলোম্যাসি’ বইয়ে কূটনীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমানো এবং বিচ্ছিন্নতা দূর করার কথা বলেছেন।

গত এক শ বছরে প্রযুক্তিনির্ভর গণমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জনকূটনীতি বা পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রক্রিয়ায় বহুজাতিক কোম্পানির মতো সরকার ও রাষ্ট্রবহির্ভূত বিভিন্ন কূটনৈতিক পক্ষ আন্তর্জাতিক নীতির লক্ষ্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। একই সঙ্গে নিজেদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিও গড়ে তোলে।

ফিফা বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ তুলে দিচ্ছেন সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মিখাউ কোবিয়েরেৎস্কি ২০২০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’ বইয়ে ক্রীড়া কূটনীতিকে জনকূটনীতির অংশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার সঙ্গে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক দর্শক ও বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের ভোক্তারা সরাসরি যুক্ত থাকেন।

২০১৩ সালের এক গবেষণায় কূটনীতি গবেষক স্টুয়ার্ট মারে ও আমি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াকে কূটনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এবং ‘কূটনীতি হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া’—এই দুই ধারণার পার্থক্য তুলে ধরি। দ্বিতীয় ধারণাটি অনেক বিস্তৃত। অলিম্পিক বা ফিফা বিশ্বকাপের মতো আসরে খেলোয়াড়, দর্শক, সমর্থক ও সরকারি প্রতিনিধিদের পারস্পরিক মেলামেশা, যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে ওঠার মধ্যেও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে—এ কথাই আমরা দেখানোর চেষ্টা করেছি।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার সঙ্গে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক দর্শক ও বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের ভোক্তারা সরাসরি যুক্ত থাকেন।
মিখাউ কোবিয়েরেৎস্কি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

কূটনীতি গবেষক এইচ ই চেহাবি ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান ক্রীড়া কূটনীতি নিয়ে লেখা এক প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে দর্শক ও সমর্থকদের এই যোগাযোগকে ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের কূটনীতি’ বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে সরকার বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরানের গ্রুপ–জি ম্যাচের আগে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়াচ্ছেন এক ইরানি সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ইংলউডে লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে, ১৫ জুন ২০২৬

ওপরে কূটনীতির যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। এর চেয়ে বড় সমস্যা হলো, সরকার ও অন্যান্য পক্ষ প্রায় সময় কূটনীতির হাতিয়ার ব্যবহার করে কূটনীতির মূল উদ্দেশ্যকেই দুর্বল করে দেয়।

সরকারগুলো নিয়মিত জনকূটনীতিকে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ভুল তথ্য ছড়িয়ে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের আসল উদ্দেশ্য আড়াল করতে চায়। একই সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলারও চেষ্টা চালায়।

ক্রীড়া কূটনীতির ক্ষেত্রে এ ধরনের কৌশল বোঝাতে সাম্প্রতিক সময়ে ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ শব্দটি চালু হয়েছে। এর অর্থ, সরকার আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় বিনিয়োগ ও প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে নিজেদের ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক শাসনসহ নানা ক্ষেত্রে দুর্বল রেকর্ড থেকে বৈশ্বিক মনোযোগ সরিয়ে নেওয়াই এর লক্ষ্য।

স্টুয়ার্ট মারে তাঁর ২০১৮ সাল প্রকাশিত ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি: অরিজিনস, থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস’ নামের বইয়ে ‘স্পোর্টস অ্যান্টি–ডিপ্লোম্যাসি’ ধারণার কথা বলেন। এতে সরকারগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াকে আক্রমণাত্মক ও উগ্র জাতীয়তাবাদী লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। ইতিহাসে ন্যক্কারজনক উদাহরণ হিসেবে ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকের কথা বলা যায়, যেখানে অ্যাডলফ হিটলার তৃতীয় রাইখের গৌরব প্রচারে ক্রীড়াকে কাজে লাগিয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালের এল সালভাদর–হন্ডুরাস ‘ফুটবল যুদ্ধ’ এ রকম আরেকটি উদাহরণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে লাল কার্ড দেখাচ্ছেন ম্যাচের রেফারি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে পরে এই লাল কার্ডের কার্যকারিতা বাতিল করা হয়

আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার দাবি, তারা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখে এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করে। বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য ফিফার নীতিমালায় বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী সব দেশের খেলোয়াড়, দলের কর্মকর্তা ও দর্শকদের আয়োজক দেশ ও খেলার ভেন্যুতে অবাধ ও বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই স্পষ্ট হয়ে যায়, অভিবাসন নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ফিফার এই নীতির সংঘাত অনিবার্য। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের বসবাস, কাজ করা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দেশটিতে ভ্রমণের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কর্তৃপক্ষ ২০ থেকে ৪০টি দেশের নাগরিকদের প্রবেশে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সীমিত কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া এসব দেশের নাগরিকদের প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের অভিবাসীকে আটক করতে শুরু করে। অভিবাসীদের কারাগার, আটককেন্দ্র ও লেখকের ভাষায় কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বা বন্দিশালায় রাখা হয়। পরে তাঁদের অনেককে নিজ দেশ বা তৃতীয় কোনো দেশে ফেরত পাঠানো হয়, যেখানে অনেকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকিতে পড়ে।

সেনেগালের কাছে ৫–০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর সমর্থকদের অভিবাদন জানাচ্ছেন ইরাকের ফুটবলাররা। কানাডার টরন্টোয়, ২৬ জুন ২০২৬

ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও বেশি আয়ের বিশ্বকাপ আয়োজন নিশ্চিত করতে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো কূটনৈতিকভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তোলেন। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সহজ করতে তিনি নানা চেষ্টা চালান।

ট্রাম্পের অনুকম্পা পেতে ইনফান্তিনো একটি ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ চালু করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনের জন এফ কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টসে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে তিনি সেই পুরস্কার ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ ছিল ট্রাম্পের হাতে। আমার ধারণা, বহু আকাঙ্ক্ষিত নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ট্রাম্পকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

ক্রীড়ার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো ফেয়ার প্লে বা ন্যায্য প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর অর্থ, খেলাধুলা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত থাকবে। কিন্তু যতই দাবি করা হোক না কেন, বাস্তবে ক্রীড়া ও রাজনীতিকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

কিন্তু বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসে, পরিস্থিতি তত জটিল হতে থাকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে আগ্রাসন চালান। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এটি ছিল অবৈধ আগ্রাসন। মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের অনুশীলন ভেন্যু আজাদি স্টেডিয়াম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাম্প হামলার অজুহাত হিসেবে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইরান। কিন্তু এ দাবি ছিল মিথ্যা।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল শুরুর আগে স্টেডিয়ামের ভেতরের দৃশ্য। ১৯ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর দেখা যায়, ইনফান্তিনোর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আয়োজক দেশের প্রবেশের নীতি নিয়ে ফিফার নিয়ম মানেনি।

সোমালিয়ার নাগরিক ও বিশ্বকাপের রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেওয়া হয়নি। ইরানের জাতীয় ফুটবল দলও টুর্নামেন্টে যোগ দিতে নির্ধারিত সময়ের মাত্র ১০ দিন আগে ভিসা পায়। দলের সহায়ক কর্মীদের অনেকে ভিসা পাননি।

ইরানের দলের অনুশীলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা নির্ধারিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের মেক্সিকোর তিহুয়ানায় যেতে বলা হয়। অথচ গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মাঠে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ইরানি দলকে প্রতিটি ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেয়। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপর তাদের আবার মেক্সিকোয় ফিরে যেতে হয়।

ইরাক ও সুইজারল্যান্ডের ফুটবল দলকে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। ইরাক দলের এক আলোকচিত্রীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। হাইতি ও ইরানের সমর্থকদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারেননি। আরও অনেক দেশের বিপুলসংখ্যক দর্শকের ভিসার আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়।

কানাডাকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ১৬–এ নিশ্চিত করার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি। যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন স্টেডিয়ামে, ৪ জুলাই ২০২৬

ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কারণে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যেসব সংকটে পড়েছে, সেগুলো এড়ানোর একাধিক সুযোগ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র আয়োজক দেশের জন্য প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা মানবে না, এটি স্পষ্ট হওয়ার পর ফিফা চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে নির্ধারিত ম্যাচগুলো মেক্সিকো ও কানাডায় সরিয়ে নিতে পারত। তিন দেশই ছিল এবারের বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ট্রাম্পনির্ভর অবস্থানের কারণে সংস্থাটি এমন সিদ্ধান্ত নেবে না, সেটিও এক পর্যায়ে স্পষ্ট হয়ে যায়। তখন দায়িত্ব এসে পড়ে জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোর ওপর। বিশেষ করে ফ্রান্স, স্পেন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মরক্কো, ইংল্যান্ড ও জার্মানির মতো শিরোপাপ্রত্যাশী দেশগুলো একজোট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শর্তে খেলতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত। অন্তত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে লিখিত ও বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা চাইতে পারত, বিশ্বকাপে প্রবেশাধিকার নিয়ে ফিফার নীতিমালা মেনে চলতে হবে।

প্রশ্ন হলো, ফিফা বা জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন কেউ খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, রেফারি, সমর্থক ও দর্শকদের স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে এল না কেন?

এর মূল কারণ পুঁজিবাদের অবিরাম মুনাফার চাপ। নিয়মনীতি, নৈতিকতা ও ফেয়ার প্লের চেয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফিফা, স্পনসর, বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম ও আয়োজক শহরগুলোর আর্থিক লাভই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পেয়েছে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের পর ভাই কেইনের সঙ্গে উদ্‌যাপন করছেন স্পেনের তারকা লামিনে ইয়ামাল

ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বকাপকে সংস্থার জন্য বিপুল আয়ের সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। ফিফার অনুমান, তাদের ২০২৩–২৬ বাজেটে সংস্থাটির আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। আগের পূর্বাভাসে তা ছিল ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা আগের বাজেটের তুলনায় প্রায় ৭২ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে শুধু এবারের বিশ্বকাপ থেকেই ফিফার আয় প্রায় ৮৯০ কোটি ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে টেলিভিশন সম্প্রচারস্বত্ব থেকে এসেছে ৩৯২ কোটি ডলার, স্পনসরশিপ থেকে ২৬৯ কোটি ডলার ও টিকিট বিক্রি থেকে ৩১০ কোটি ডলার। এ ছাড়া লাইসেন্সিং অধিকার ও অন্যান্য উৎস থেকেও আয় হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে দর্শক ও সমর্থকদের মধ্যে একধরনের স্বাধীন যোগাযোগ তৈরি হয়। এটিকে জনগণের সঙ্গে জনগণের কূটনীতি বলা যায়, সরকার বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বাইরে।
এইচ ই চেহাবি, কূটনীতি গবেষক

ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) যৌথ এক গবেষণা বলছে, এবারের বিশ্বকাপ বৈশ্বিক জিডিপিতে চার হাজার কোটি ডলারের বেশি অবদান রাখবে। এর মধ্যে তিন আয়োজক দেশে বিদেশি দর্শকদের সরাসরি ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হওয়ায় এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।

ওই গবেষণার মতে, ফিফা বিশ্বকাপ এখন বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে লাভজনক নিয়মিত বাণিজ্যিক আয়োজন।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে, ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি

ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বকাপকে স্পোর্টস অ্যান্টি–ডিপ্লোম্যাসির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এতে খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সমর্থক ও দর্শকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তা সত্ত্বেও এবারের বিশ্বকাপে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে ওঠার ধারা থেমে থাকেনি।

এবারের বিশ্বকাপে জনগণের সঙ্গে জনগণের কূটনীতির অসংখ্য উদাহরণ দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের বাসিন্দাদের পাশাপাশি মেক্সিকো ও কানাডার জনগণও তাঁদের দেশে আসা বিদেশি খেলোয়াড়, তাঁদের পরিবার ও সমর্থকদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অনুশীলন ভেন্যুতে উৎসবের আমেজ লক্ষ করা গেছে।

ভিন্ন ভিন্ন দেশের সমর্থকেরা একসঙ্গে স্টেডিয়ামে খেলা দেখেছেন। ওয়াচ পার্টি বা বিভিন্ন দলের সমর্থকদের বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন, পানশালা ও আয়োজক শহরগুলোর ফুটবলকেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠানে মিলেমিশে অংশ নিয়েছেন।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬–এর ফাইনালে দ্বিতীয়ার্ধে পানি পানের বিরতির সময় আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি (মাঝে) ও স্পেনের মার্ক কুকুরেয়া (বাঁয়ে)। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে, ১৯ জুলাই ২০২৬

বোস্টনের মানুষের সঙ্গে স্কটল্যান্ডের ‘টারটান আর্মি’ সমর্থকদের বন্ধুত্ব এমনই একটি উদাহরণ। ফুটবল যে মানুষকে কাছাকাছি আনে, এতে সেটির প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশ্বকাপ শেষ হলেও বিভিন্ন মহাদেশের মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা এই বন্ধুত্ব দীর্ঘদিন টিকে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবু এই অর্জনও নিখুঁত নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল সমর্থক বায়রন পিলে আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ফুটবলকে সুন্দর খেলা বলা হয়। কারণ, এটি মানুষকে একত্র করে। মাঠের বাইরে যখন রাজনীতি আর যুদ্ধের ভাষা আধিপত্য বিস্তার করে, বিশেষ করে আয়োজক কোনো দেশ যদি সেই পরিস্থিতির কেন্দ্রে থাকে, তাহলে সেই সৌন্দর্যে বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।’

২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের আগে আইওসির উচিত এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। তা না হলে ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকের মতো এবার ট্রাম্পকে ঘিরে নতুন এক রাজনৈতিক প্রদর্শনী শুরু হতে পারে।

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া নানা ধরনের কূটনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটিই আছে। তাই একে পুরোপুরি বেসরকারি পরিসরের বিষয় হিসেবে দেখা যায় না। শুধু মুনাফাকেন্দ্রিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়াও ঠিক নয়।

২০১৮ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে (বাঁ থেকে) সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয়, ১৪ জুন ২০১৮

বিভিন্ন দেশের সরকার কিংবা জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমানোর সুযোগ যত দিন থাকবে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার সঙ্গে জনস্বার্থও তত দিন জড়িত থাকবে। আবার ফিফা, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি), বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম ও স্পনসর প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া এত বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বাস্তবায়ন করাও কঠিন। ফলে এই ক্ষেত্রে জনস্বার্থ ও বেসরকারি স্বার্থকে পাশাপাশি চলতেই হবে। কখনো অংশীদার হিসেবে, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে, আবার কখনো ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে।

২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের আগে আইওসির উচিত এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। তা না হলে ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকের মতো এবার ট্রাম্পকে ঘিরে নতুন এক রাজনৈতিক প্রদর্শনী শুরু হতে পারে।

আইওসি ও জাতীয় অলিম্পিক কমিটিগুলোর উচিত ট্রাম্প প্রশাসনকে স্পষ্ট শর্ত দেওয়া। সেই শর্ত না মানলে কী পরিণতি হবে, সেটিও আগেভাগে জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে অলিম্পিক বাতিল করার সিদ্ধান্তও বিবেচনায় রাখা উচিত। এসব করার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কারণ, বিশ্বকাপের মতো ওই অলিম্পিকের জন্য বিকল্প কোনো দেশের শহর প্রস্তুত নেই, যেটি লস অ্যাঞ্জেলেসের পরিবর্তে দায়িত্ব নিতে পারে।