
ইরানে মার্কিন সেনা পাঠানোর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছেলে এবং আরব রাজপরিবারগুলোর সদস্যদের পশ্চিমা দেশগুলো থেকে তাড়িয়ে যুদ্ধের সম্মুখসমরে মোতায়েন করতে বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ৩৪ বছর বয়সী ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে কাটাচ্ছেন। অথচ তিনি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ‘রিজার্ভ’ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্য। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াইনেট নিউজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইয়ার তাঁর মা সারার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে অবস্থান করছিলেন।
নিজের পডকাস্ট ‘ওয়ার রুম’-এ ব্যানন বলেন, ‘মিয়ামিতে থাকা নেতানিয়াহুর ছেলেকে কালই বের করে দিন। যখন তাঁদের আমাদের দরকার, তখন স্বরাষ্ট্র দপ্তর (ডিএইচএস) কোথায়? ওকে তাড়িয়ে দেশে পাঠিয়ে দাও। ওকে ইউনিফর্ম পরিয়ে দিন। ওকে যেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে রাখা হয়।’
ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১২’ নিউজ এক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালেও ইসরায়েল সেখানে কোনো সেনা পাঠাবে না।
ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১২’ নিউজ এক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালেও ইসরায়েল সেখানে কোনো সেনা পাঠাবে না। এই খবর প্রচারের পরই সোমবার অনলাইনে ব্যাননের এই মন্তব্য সামনে আসে।
ইরানে হামলা চালাতে ইসরায়েলই যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করেছে বলে একটি ধারণা ব্যাপকতা পেয়েছে। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, ইসরায়েল একাই হামলা করতে যাচ্ছিল বলে মার্কিন সেনারা ঝুঁকির মুখে পড়ত। তাই যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই অভিযান শুরু করে।
ইরানে যাতে হামলা চালানো না হয়, সে জন্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো ট্রাম্পের কাছে তদবির করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে উপসাগরীয় এসব দেশে থাকা মার্কিন অবস্থানে কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে তেহরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক অভিযানে ইতিমধ্যে কিছু উপসাগরীয় দেশ সমর্থন দিচ্ছে। ‘মিডল ইস্ট আই’ প্রথম প্রকাশ করে যে সৌদি আরব দেশটির ‘কিং ফাহাদ বিমানঘাঁটি’ মার্কিন বাহিনীর ব্যবহারের জন্য খুলে দিয়েছে।
ইসরায়েল আমাদের নিয়ে খেলছে। আরবরা আমাদের নিয়ে খেলছে। ইউরোপীয়রাও আমাদের নিয়ে খেলছে। আর আমরা কী করছি? আমরা সেখানে সৈন্য পাঠাচ্ছি, সেটা ঠিক আছে। ‘অপারেশন ভিক্টরি’ নিয়ে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে আরও বিকল্প ও উপায় থাকা জরুরি।—স্টিভ ব্যানন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক প্রধান কৌশলবিদ
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দখলদারির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর পাল্টা আঘাত হানতে প্রকাশ্যে দাবি জানিয়ে আসছে আমিরাত। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ইউসেফ আল-ওতাইবা ইরানের সঙ্গে ‘সাধারণ কোনো যুদ্ধবিরতির’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
স্টিভ ব্যানন বলেন, যেসব আরব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে স্থল অভিযান চায়, তাদেরও সেনা পাঠানো উচিত। মার্কিন সেনারা যখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, তখন উপসাগরীয় শাসকেরা বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন।
ব্যানন বলেন, ‘আমি আরবদের (যুদ্ধে) চাই। আমি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে চাই, এমবিজেড–কে (মোহাম্মদ বিন জায়েদ) চাই, যাঁর হাতে একটি সত্যিকারের সেনাবাহিনী আছে। তারা খুব বড় না হলেও লড়তে জানে। খারগ দ্বীপ তোমাদের লক্ষ্যবস্তু, যাও!’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক এই প্রধান কৌশলবিদ আরও বলেন, ‘এর সঙ্গে কয়েকজন কাতারি প্রিন্সকেও যুক্ত করুন। সৌদি প্রিন্সদেরও সেখানে পাঠান। তাঁদের লন্ডন থেকে বের করে দিন। লন্ডনের ক্যাসিনো এবং বারবনিতালয়গুলো থেকে তাঁদের বিদায় করুন। তাঁদের উপসাগরীয় অঞ্চলে ফেরত পাঠাও।’
স্টিভ ব্যানন দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশের মাটিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে আসছেন। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন তিনি, যে প্রচারণার মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশের যুদ্ধের নিন্দা জানানো। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি প্রধান কৌশলবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৭ সালে পদত্যাগ করেন।
ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে ব্যানন এই প্রথম তুলাধোনা করলেন তেমন নয়। তিনি একদিকে যেমন ট্রাম্পের পক্ষে লড়ছেন, অন্যদিকে বিদেশের যুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকেও কাজে লাগাচ্ছেন। এই দুইয়ের মধ্যে তিনি এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করে চলছেন।
চলতি মাসের শুরুর দিকে স্টিভ ব্যানন বলেন, ‘ইসরায়েল আমাদের নিয়ে খেলছে। আরবেরা আমাদের নিয়ে খেলছে। ইউরোপীয়রাও আমাদের নিয়ে খেলছে। আর আমরা কী করছি? আমরা সেখানে সৈন্য পাঠাচ্ছি, সেটা ঠিক আছে। “অপারেশন ভিক্টরি” নিয়ে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে আরও বিকল্প ও উপায় থাকা জরুরি।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাবেক এই প্রধান কৌশলবিদ বলেন, ‘আমি যুদ্ধের সম্মুখভাগে আরবদের দেখতে চাই। খারগ দ্বীপে হামলার প্রথম ধাপে আমি আরব আমিরাতকে সেখানে চাই।’
গত জুনে ইরানে হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন ব্যানন। তিনি প্রায়ই ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘আশ্রিত রাষ্ট্র’ বলে কটাক্ষ করেন। তবে তিনি ট্রাম্পের ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্তের সরাসরি নিন্দা না জানিয়ে বেশ সতর্কভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন।
এর আগে স্টিভ ব্যানন বলেছিলেন, ইসরায়েলের বোমা হামলা ট্রাম্পের লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প চাইছেন ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে, কিন্তু দেশটিকে অখণ্ড রাখতে।