যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ দিচ্ছেন। ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল ভবনে, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ দিচ্ছেন। ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল ভবনে, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণ: দাবি ও অভিযোগের যত ফুলঝুরি ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল ভবনের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস চেম্বার থেকে আজ বুধবার ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ দিয়েছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ ভাষণেও তিনি যথারীতি নানা সত্য–মিথ্যা দাবি ও অভিযোগ করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ এটি। প্রথা অনুযায়ী, মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের (প্রতিনিধি পরিষদ) যৌথ অধিবেশনে তিনি এই ভাষণ দেন।

ট্রাম্প যখন ভাষণ শুরু করেন, তখন তাঁর সমর্থকেরা ‘ইউএসএ’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। এ ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো:

অভিবাসন, অর্থনীতি ও অপরাধ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ভাষণের শুরুতে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত বন্ধ রাখা, অর্থনীতির এগিয়ে চলা ও অপরাধ কমার বিষয় জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

দেশজুড়ে অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে কমার কৃতিত্বও দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি জটিল। তাঁদের মতে, কোভিড মহামারির সময় অপরাধের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল এবং এর পর থেকেই এর নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

ট্রাম্প দাবি করেন, ‘আজ আমাদের সীমান্ত নিরাপদ। দেশের উদ্যম ফিরেছে। মূল্যস্ফীতি কমছে। আয়ও দ্রুত বাড়ছে। অর্থনীতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জোরোলোভাবে এগোচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শত্রুরা এখন ভয় পাচ্ছে। আমাদের সেনা ও পুলিশ শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্বে আবার যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা বেড়েছে।’

ট্রাম্প আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য দেশের সীমান্ত বন্ধ করার সিদ্ধান্তের ওপর জোর দেন। তবে অভিবাসীদের ব্যাপক হারে বহিষ্কার করার কর্মসূচির কথা ভাষণে উল্লেখ করেননি। তাঁর এ কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্প ‘বৈধ’ অভিবাসনের পক্ষে তাঁর অবস্থানের কথা মার্কিন আইনপ্রণেতাদের জানান। যদিও সম্প্রতি ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা স্থগিত করেছে ওয়াশিংটন।

দেশজুড়ে অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে কমার কৃতিত্বও দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি জটিল। তাঁদের মতে, কোভিড মহামারির সময় অপরাধের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল এবং এর পর থেকেই এর নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

শত্রুরা এখন ভয় পাচ্ছে। আমাদের সেনা ও পুলিশ শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্বে আবার যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা বেড়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট

মেমফিস, নিউ অরলিন্স ও ওয়াশিংটন ডিসির মতো বড় শহরগুলোয় অপরাধ কমার উদাহরণ টেনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, এটা গত বছর তাঁর ন্যাশনাল গার্ড ও ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী মোতায়েনের ফলাফল।

সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ‘দুর্ভাগ্যজনক’

বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্বে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। এর মধ্যে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অতিসম্প্রতি এ শুল্কের বড় অংশকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেছেন।

এ প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প ভাষণে বলেন, তাঁর শুল্ক নীতির বড় অংশ অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক আদেশ ‘দুর্ভাগ্যজনক’। তিনি বলেন, ‘মাত্র চার দিন আগে এ আদেশ এসেছে। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও বলেন, অন্য আইনি ধারার মাধ্যমে বাণিজ্য শুল্ক বহাল রাখা হবে। এ জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে না।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ইউনাইটেড স্টেটস ক্যাপিটলের হাউস চেম্বারে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ দিচ্ছেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল

লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি তেল পাওয়ার বিষয়টিও ট্রাম্পের ভাষণে উঠে এসেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা আমাদের নতুন বন্ধু ও অংশীদার ভেনেজুয়েলা থেকে ৮ কোটি ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল পেয়েছি।’

এ বছরের শুরুর দিকে কারাকাসে সামরিক অভিযান চালিয়ে সস্ত্রীক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন বিশেষ বাহিনী। এরপর দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন দেলসি রদ্রিগেজ। বর্তমানে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে সহায়তা করার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।

আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বিশ্বে আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন, এমন দাবি ট্রাম্প আগেও করেছেন। এবার ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে সেই দাবি পুনর্ব্যক্ত করলেন এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

এর মধ্যে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধবিরতিকে নিজের সাফল্য হিসেবে আইনপ্রণেতাদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘গাজায় এখন খুবই স্বল্প পরিসরে যুদ্ধ চলছে। এটা প্রায় শেষের দিকে।’ উল্লেখ্য, ভঙ্গুর এ যুদ্ধবিরতির মধ্যে গাজায় প্রায়শ ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনিরা প্রাণ হারাচ্ছেন।

ট্রাম্প বলেন, গাজায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারণেই হামাসের হাতে থাকা বাকি ইসরায়েলি জিম্মিদের সবাইকে মুক্ত করা গেছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়েছে

গত বছর যখন ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ চলছিল, তখন ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রও। সেই প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের এমন বক্তব্য তাঁরই মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের পুরোপুরি বিপরীত। এ সপ্তাহের শুরুর দিকে উইটকফ বলেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে ‘সপ্তাহখানেক’ পিছিয়ে আছে।

গাজায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারণেই হামাসের হাতে থাকা বাকি ইসরায়েলি জিম্মিদের সবাইকে মুক্ত করা গেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট

এমনকি ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিসরে সামরিকায়নের কাজ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাক যুদ্ধের পর ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের এত সামরিক শক্তি জড়ো করার ঘটনা আর ঘটেনি।

ভাষণে ট্রাম্প এটাও বলেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে; যেটা মার্কিন ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারবে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো তথ্যপ্রমাণ দেননি তিনি।

এআই তথ্যভান্ডার প্রসঙ্গ

প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বৃহৎ আকারের ও অনেক বিদ্যুৎ খরচ হয়—এমন এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ডেটা সেন্টার বা তথ্যভান্ডার নির্মাণ করছে বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর জন্য বাধ্যবাধকতা থাকবে বলে জানান তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে জানাচ্ছি, নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা নিজেদেরই মেটাতে হবে।’