
তাইওয়ানের কাছে সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে সেখানকার প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের সঙ্গে কথা বলার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের প্রচলিত কূটনৈতিক রীতি ভেঙে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের নিলেন।
১৯৭৯ সালে চীন সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট তাইওয়ানের কোনো নেতার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেননি।
তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে চীন এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটি দখলের বিষয়টিও তারা নাকচ করেনি।
২০২৪ সালে ক্ষমতা নেওয়া তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বীপটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ নিয়েছেন।
১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ পাস করে। এই আইনে উল্লেখ রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে ‘আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সরবরাহ’ করতে পারবে। এই আইনের কারণেই ওয়াশিংটন তাইওয়ানের কাছে ক্রমাগত অস্ত্র বিক্রি করে আসছে।
আইন অনুযায়ী তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহে বাধ্য থাকলেও বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে সব সময় একটি ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়।
গতকাল বুধবার তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে লাই চিং-তের সঙ্গে কথা বলবেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলব। আমি সবার সঙ্গেই কথা বলি...আমরা তাইওয়ান সমস্যাটি নিয়ে কাজ করব।’
একই সঙ্গে গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে দুই দিনের দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে ‘অসাধারণ’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
এর আগে গত সপ্তাহে বেইজিং সফর শেষে এয়ারফোর্স ওয়ানে ফেরার পথেও তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমি একটি সিদ্ধান্ত নেব। বর্তমানে তাইওয়ান যিনি চালাচ্ছেন, আপনারা জানেন তিনি কে, তাঁর সঙ্গে আমাকে কথা বলতে হবে।’
প্রতিরক্ষা জোরদারে তাইওয়ানের কাছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে রয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে ড্রোন-বিধ্বংসী সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা গেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিং বর্তমানে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবির প্রস্তাবিত চীন সফর আটকে দিয়েছে। চীনের দাবি, ট্রাম্প এই অস্ত্রচুক্তির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন, তা না দেখা পর্যন্ত তারা এই সফরের অনুমোদন দেবে না।
বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সফরের সময় চীন স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে মার্কিন-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংবেদনশীল ইস্যু হলো তাইওয়ান। সি চিন পিং সতর্ক করে বলেছিলেন, বিষয়টি সঠিকভাবে সামলানো না গেলে দুই পরাশক্তির মধ্যে ‘সংঘাত’ তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সংঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে সি চিন পিং তাইওয়ান নিয়ে ‘খুবই কঠোর’ অবস্থানে আছেন। এ বিষয়ে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কোনো পক্ষকেই কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি।’
ট্রাম্প-সি বৈঠকের পর তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এক বিবৃতিতে বলেছেন, তাইওয়ান একটি ‘সার্বভৌম, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ’ এবং তাইওয়ান প্রণালির শান্তিকে কোনো কিছুর বিনিময়ে ‘উৎসর্গ বা লেনদেন’ করা হবে না।
লাই চিং–তে জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন অস্ত্র বিক্রি এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি অন্যতম ‘মূল চাবিকাঠি’।
অবশ্য ট্রাম্পের জন্য এমন কূটনৈতিক রীতি ভাঙার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৬ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তাইওয়ানের তত্কালীন নেতা সাই ইং-ওয়েনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন, যা নিয়ে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
এ ছাড়া ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি সি চিন পিংয়ের সঙ্গে এই অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে ‘বিস্তারিত আলোচনা’ করেছেন। এ কথা সত্য হলে সেটিও হবে মার্কিন নীতিমালার এক বড় লঙ্ঘন। কারণ, ১৯৮২ সালের এক চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আশ্বস্ত করেছিল যে তারা তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করবে না।
বেইজিং থেকে ফেরার পথে এই প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা তো অনেক আগের কথা।’ গত বছরের ডিসেম্বরেও যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিল, যা বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপ মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট লাইয়ের অধীনে তাইওয়ান তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট রেকর্ড পরিমাণে বাড়িয়েছে।
তাইওয়ানের অধিকাংশ নাগরিক নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করলেও, তারা মূলত বর্তমানে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষে; যার অর্থ হলো, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাও দেবে না, আবার চীনের সঙ্গে একীভূতও হবে না।