মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হতে চেয়ে কেন যুদ্ধের পথে হাঁটলেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার বিকেলে (যুক্তরাষ্ট্রের সময়) যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন তিনি এয়ারফোর্স ওয়ানে। উড়োজাহাজটি টেক্সাসের কর্পাস ক্রিস্টি শহরের দিকে যাচ্ছিল।

ওই বন্দরনগরীতে ‘যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি আধিপত্য’ শীর্ষক একটি বক্তৃতা দিতে যাচ্ছিলেন ট্রাম্প। প্রায় তিন ঘণ্টার সেই ফ্লাইটে তিনি টেক্সাসের রিপাবলিকান রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন, ইরান নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এ রাজনীতিবিদদের মধ্যে কট্টরপন্থী দুই সিনেটর জন করনিন ও টেড ক্রুজও ছিলেন।

অপারেশন এপিক ফিউরির (ইরানে অভিযান) প্রস্তুতির সময় প্রেসিডেন্টের ওই উড়োজাহাজে আরও একজন ছিলেন। তিনি হলেন প্রবীণ চলচ্চিত্র তারকা ডেনিস কোয়েড।

ফ্লাইটের একপর্যায়ে টেড ক্রুজ একটি ভিডিও ধারণ করেন। সেখানে দেখা যায়, কোয়েড মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশে বসে আছেন। ক্রুজ ওই অভিনেতাকে অনুরোধ করেন, যেন তিনি ২০২৪ সালে যেভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগ্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তা যেন এখন সেখানে করে দেখান। ক্রুজ ওই মুহূর্তকে ‘দুই মহান মার্কিন প্রেসিডেন্টের’ সাক্ষাতের মতো করে দেখাতে চাইছিলেন।

কোয়েড তখন রোনাল্ড রেগ্যান চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন; বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প আমার মতোই শক্তিশালী।’ এটি ছিল রিপাবলিকান কট্টরপন্থীদের প্রতীকী নেতা রেগ্যান থেকে তাঁদের বর্তমান নায়ক ট্রাম্পের কাছে ক্ষমতা ও ভাবমূর্তির নাটকীয় হস্তান্তর।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কোয়েড ২০০৬ সালে ‘আমেরিকান ড্রিমজ’ চলচ্চিত্রে জর্জ ডব্লিউ বুশের একটি ব্যাঙ্গাত্মক চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। সেখানে তাঁকে দেখানো হয় এক অজ্ঞ, সরল ধাঁচের প্রেসিডেন্ট হিসেবে, যাঁকে যুদ্ধপ্রবণ ও তেললোভী উপদেষ্টারা ইরাকে আক্রমণ করতে প্ররোচিত করেছিলেন।

গত সপ্তাহের ঘটনাগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে জর্জ ডব্লিউ বুশের কর্মকাণ্ডেরই ছায়া দেখা গেছে, যদিও এ ধরনের তুলনাগুলোকে হোয়াইট হাউস স্বীকার করেনি বা ক্ষোভের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে নিজেকে এমন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন যে তিনি বুশের শুরু করা আফগানিস্তান, ইরাক ও অন্যান্য স্থানের ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ থামাবেন। তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন গড়েই উঠেছিল বিদেশে হস্তক্ষেপবিরোধী মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে। ২০২৫ সালের বেশির ভাগ সময় ট্রাম্প নিজেই নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক অভিযানের সময় মার-এ-লাগো রিসোর্টে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সেই ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ যুদ্ধে জড়ালেন কয়েক মাসের মধ্যে। ট্রাম্প হলেন বুশের পর প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি একটি প্রতিপক্ষ দেশের শাসকগোষ্ঠীকে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন।

অপারেশন এপিক ফিউরি অভিযানের আগে ট্রাম্পের মনোভাবে এই পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ আছে। এর মধ্যে ছিল বিদেশি শক্তিশালী নেতাদের কথায় ট্রাম্পের সহজে প্রভাবিত হওয়া, সমস্যা থেকে মনোযোগ সরাতে নাটকীয়তা তৈরি করার সক্ষমতা, একরোখা প্রতিপক্ষ।

ট্রাম্প আসলে আংশিকভাবে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বজায় রেখেছিলেন। তিনি মূলত বিপুলসংখ্যক স্থল সেনা মোতায়েন করে বড় আকারে স্থলযুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদ চলাকালে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করে ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়েছিলেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে গত জুনে ইরানে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামের অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালানো হয়।

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যেন নিজের হাতে থাকা বিশাল সামরিক শক্তি নিয়ে নেশায় মেতেছেন।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল গত ৩ জানুয়ারি। গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তবে ওই অভিযানে কোনো মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে নিজেকে এমন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন যে তিনি বুশের শুরু করা আফগানিস্তান, ইরাক ও অন্যান্য স্থানের ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ থামাবেন। তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন গড়েই উঠেছিল বিদেশে হস্তক্ষেপবিরোধী মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে। ২০২৫ সালের বেশির ভাগ সময় ট্রাম্প নিজেই নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

অভিযানটি ব্যর্থও হতে পারত। কারণ, বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা যেসব হেলিকপ্টারে করে ভেনেজুয়েলায় গিয়েছিলেন, তার একটির পাইলটের শরীরের নিচের অংশে কয়েকবার গুলি লেগেছিল। তবে তিনি হেলিকপ্টারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। যদি হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হতো, তাহলে এতে থাকা সব আরোহী হয়তো মারা যেতেন। তখন হয়তো অভিযান বাতিল হতো এবং ট্রাম্প হয়তো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইচ্ছা হারাতেন।

মাদুরোকে অপহরণ করার ঘটনাটি ট্রাম্পের কাছে টিভি সিরিজের মতো নাটকীয় ছিল। এটিকে এক বীরত্বগাথা হিসেবে দেখা হলো। এ ঘটনায় অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মনোযোগ গেল সরে। বিশেষ করে, প্রয়াত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যে চাপ ছিল, তা থেকে মানুষের মনোযোগ ঘুরে গেল। নথিগুলোতে ৩৮ হাজার বা তারও বেশিবার ট্রাম্পের নাম এসেছে; যদিও তিনি বারবারই নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে আসছেন।

অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে বিদেশে সামরিক অভিযান চালানো হলেও তা শুধু পারমাণবিক বা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। তবে এটাই ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল ঝুঁকি হিসেবে থেকে গেল।

যুদ্ধ কখন শুরু হবে, তা কেবল প্রেসিডেন্টই ঠিক করতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা অন্যরাও নির্ধারণ করতে পারবে। বিশেষ করে এখন যুদ্ধ শেষ হওয়া না হওয়ার বিষয়টি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ওপরও নির্ভর করছে।

ইরানে শাসক পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত এ যুদ্ধে ট্রাম্পকে যুক্ত করতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহু ডিসেম্বরের শেষের দিকে যখন মার–এ–লাগোতে ট্রাম্পের কাছে গিয়েছিলেন, তখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে আরও বেশি করে ইসরায়েলি হামলা চালানোর অনুমতি চান। ট্রাম্প তাতে সমর্থন দেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই সমর্থনের পরিসর বেড়ে তা ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের জন্য একটি যৌথ হামলার প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়।

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার অভিযান সফল হওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পের সামরিক আকাঙ্ক্ষা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। অর্থনৈতিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে ইরানে যখন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, ট্রাম্প তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন যে ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে চড়া মূল্য দিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘সহায়তা আসছে’। তখনো ট্রাম্প আসলে এমন প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পূরণ করার অবস্থায় ছিলেন না।

ওই সময় ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরি ছিল না, সেখানে যুদ্ধবিমানের সংখ্যা সীমিত ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা প্রায় ৪০ হাজার সেনা যেসব ঘাঁটিতে রয়েছে, সেগুলোও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মতো অবস্থায় ছিল না।

অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে বিদেশে সামরিক অভিযান চালানো হলেও তা শুধু পারমাণবিক বা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। তবে এটাই ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল ঝুঁকি হিসেবে থেকে গেল।

বিক্ষোভের মাত্রা ও তীব্রতা ইরানের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ধারণা বদলে দেয়। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ইরানের শাসকগোষ্ঠী পতনের দিকে যেতে পারে, এমনও হতে পারে যে এতে ইরানের ক্ষমতা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের জেনারেলদের হাতে চলে যেতে পারে এবং আয়াতুল্লাহদের প্রভাব কমে যেতে পারে। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করেছিল যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত আরও বাস্তবমুখী হবে এবং দরকার হলে কোনো চুক্তিতেও যেতে ইচ্ছুক হবে।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্পকে একাধিকবার ফোন করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছেন। যদিও তিনি প্রকাশ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে ছিলেন।

ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেন। তখন ইরানে শাসনগোষ্ঠীর পরিবর্তনের ধারণাটি সবচেয়ে জুতসই বিকল্প হয়ে উঠল। ইতিমধ্যে কিছু সপ্তাহ ধরে যৌথ পরিকল্পনা চলছিল। দ্বিতীয় মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে পৌঁছার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরও কিছু সময় লাগল।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করতেন যে তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি–সংক্রান্ত হুমকির কূটনৈতিক সমাধান চাইছেন। যদিও ট্রাম্প বলছিলেন যে সেই হুমকি তিনি আগে ‘শেষ’ করে ফেললেও তা আবার গড়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার ফেব্রুয়ারি মাসে তিনবার ইরানের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে দুই পক্ষের প্রাথমিক অবস্থানের ফারাক এতটাই বড় ছিল যে ব্যবধান ঘুচিয়ে আনা সম্ভব ছিল না।

২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় চূড়ান্ত বৈঠকে ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের কর্মকর্তারা তেহরানের নজিরবিহীন ছাড়গুলোর দিকে ইঙ্গিত করেন। যেমন উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দেওয়া। তবে ট্রাম্প চাইছিলেন আরও বেশি কিছু। যেমন তিনি চাইছিলেন যে ইরানের ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধকরণ স্থায়ীভাবে বন্ধ হোক এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ হোক। উইটকফ ফক্স নিউজকে বলেন, তারা কেন তা মেনে নেয়নি, তা প্রেসিডেন্ট বুঝতে পারছিলেন না।

গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার জেনেভায় যখন প্রতিনিধিদলগুলো মিলিত হয়, তত দিনে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারে সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছিল। বুশের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের ২৩ বছর পর এটি ছিল সবচেয়ে বড় আকারের মোতায়েন। শত্রুপক্ষকে শর্ত মেনে নিতে রাজি করানো ছাড়াই যদি কূটনৈতিক সমাধান করা হতো, তবে তা দুর্বলতা বলে গণ্য হতে পারত।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন

কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত ২৫ ফেব্রুয়ারি হামলা চালানোর কথা ছিল। তবে জেনেভায় পরবর্তী দিনের বৈঠকের জন্য তা স্থগিত করা হয়। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা আরও পেছানো হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রীয় কম্পাউন্ডে থাকবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।

ট্রাম্প এয়ারফোর্স ওয়ানে বসে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বেলা ৩টা ৩৮ মিনিটের দিকে হামলা শুরু করার নির্দেশ দেন। আদেশে লেখা ছিল, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি অনুমোদনপ্রাপ্ত। এটা বাতিল হবে না। শুভকামনা।’

২০ মিনিটের কম সময়ের মধ্যে ট্রাম্প কর্পাস ক্রিস্টিতে অবতরণ করেন। হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে এখন বলতে চাই না। আপনারা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংবাদ পেতে পারেন।’

কর্পাস ক্রিস্টিতে ভাষণের পর প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সফরসঙ্গীরা মার–এ–লাগোতে চলে যান।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ততক্ষণে সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ ও জেনারেল ড্যান কেইন (যিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর যৌথ কমান্ডের প্রধান) ততক্ষণে পাম বিচে পূর্বঘোষণা ছাড়াই অবতরণ করেছিলেন। ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য মার–এ–লাগোতে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা একটি পর্যবেক্ষণকক্ষে ছিলেন তাঁরা। সেই একই জায়গায় বসে ট্রাম্প গত মাসে মাদুরো আটকের অভিযানের দৃশ্য দেখেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে সিরিয়ার ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিলেন। তখন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের রিসোর্টে ছিলেন। চকলেট কেক খাচ্ছিলেন তাঁরা। ট্রাম্পের ভাষায়, সেটি ছিল সবচেয়ে ‘সুন্দর চকলেট কেক’। সে কারণে অনেকে মার–এ–লাগোকে ‘ওয়ার–এ–লাগো’ বলে ডাকতে শুরু করেছিলেন।

গত শুক্রবার ফ্লোরিডায় সূর্যাস্তের সময় দাতব্য তহবিল সংগ্রহের একটি অনুষ্ঠানে অতিথিরা নাচছিলেন। গাঢ় স্যুট ও ‘ইউএসএ’ লেখা সাদা টুপি পরে সেখানে হাজির হন ট্রাম্প।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের কারণে তিনি ব্যস্ত, তাই নির্ধারিত দাতব্য নিলাম বাতিল হতে পারে। ট্রাম্প সেখানে উপস্থিত থাকা মানুষদের উদ্দেশে বলেন, ‘ভালো সময় কাটান। আমাকে কাজ করতে হবে।’

ট্রাম্প এই বিশাল হামলাকে ইরানি জনগণের জন্য ৪৭ বছরের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের কথা কমিয়ে এনেছে; কিন্তু ট্রাম্প এখনো যুদ্ধ চালাতে অবিচল। তাঁর দাবি, তাঁর কাছে প্রায় অফুরান অস্ত্রভান্ডার আছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট, চিরকালের যুদ্ধের পথ থেকে সরে এসে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হতে চাওয়া ট্রাম্প আবারও চিরকালীন যুদ্ধের পথেই ফিরেছেন।

এরপর ট্রাম্প নিরাপত্তার স্তর পেরিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকক্ষে ঢোকেন।

হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমের সঙ্গে এ কক্ষের একটি ভিডিও সংযোগ তৈরি করা হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের কক্ষটিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড উপস্থিত ছিলেন। এ দুজন দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশে যুদ্ধ পরিচালনা ও শাসকগোষ্ঠীকে পরিবর্তনের চেষ্টার বিরোধী অবস্থানে ছিলেন। তবে যুদ্ধে তাঁদের সম্মতি জানাতে দেখা গেছে।

ফ্লোরিডার সময় অনুযায়ী, রাত ১টা ১৫ মিনিটে অভিযান শুরু হয়। ইরানের সময় অনুযায়ী, অভিযান শুরু হয় শনিবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে। খামেনি ইতিমধ্যেই তাঁর মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন এবং তেহরান ছাড়েননি। তিনি আত্মসমর্পণ না করে জীবন দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে তিনি সম্ভবত সেদিন সকালে হামলা হবে বলে ধারণা করেননি। ইরানি শাসকগোষ্ঠী ভেবেছিল, হামলা হবে রাতের কোনো সময়।

প্রাথমিকভাবে হামলায় ১০০টির বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং সমুদ্র থেকে ছোড়া টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।

ট্রাম্প এই বিশাল হামলাকে ইরানি জনগণের জন্য ৪৭ বছরের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘সময় এখন আপনাদের। সম্ভবত এটি আপনাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের একমাত্র সুযোগ।’

পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের কথা কমিয়ে এনেছে। কিন্তু ট্রাম্প এখনো যুদ্ধ চালাতে অবিচল। তাঁর দাবি, তাঁর কাছে প্রায় অফুরান অস্ত্রভান্ডার আছে। তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ চিরকাল চালানো যেতে পারে এবং অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গেই তা করা যাবে।’

এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট, চিরকালের যুদ্ধের পথ থেকে সরে এসে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হতে চাওয়া ট্রাম্প আবারও চিরকালীন যুদ্ধের পথেই ফিরেছেন।