
মাস দুয়েক আগে নিউইয়র্ক টাইমস–এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, আইনের তিনি ধার ধারেন না। তিনি তা–ই করবেন, যা তাঁর মন চায়। তাঁর কথা, ‘আমার কাজের একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো আমার নিজের নৈতিকতা, আমার নিজের মন।’
নিজের কথা রেখে চলেছেন তিনি। প্রচলিত নিয়মনীতি ভেঙে একের পর এক এমন সব কাজ করছেন, যার ধাক্কা পোহাতে শুধু নিজের দেশের মানুষের নয়; সারা বিশ্বকেই গলদঘর্ম হতে হচ্ছে।
উদাহরণ দিয়ে বলি। জর্জ ওয়াশিংটন বা আব্রাহাম লিংকন ইতিহাসে স্মরণীয় হয়েছেন যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে। তিনি তো তাঁদের চেয়ে কম কিছু নন, অতএব যুদ্ধে যাওয়া যাক। জোর খাটিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা ভেবেছিলেন, প্রতিবাদের মুখে তাতে সফল হননি। তাতে কী, আরও তো সুযোগ রয়েছে। ফলে ভেনেজুয়েলা ও ইরান অভিযান। সামনে আসছে কিউবা।
বিখ্যাত লোকেদের নামে রণতরি রয়েছে, তাঁর নামেই–বা নয় কেন? শুধু একটা রণতরি দিয়ে হবে না, তিনি পুরো এক নতুন জাতের রণতরি বহর নির্মাণের ঘোষণা করলেন, যার নাম হবে ‘ট্রাম্প ক্লাস অব ওয়ারশিপস’।
ঠিক করলেন হোয়াইট হাউসে বিশাল এক বলরুম বানাবেন, এত বিরাট যে তা খোদ হোয়াইট হাউসের চেয়েও বড়। এখন আদালত বলছেন, কাজটা আইনসংগত হয়নি।
ইতিমধ্যে ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান, সড়ক বা ভবনের নামে বদলে ট্রাম্পের নামে করা হয়েছে। কেনেডি সেন্টারের নাম বদলে করা হয়েছে কেনেডি-ট্রাম্প সেন্টার। ফ্লোরিডার পাম বিচ এয়ারপোর্টের নতুন নাম রাখা হয়েছে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। একই শহরের পাম বুলেভার্ডের নতুন নাম হয়েছে ট্রাম্প বুলেভার্ড। ইনস্টিটিউট অব পিসের নতুন নামকরণ হয়েছে ট্রাম্প ইনস্টিটিউট অব পিস। অতিধনীদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য যে নতুন গ্রিন কার্ড চালু হয়েছে, তার নাম হয়েছে ট্রাম্প গোল্ড কার্ড। ডলারে নিজের স্বাক্ষর যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এমনকি তাঁর ছবিসংবলিত পাসপোর্ট বানানোর ঘোষণাও এসেছে।
এদিকে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প যা করেছেন, তা বোধ হয় মাহাত্ম্যের বিচারে এসব উদাহরণকে ছাড়িয়ে গেছে। তিনি ঠিক করেছেন, নিজেই নিজের সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করবেন। এক-দুই ডলার নয়; ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপুরণ চেয়ে মামলা। তিনি অভিযোগ করেছেন, ২০১৯ সালে দেশের রাজস্ব বিভাগ তাঁর নিজের কর প্রদানের হিসাব নিয়মভঙ্গ করে ফাঁস করে দেয়। এতে তাঁর যে মানহানি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ ১০ বিলিয়ন ডলার। তাঁর নিজের সরকারের বিরুদ্ধে যে মামলা তিনি ঠুকেছেন, তা লড়তে হবে তাঁর নিয়োগকৃত অ্যাটর্নি জেনারেলকে। বিচার বিভাগ যখন কোনো মামলার বাদী হয়, তার কাজ জনস্বার্থে মামলা লড়া। তো এখন কি বিচার বিভাগ বিবাদী ট্রাম্পের পক্ষে মামলা চালাবে, না বাদী হয়ে জনস্বার্থে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করবে?
এদিকে ট্রাম্পের এই মামলার এক দিন পর সেই বিচার বিভাগ দেশের সাবেক এফবিআই প্রধান জেমস কোমির বিরুদ্ধে এক মামলা ঠুকেছে। অভিযোগ, কোমি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে ঝিনুকের বুকের ওপর ৮৬৪৭ নম্বর লেখা আছে। চলতি ভাষায় ৮৬ মানে কাউকে ছেঁটে ফেলা বা খুন করা। আর ৪৭ মানে ট্রাম্প, কারণ তিনি দেশের ৪৭ নম্বর প্রেসিডেন্ট। দুইয়ে দুই মিলিয়ে বিচার বিভাগ ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে কোমির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছে।
এই মামলার বিবরণ পড়ে পণ্ডিতকুল হেসে আকুল। এক বছর আগের পোস্ট, প্রকাশের এক দিন পরেই কোমি তা মুছে ফেলেন। তিনি যদি ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করেই থাকেন, তাহলে সে ব্যাপারে বিচার বিভাগের টনক এত দিন পরে কেন নড়ল? এই এক বছর হত্যার ব্যাপারে কোমিই–বা কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
এই মামলার অবশ্য অন্য দিক আছে। কোমির সঙ্গে ট্রাম্পের মতভেদ পুরোনো। ২০১৬ সালের নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ নিয়ে তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন কোমি। ট্রাম্পের রাগ সেখানেই। অযোগ্যতার অভিযোগে তিনি কোমিকে ২০১৭ সালে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে নিজের অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কোমির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকতে। ঠোকা হয়েছিল, কিন্তু বিজ্ঞ আদালত সে অভিযোগ আমলে নেননি। এবার ইন্টারনেট হাতড়ে এক মোক্ষম অস্ত্র পেয়েছেন—হত্যাচেষ্টা। ফলে আবার মামলা উঠেছে আদালতে।
নিউইয়র্ক টাইমস–এর মতো পত্রিকা প্রথম পাতায় প্রশ্ন তুলেছে, লোকটা কি ‘ইনসেইন’— মানে পাগল? দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তিনি এমন সব কাজ করছেন, যাকে ঠিক স্বাভাবিক বলা যায় না। তাঁকে বাধা দেবে, এমন কেউ নেই। সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল বিচারকেরা তাঁর খামখেয়ালিপনাকে আশকারা দিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা তাঁকে এবং তাঁর অতি অনুগত সমর্থকদের এতটাই ভয় পান যে কেউ টুঁ শব্দটিও করতে নারাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় প্রশাসনের তিন শাখা—নির্বাহী, বিচার ও আইন বিভাগ—সমান অধিকার ভোগ করে এবং একে অপরের কাজের খবরদারি করে। কিন্তু এখন সেই নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য (চেক অ্যান্ড ব্যালান্স) ভেঙে পড়েছে। বিচার ও আইন বিভাগের অনীহার কারণে নির্বাহী বিভাগ হয়ে পড়েছে কার্যত অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী। ট্রাম্প এখন এতটাই ক্ষমতাবান যে অনেকে তাঁকে রাজা নামে ডাকা শুরু করেছে। টাইমস তাঁকে ‘ম্যাড কিং’ নামেও সম্বোধন করেছে।
রক্ষণশীল রিপাবলিকানদের মতে, অধিক দক্ষ প্রশাসনের নিজের প্রয়োজনেই চাই এক সর্বশক্তিমান নির্বাহী। যে ইউনিটারি এক্সিকিউটিভ থিওরি বা একক নির্বাহী তত্ত্ব তাঁরা যুক্তি হিসেবে খাড়া করেছেন, তাতে দেশের সব নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হলেন প্রেসিডেন্ট। বিচার ও আইন বিভাগ আলাদা হলেও নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। রক্ষণশীল পণ্ডিতেরা তাঁদের যুক্তির সপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের আদি স্থপতিদের একজন আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের কথা উদ্ধৃত করে থাকেন। তিনি একসময় বলেছিলেন, দেশের ভালো–মন্দ দেখভাল করার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের। নির্দেশনার জন্য দেশের মানুষ তাঁর দিকেই তাকিয়ে থাকে। কোথাও ভুলচুক হলে লোকে তাঁকে দোষে। অতএব তিনিই সর্বেসর্বা।
সমস্যা হলো, এই তত্ত্ব মেনে নিলে একজন প্রেসিডেন্ট ও রাজার মধ্যে কোনো প্রভেদ থাকে না। রাজা নিজেই তাঁর সব ক্ষমতার উৎস। কিন্তু প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার উৎস শাসনতন্ত্র। সেই শাসনতন্ত্রকে যদি তিনি নিজের খেয়ালখুশিমতো মচকাতে পারেন, তাহলে তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েও রাজা বা একনায়ককে হয়ে পড়েন। আর ভয়টা সেখানেই। প্রেসিডেন্ট যখন সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠেন, তাঁর ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে কোনো ফারাক থাকে না। ট্রাম্পের বেলাতেও সেই ঘটনা ঘটছে। যেমন পাসপোর্টে ট্রাম্পের ছবি রাখার বিষয়টি। পাসপোর্ট রাষ্ট্রের প্রতীক, রাষ্ট্রের নেতার প্রতীক নয়। লিবিয়ার একনায়ক গাদ্দাফি বা ইরাকের সাদ্দাম হোসেন তেমন কাজ করলে অধিকাংশ মানুষ চোখ কপালে তুলবেন না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সেই একই কাণ্ড হলে অবশ্যই চোখ কপালে তোলার কথা।
এর পরে আর কী কী করবেন ট্রাম্প, সে কথা আগাম বলা অসম্ভব। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রনায়কই অমরত্বের সন্ধানে দেশজুড়ে নিজের নাম ও ভাস্কর্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখেছেন। যেমন সোভিয়েত একনায়ক স্তালিন সারিস্তিন শহরের নাম বদলে করেছিলেন স্তালিনগ্রাদ। সাদ্দাম হোসেন মাদিনাত আল-থাওরার নাম বদলে রেখেছিলেন সাদ্দাম সিটি। সবাইকে টেক্কা দিয়েছিলেন তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট নিয়াজভ। তিনি প্রথমে নিজের নাম বদলে করেন তুর্কমেনবাসি, তারপর নিজের নামে নাম রাখেন জানুয়ারি মাসের নাম। আর এপ্রিল মাসের নাম রেখেছিলেন গুরবানসুলতান, সেটি তাঁর মায়ের নাম।
তার মানে, ট্রাম্পের সামনে এখনো বিস্তর সুযোগ। ওয়াশিংটন ডিসির নাম বদলে তিনি যদি ট্রাম্প সিটি রাখেন, তাঁকে ঠেকাবে কে?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর: সময়। স্তালিনের মৃত্যর পর স্তালিনগ্রাদের নতুন নাম হয়েছে ভলগাগ্রাদ। সাদ্দাম সিটি বদলে হয়েছে সাদর সিটি। তুর্কমেনিস্তানের ক্যালেন্ডারে তাঁদের প্রায়-উন্মাদ প্রেসিডেন্টের নাম বদলে পুরোনো সব নাম ফিরে এসেছে।