অ্যাসপিরিন
অ্যাসপিরিন

ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে ‘প্রাচীন’ ওষুধ অ্যাসপিরিন, কীভাবে এটি কাজ করে

চার হাজার বছরের পুরোনো একটি ওষুধ নতুন করে এখন আলোচনায় এসেছে। সাধারণত ব্যথা কমাতে ওষুধটি ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাজ্যে হওয়া এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ ওষুধ শরীরে কিছু নির্দিষ্ট টিউমার গঠনে বাধা দিতে পারে এবং সেগুলোকে ছড়িয়ে পড়া থেকেও রক্ষা করতে সক্ষম। ওষুধটি হলো অ্যাসপিরিন।

ক্যানসারে মায়ের মৃত্যু এবং ভাইসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য অন্ত্রের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের আসবাব নির্মাতা নিক জেমস নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি জেনেটিক পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।

পরীক্ষায় দেখা যায়, জেমস একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করছেন, যা লিঞ্চ সিনড্রোম তৈরি করে। এটি এমন একটি অবস্থা, যা ওই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেয়।

জেমস তখন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে অ্যাসপিরিনের ব্যবহারসংক্রান্ত একটি গবেষণার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেন। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল দৈনিক অ্যাসপিরিনের একটি ডোজ ক্যানসার হওয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করা।

এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল জেনেটিকসের অধ্যাপক জন বার্ন। তিনি বলেন, জিন মিউটেশনের ধরনের ওপর নির্ভর করে লিঞ্চ সিনড্রোমে আক্রান্ত ১০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ তাঁদের জীবদ্দশায় অন্ত্রের ক্যানসারে আক্রান্ত হন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জেমসের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক।

জেমস সম্পর্কে বার্ন আরও বলেন, ‘তিনি আমাদের সঙ্গে ১০ বছর ধরে অ্যাসপিরিন নিচ্ছেন এবং এখন পর্যন্ত কোনো ক্যানসার দেখা যায়নি।

বিষয়টি প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, ওষুধটি কলোরেক্টাল ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে পারে। এমনকি ক্যানসার প্রতিরোধ করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

গত এক বছরে একের পর এক পরীক্ষা ও গবেষণা এ প্রমাণকে আরও শক্তিশালী করেছে। কিছু দেশ ইতিমধ্যে তাদের চিকিৎসা নির্দেশিকায় পরিবর্তন এনে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য এই ওষুধকে প্রাথমিক সুরক্ষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, এটি অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করা উচিত।

গবেষণায় একটি বড় মোড় আসে ২০১০ সালে। তখন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিটার রটওয়েল অ্যাসপিরিন দিয়ে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ–সম্পর্কিত প্রচুর তথ্য–উপাত্ত নতুন করে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওষুধটি ক্যানসারের শুরু হওয়া এবং ছড়িয়ে পড়া—উভয়ই কমাতে পারে।

প্রাচীন শিকড়

১৯ শতকের শেষ দিকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন শহর নিপপুরে (এখন ইরাকে) ৪ হাজার ৪০০ বছরের পুরোনো মাটির ফলক খুঁজে পান। এসব ফলকে উদ্ভিদ, প্রাণী ও খনিজ উপাদান দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ওষুধের তালিকা ছিল। এর মধ্যে উইলোগাছ থেকে তৈরি একটি উপাদানের বিষয়েও নির্দেশনা ছিল।

উইলোগাছের সেই উপাদান এখন ‘স্যালিসিন’ নামে পরিচিত। এ রাসায়নিক শরীরে গিয়ে স্যালিসিলিক অ্যাসিডে পরিণত হয় এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। আধুনিক অ্যাসপিরিন–অ্যাসিটাইলস্যালিসিলিক অ্যাসিডের সঙ্গে এর গঠনের খুব মিল আছে।

মিসরীয়, গ্রিক ও রোমান সভ্যতার মতো প্রাচীন সভ্যতাগুলোয় মানুষ এই চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করত।

এ যৌগ নিয়ে আধুনিক গবেষণা শুরু হয় ১৭৬৩ সালে। তখন ইংরেজ ধর্মযাজক এডওয়ার্ড স্টোন জ্বর কমাতে উইলোগাছের বাকলের গুঁড়ার গুণাগুণ বর্ণনা করে রয়েল সোসাইটিকে চিঠি লেখেন। প্রায় এক শতাব্দী পরে বিজ্ঞানীরা স্যালিসিলিক অ্যাসিডকে কম ক্ষতিকর অ্যাসিটাইলস্যালিসিলিক অ্যাসিডে রূপান্তর করতে সক্ষম হন। এটি বায়ার নামের ব্র্যান্ডে বাজারে আনা হয়।

আরও এক শতাব্দী পরে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে অ্যাসপিরিনের কিছু অপ্রত্যাশিত উপকারিতা আছে। এটি রক্তকে পাতলা করে এবং প্লাটিলেটকে কম আঠালো করে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমায়।

এ কারণে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের মতো সংস্থাগুলো হৃদ্‌রোগ বা স্ট্রোকের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিন কম মাত্রার অ্যাসপিরিন নেওয়ার পরামর্শ দেয়।

১৯৭২ সাল নাগাদ ধারণা করা হচ্ছিল, অ্যাসপিরিন ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। সে সময় ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছিল।

গবেষণার অংশ হিসেবে তখন কিছু ইঁদুরের শরীরে টিউমার সেল ঢোকানো হয়। মার্কিন বিজ্ঞানীরা গবেষণাটি করেছিলেন। তাঁরা ইঁদুরগুলোকে দুটি দলে ভাগ করেন। এর মধ্যে একটি দলের ইঁদুরকে পানির ভেতর অ্যাসপিরিন মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এতে দেখা যায়, যে ইঁদুরগুলোকে অ্যাসপিরিন দেওয়া হয়নি, তাদের তুলনায় অ্যাসপিরিন পাওয়া ইঁদুরগুলোর শরীরজুড়ে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক কমে গিয়েছিল।

তবে এই আবিষ্কার কিছুটা উত্তেজনা তৈরি করলেও সেটি মানুষেরর শরীরে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়।

গবেষণায় বড় মোড় আসে ২০১০ সালে। তখন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিটার রটওয়েল অ্যাসপিরিন দিয়ে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ–সম্পর্কিত প্রচুর তথ্য–উপাত্ত নতুন করে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ওষুধ ক্যানসারের শুরু হওয়া এবং ছড়িয়ে পড়া—উভয়ই কমাতে পারে।

এ ফলাফল অ্যাসপিরিন নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করে। একদিকে ক্যানসারের বিরুদ্ধে এর সম্ভাব্য ভূমিকা, অন্যদিকে এটি কীভাবে কাজ করে, সেই রহস্য বোঝার চেষ্টা আরও জোরদার হয়।

সমস্যা হলো, সাধারণত ক্যানসার তৈরি হতে অনেক বছর সময় নেয়। তাই এমন একটি ট্রায়াল চালানো অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং খুব ব্যয়বহুল। গবেষক অ্যানা মার্টলিং বলেন, ‘আসলে এটি প্রায় অসম্ভব।’

এ কারণেই বিজ্ঞানীরা এখন বিশেষ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর ওপর গবেষণা করছেন—যেমন যাঁরা আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন অথবা যাঁদের জিনগত কারণে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

এটি কীভাবে কাজ করে

সুনির্দিষ্ট করে কোন প্রক্রিয়ায় অ্যাসপিরিন ক্যানসার প্রতিরোধ করে—এ প্রশ্নের উত্তর দীর্ঘদিন ধরে রহস্য থেকে গেছে। কারেন মার্টলিং বলেন, ‘অসাধারণ এ ওষুধ কোষের ভেতরেও কাজ করে, আবার কোষের বাইরেও কাজ করে। তাই এতে একাধিক প্রক্রিয়া জড়িত থাকতে পারে।’

মার্টলিংয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, কোষের ভেতরে থাকা কক্স–২ নামের একটি এনজাইমকে অ্যাসপিরিন দমন করতে পারে। এই এনজাইম প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামের হরমোনসদৃশ যৌগ তৈরি করতে সাহায্য করে। এই প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন এমন একটি পথকে সক্রিয় করে তোলে, যা অনিয়ন্ত্রিত কোষ বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে—অর্থাৎ ক্যানসার গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানসার ইমিউনোলজি–বিষয়ক অধ্যাপক রাহুল রায় চৌধুরী এবং তাঁর সহকর্মীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় আরেকটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে।

গবেষকেরা দেখেছেন, একটি জিন ইমিউন সিস্টেমের টি–সেলগুলোকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে তারা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়া (মেটাস্ট্যাটিক) ক্যানসার কোষকে শনাক্ত করতে ও ধ্বংস করতে বাধা পায়। থ্রম্বোক্সেন এ টু নামের একটি ক্লটিং ফ্যাক্টরের মাধ্যমে এই জিন সক্রিয় হতে পারে।

নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি শরীরে আঘাত লাগলে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। যেহেতু অ্যাসপিরিন থ্রম্বোক্সেনকে দমন করে, তাই এটি সম্ভবত ক্যানসার কোষকে ইমিউন সিস্টেমের কাছে আরও ‘দৃশ্যমান’ করে তোলে। গবেষক দলের জন্য এটি ছিল একটি বড় বিস্ময়।

রাহুল রায় চৌধুরীর গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর করা হয়েছে। তাই মানুষের ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে রেবেকা লাংলি এবং তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের কলোরেক্টাল বা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল ক্যানসার হয়েছে, তাঁদের শরীরে সুস্থ মানুষের তুলনায় থ্রম্বোক্সেনের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। এমনকি সফল চিকিৎসার ছয় মাস পরেও এ পরিস্থিতি দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত দেয়, মানুষের ক্ষেত্রেও এ উপাদান পুরো শরীরে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার একটি বড় কারণ হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের মতো সংস্থাগুলো হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিন কম মাত্রার অ্যাসপিরিন নেওয়ার পরামর্শ দেয়

সবাই কি ব্যবহার করতে পারবেন

ঠিক কারা নিয়মিত অ্যাসপিরিন গ্রহণ করবেন এবং কখন করবেন—বিষয়টি এখনো বিতর্কের। কিছু গবেষক মনে করেন, হৃদ্‌রোগ ও ক্যানসার—উভয়ের ক্ষেত্রে এটির সম্মিলিত উপকারিতা বিবেচনা করে এর ব্যবহার আরও বৃদ্ধি করা উচিত।

গবেষক জন বার্ন নিজেও অতীতে প্রতিরোধমূলকভাবে অ্যাসপিরিন গ্রহণ করেছেন। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে এর সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আশাবাদী। বার্ন বলেন, ‘আমরা একটি বড় গবেষণা করে দেখিয়েছি, যদি ৫০-এর কোঠায় থাকা বয়সীদের সবাই ১০ বছর ধরে বেবি অ্যাসপিরিন (কম ডোজের অ্যাসপিরিন) নেয়, তাহলে জাতীয়ভাবে সব ধরনের মৃত্যুহার প্রায় ৪ শতাংশ কমে যাবে।’

তবে বেশির ভাগ গবেষক মনে করেন, এটি সবার জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট রোগীদের মধ্যেই সীমিত থাকা উচিত। কারেন মার্টলি বলেন, ‘ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের অ্যাসপিরিন দেওয়া এক বিষয়; কিন্তু সুস্থ ব্যক্তিদের এমন কিছু দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, যা তাঁদের ক্ষতিও করতে পারে।’

কারণ, অ্যাসপিরিনের গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে এবং এটি সব মানুষের ক্ষেত্রে বা সব ধরনের ক্যানসারে কার্যকর না–ও হতে পারে।

যাঁদের লিঞ্চ সিনড্রোম আছে অথবা যাঁরা অন্ত্রের ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কম মাত্রার অ্যাসপিরিন উপকারী কি না, তা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতে পারে। রেবেকা লাংলি বলেন, ‘অ্যাসপিরিন শুরু করার আগে সব সময় একজন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত।’

অ্যাসপিরিন নিয়ে গবেষণা যত চলতে থাকবে, ততই নতুন চমক আসতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এ ওষুধের দীর্ঘ ইতিহাস কি ভবিষ্যতে আরও চার হাজার বছর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে? হয়তো ভবিষ্যতের মানুষ এ ওষুধকে এমনভাবে ব্যবহার করবে, যা আমরা এখন কল্পনাও করতে পারি না।