অর্থের লেনদেন বা মাদক পাচারের পথ অনুসরণ করে নয়, মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির শীর্ষ সন্ত্রাসী ও কুখ্যাত মাদকসম্রাট এল মেনচোর ‘প্রেমিকাকে’ অনুসরণ করে গভীর জঙ্গলে তাঁর গোপন আস্তানা খুঁজে বের করেছিল।
মেক্সিকোর নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ওই নারীকে এল মেনচোর ‘রোমান্টিক পার্টনার’ বলে বর্ণনা করেছেন।
কর্মকর্তারা বলেন, তিনিই (নারী) তাঁদের (নিরাপত্তা অভিযানে নামা দলকে) হালিস্কো অঙ্গরাজ্যের জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যান। সেখানকার কেবিনে (জঙ্গলের ভেতর ছোট ঘর) মাদকসম্রাট নেমেসিও ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস লুকিয়ে ছিলেন। অন্তত গত শুক্রবার থেকে সেখানে ছিলেন তিনি।
মেক্সিকোর কুখ্যাত মাদক চক্র ‘কার্টেল হালিস্কো নিউ জেনারেশন (সিজেএনজি)’-এর এই নেতা ‘এল মেনচো’ নামেই পরিচিত।
এল মেনচোকে গ্রেপ্তার করতে গত রোববার মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনী অতর্কিত এক অভিযান চালায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন এল মেনচো। গুরুতর আহত অবস্থায় হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে, কিন্তু প্রাণ বাঁচানো যায়নি।
গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে মেক্সিকোর কর্মকর্তারা আগের দিনের অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
কর্মকর্তারা বলেন, দ্রুতই হালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের প্রধানকে গ্রেপ্তারের জন্য একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা সাজানো এবং তা কার্যকর করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এল মেনচো মেক্সিকোর সবচেয়ে নিষ্ঠুর অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন।
অভিযানটি শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় রূপ নিয়েছিল। সংঘর্ষে মাদক চক্রের সন্দেহভাজন কয়েকজন সদস্যও নিহত হন।
রোমহর্ষক অভিযানটি মেক্সিকোর কুখ্যাত মাদক চক্রের বিরুদ্ধে নতুন করে আক্রমণের ক্ষেত্রে এক বড় জয় বলে মনে করা হচ্ছে। এ অভিযান মাদক নিয়ে দেশটির ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে; যদিও এ ঘটনা মেক্সিকোজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে।
এল মেনচো হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে মেক্সিকোর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশের নানা প্রান্তে হামলা করেছে। ৩২টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ২০টিতে হামলা করেছে তারা।
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে, মহাসড়ক অবরোধ করেছে এবং বিপণিবিতান, ব্যাংক ও যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কয়েক ঘণ্টায় অন্তত ৬২ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
সহিংসতার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন রুটে উড়োজাহাজ ও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, ভ্রমণকারীরা আটকে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে হাজারো পর্যটক রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি-ভিডিওতে বিভিন্ন শহর থেকে আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গেছে।
মেক্সিকোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল রিকার্দো ত্রেভিয়া ত্রেহো সোমবার সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। অভিযানে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কথা বলার সময় কেঁদে ফেলেন তিনি।
ত্রেহো বলেন, ‘তাঁদের অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। আমরা কী দেখছি? আমরা মেক্সিকোর শক্তি দেখছি।’
এল মেনচো নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর মেক্সিকোজুড়ে যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছিল, সোমবার বিকেল নাগাদ তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে বলেও জানান ত্রেহো।
এল মেনচো প্রায় ১৫ বছর আগে প্রতিদ্বন্দ্বী সিনালোয়া কার্টেল থেকে আলাদা হয়ে হালিস্কো কার্টেল গড়ে তোলেন।
এই অপরাধ চক্র মাদক পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মানব পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে আতঙ্কের নাম ছিলেন এল মেনচো। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাঁর মাথার দাম ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঘোষণা করেছিল।
এল মেনচোকে পাকড়াও করার অভিযান শুরু হয়েছিল মূলত শুক্রবার। সেদিন মেক্সিকোর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এল মেনচোর ‘প্রেমিকা’র কাছের এক ব্যক্তিকে অনুসরণ শুরু করেন।
জেনারেল ত্রেহো বলেন, ওই ব্যক্তি এক নারীকে হালিস্কো অঙ্গরাজ্যের তাপালপা শহরে এল মেনচোর সঙ্গে দেখা করানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন।
ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা এই শহর এল মেনচোর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
জেনারেল ত্রেহো বলেন, তাপালপা শহরে জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ি এলাকায় এল মেনচোর আস্তানা থেকে পরদিন শনিবার ওই নারী চলে যান। তবে ওসেগুয়েরা ওরফে এল মেনচো তাঁর দেহরক্ষীদের নিয়ে সেখানে থেকে যান। সেদিনই মেক্সিকোর বিশেষ বাহিনী তাঁকে পাকড়াও করার পরিকল্পনা করে।
রোববার ভোররাতে নিরাপত্তা বাহিনী ছোট্ট শহর তাপালপাতে চলে যায়। বিশেষ দলটির উপস্থিতি টের পেয়ে এল মেনচো পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সে সময় মাদক চক্রের রক্ষী দলের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়।
ত্রেহো জানান, এল মেনচোর সহযোগীদের কাছে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র ছিল। তিনি বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত সহিংস হামলা ছিল। মেক্সিকোর বাহিনী পাল্টা প্রতিরোধ করে এবং সেখানে আটজন সন্দেহভাজন কার্টেল সদস্য নিহত হন।’
পালিয়ে যাওয়ার সময় গোলাগুলিতে এল মেনচো এবং তাঁর দুই দেহরক্ষী গুরুতর জখম হন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের নিয়ে হেলিকপ্টারে করে রওনা হয়।
কিন্তু এল মেনচো ও তাঁর দুই দেহরক্ষীকে গুয়াদালাহারার একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার সময় পথেই তাঁরা মারা যান। তাঁদের মৃতদেহ মেক্সিকো সিটিতে পাঠানো হয় বলে জানান জেনারেল ত্রেহো।
এল মেনচো নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর রোববার মেক্সিকোর বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে পুলিশ এ পর্যন্ত ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। কয়েক ঘণ্টায় অপরাধ চক্রের সন্দেহভাজন ৩৪ সদস্যও নিহত হয়েছেন। একই সময় প্রাণ হারান আরও ২৫ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, একজন বেসামরিক নাগরিকও নিহত হয়েছেন। অন্তঃসত্ত্বা ওই নারী গোলাগুলির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন।
তাপালপা শহরের মেয়র আন্তোনিও মোরালেস দিয়াজ সোমবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি জানতেনই না যে কুখ্যাত মাদকসম্রাট তাঁর শহরে অবস্থান করছিলেন।
মেয়র আরও বলেন, শহরটি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। পর্যটকেরা জঙ্গলবাড়িতে নিরিবিলি সময় কাটাতে বা বনে হাইকিং করতে আসেন।
রোববার সকাল সাতটার দিকে আকাশে সাতটি হেলিকপ্টার, দুটি ড্রোন ও একটি ছোট বিমান ঘোরাফেরা করছে দেখে মেয়র মোরালেস দিয়াজ রাজ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চান, কী ঘটছে। তখনো তিনি জানতেন না যে এল মেনচোর বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।
মেয়র বলেন, ‘এ পরিস্থিতি আশ্চর্যজনক।’ হতাশাজড়িত কণ্ঠে মেয়র বলেন, ‘সোমবার দুপুর পর্যন্ত আমার পৌরসভার চারটি সড়কে ধ্বংসাবশেষ এবং পোড়া যানবাহন পড়ে ছিল, যান চলাচল করতে পারছিল না। আমরা এসব পছন্দ করি না। আমরা কখনো চাইনি, আমাদের শহরে এমন ঘটনা ঘটুক, কিন্তু এসব তো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিষয়।’