
ভারতের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দরকার। দেশটি কম দামে সেই জ্বালানি কিনতে চায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কও ধরে রাখতে চায় ভারত। কিন্তু জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা চলছে। তাই এ দুই দিক সামলানো ভারতের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন একটি নিষেধাজ্ঞা আইন হয়েছে। গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ আইনে সই করেছেন। আইনটি তাঁকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। এতে বলা আছে, যেসব দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি কেনে, সেসব দেশের পণ্যে তিনি ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসাতে পারবেন।
ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাতে রাশিয়ার বিপুল অর্থ দরকার। তেল ও জ্বালানি পণ্য বিক্রি করে দেশটি সেই অর্থের বড় অংশ আয় করে। মস্কোর এ আয় বন্ধ করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের লক্ষ্য।
শুল্ক কখন ও কীভাবে আরোপ করা হবে, তা অনেকটাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর কবে শুল্ক বসাবেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তিনি আদৌ এ শুল্ক আরোপ করবেন কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। শুল্ক আরোপ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।
ভারত নতুন আইনটিকে হুমকি হিসেবে দেখছে। দিল্লির ভাষ্য, আইনটি ভারতের ওপর ট্রাম্পের চাপ দেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। অথচ একই সময়ে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তির সম্ভাবনা খুঁজছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন কঠিন অবস্থায় পড়েছেন। ভারত তাঁর প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। তাই রুশ জ্বালানি তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
কেপলার বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচলের তথ্য সংগ্রহ করে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, চলতি গ্রীষ্মে ভারতের আমদানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় অর্ধেক এসেছে রাশিয়া থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র বারবার রুশ তেল নিয়ে নীতি বদলেছে। কাজেই প্রতিবারই ভারতকেও তেল কেনার পরিকল্পনা আর কৌশল বদলাতে হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি বাণিজ্যচুক্তি করেছিল। সেটি ছিল গত ফেব্রুয়ারির ঘটনা। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে রাজি হয়েছিল। বিনিময়ে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাতে রাজি ছিল।
এরপর খুব দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যায়। চুক্তিটির পেছনে যেসব ধারণা কাজ করেছিল, সেগুলো আর ঠিকঠাক থাকেনি।
ভারতের সঙ্গে দর-কষাকষির সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সেই ক্ষমতা সীমিত করে দেন। এর মধ্যেই ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ভারতসহ কয়েকটি দেশকে রাশিয়া থেকে বেশি তেল কেনার অনুমতি দেয়। উদ্দেশ্য ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ঘাটতি পূরণ করা।
এখন যুক্তরাষ্ট্র আবার ভারতকে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। কারণ, ভারত অনেক বেশি রুশ তেল কিনছে। কিন্তু এ তেলের বিকল্প খুঁজে পাওয়াটাও এখন কঠিন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি বাণিজ্য চুক্তি করেছিল। সেটি ছিল ফেব্রুয়ারির ঘটনা। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে রাজি হয়। বিনিময়ে রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাতে রাজি হয় ভারত।
ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া
ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক হুমকির কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
ভারতের জ্বালানি মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, বাজারের অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল কেনা হবে। ভারত জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার কাজ চালিয়ে যাবে।
ভারত সতর্ক করে বলেছে, নতুন মার্কিন আইনের প্রভাব শুধু দুই দেশের সম্পর্কের ওপরই পড়বে না। প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
ভারত আগেও এমন সমস্যায় পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এক সময় ভারতকে ভেনেজুয়েলা ও ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধে চাপ দিয়েছিল। পরে ওই দুই দেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বদলে যায়। কূটনৈতিক সম্পর্ক ও জ্বালানির দাম বদলে যাওয়ার কারণে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন এসেছিল।
ভারতকে দুটি জরুরি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা। দ্বিতীয়ত, নিজেদের জন্য যথেষ্ট জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং সেটা বেশ কম দামে।
এ কারণে ভারতকে দুটি জরুরি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে চায় দিল্লি। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি নিজেদের জন্য যথেষ্ট জ্বালানি নিশ্চিত করতে চায় এবং সেটা বেশ কম দামে।
বিষয়টি আরও জটিল করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। ভারত অন্য দেশ থেকে জ্বালানি কিনলে যুক্তরাষ্ট্র শাস্তির হুমকি দিচ্ছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত অভ্যন্তরীণ চাহিদার রান্নার গ্যাসের ৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করত। এখন এ হার ৫০ শতাংশের বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বাড়বে
ভারতের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা ও নয়াদিল্লির গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের পরিচালক অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে ভারতের অতিরিক্ত চিন্তা করা উচিত নয়।
শুল্কের কারণে ভারতের কিছু রপ্তানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রেই পণ্যের দাম বাড়বে, বলেন এ বিশ্লেষক।
শ্রীবাস্তবের মতে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আগের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করেছিলেন। এতে তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেছিল। নতুন আইন তাঁকে সেই ক্ষমতার কিছুটা ফিরিয়ে দিয়েছে।
আপনি কি যুক্তরাষ্ট্রের কড়াই থেকে লাফ দিয়ে চীনের আগুনে পড়তে চান?—সি রাজা মোহন, জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক
ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তিটি এখনো ঝুলে আছে। তবে নতুন আইনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভারতকে দেওয়ার মতো বড় একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমাতে পারে।
শ্রীবাস্তব বলেন, সমস্যা হলো, বাণিজ্যচুক্তি সই করলেই এসব ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না।
ভারত দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্র বড় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। কিন্তু পরে আবার শুল্ক ও চুক্তির শর্ত নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। তাই নতুন আইনটি শুধু ভারতকেই ভাবাচ্ছে না। অন্য দেশগুলোও বোঝার চেষ্টা করছে, আইনটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে কীভাবে প্রভাব ফেলবে।
প্রসঙ্গ যখন চীন
রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের চেয়ে বেশি তেল কেনে চীন। নতুন আইনটি চীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ভারতের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁদের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর যে চাপ দিচ্ছে, চীনের ওপরও কি একই চাপ দেবে।
প্রশ্নটি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারত বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে। চীনের শক্তি মোকাবিলার কৌশল হিসেবেই ভারত এটি করেছে।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যোগ দেন চীনের নেতা সি চিন পিং আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিন নেতা একসঙ্গে ছবি তোলেন। এটি ছিল পশ্চিমাদের বাইরের দেশগুলোর সহযোগিতার স্পষ্ট প্রদর্শন।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে সি চিন পিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতি স্থির না হওয়া পর্যন্ত ভারতের কোনো চুক্তি করা উচিত হবে না।অজয় শ্রীবাস্তব, নয়াদিল্লির গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের পরিচালক
আশঙ্কা ও চুক্তি
ব্রিকসের বড় দেশগুলোর মধ্যে ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার শক্তিশালী কৌশলগত কারণ রয়েছে।
জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সি রাজা মোহন বলেন, ভারতকে দুটি অস্বস্তিকর বিকল্পের একটি বেছে নিতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি কি যুক্তরাষ্ট্রের কড়াই থেকে লাফ দিয়ে চীনের আগুনে পড়তে চান?’
চীনের শক্তি বাড়ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার বড় কারণ রয়েছে ভারতের।
কিন্তু জ্বালানি ও বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বারবার দাবি বদলাচ্ছে। এতে নয়াদিল্লিতে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতা হলেও সেটি কত দিন টিকবে?
এ বিষয়ে অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি স্থির না হওয়া পর্যন্ত ভারতের কোনো চুক্তি করা উচিত হবে না।