
চীন আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এমন দাবি করেছে বলে তিনটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে।
সম্প্রতি হাতে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য মূল্যায়ন নিয়ে জানাশোনা আছে, এমন তিন ব্যক্তি সিএনএনের কাছে এমন তথ্য জানিয়েছেন।
এক মাসের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলছে। গত মঙ্গলবার এই যুদ্ধবিরতি শুরু হয়।
বেইজিং বলেছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ যুদ্ধবিরতিতে তারা সহায়তা করেছে।
এখন বেইজিং যদি সত্যিই ইরানে অস্ত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এটি উসকানিমূলক পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হতে পারে।
আগামী মাসের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
ওই সূত্রগুলো বলছে, মার্কিন গোয়েন্দারা দাবি করছেন, ইরান হয়তো এই যুদ্ধবিরতিকে একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। যুদ্ধবিরতির এ সময়ে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অংশীদারদের সহায়তায় ইরান হয়তো কিছু নির্দিষ্ট অস্ত্রব্যবস্থা আবার মজুত করছে।
দুটি সূত্র সিএনএনের কাছে এমন দাবিও করেছে, প্রকৃত উৎস আড়াল করতে বেইজিং তাদের অস্ত্রের চালান তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ইরানে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। গোয়েন্দা তথ্যে তেমন দাবি করা হচ্ছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলোর দাবি, বেইজিং যেসব অস্ত্রব্যবস্থা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলোকে ‘ম্যানপ্যাডস’ বলা হয়।
এসব অস্ত্র পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের সময় অপেক্ষাকৃত নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের জন্য একটি অসম হুমকি তৈরি করেছিল। চলমান যুদ্ধবিরতি ভেস্তে গেলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের হুমকি তৈরি হতে পারে।
এ নিয়ে ওয়াশিংটনে চীনের দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, চীন কখনোই এই সংঘাতে কোনো পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহ করেনি।
উল্লিখিত তথ্যটি সত্য নয় বলেও দাবি করেন চীনের রাষ্ট্রদূত। দূতাবাসের মুখপাত্র বলেন, ‘একটি দায়িত্বশীল বৃহৎ দেশ হিসেবে চীন সব সময়ই নিজের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করে আসছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ করা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সম্পর্ক জুড়ে দেওয়া ও অতিরঞ্জিত প্রচার চালানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো উত্তেজনা কমাতে সহায়ক আরও পদক্ষেপ নেবে।’
গত সপ্তাহের শুরুর দিকে চীনের দূতাবাসের এক মুখপাত্র সিএনএনকে বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেইজিং একটি যুদ্ধবিরতি ও সংঘাতের অবসানে সহায়তা করতে কাজ করে যাচ্ছে।
যুদ্ধের মধ্যে ইরানের আকাশে একটি মার্কিন এফ–১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, একটি কাঁধে বহনযোগ্য তাপ অনুসন্ধানী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ওই যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে।
যদিও ইরান বলেছে, তারা একটি নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে মার্কিন যুদ্ধবিমানে আঘাত হেনেছে। এই নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি চীনের তৈরি কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
মার্কিন সূত্র দাবি করছে, চীন যদি এখন ইরানে ম্যানপ্যাডস বা ম্যান পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম পাঠায়, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে উসকানিমূলক পদক্ষেপ হবে।
সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, চীনের কোম্পানিগুলো ইরানকে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। এসব প্রযুক্তি ইরানকে অস্ত্র তৈরি অব্যাহত রাখতে ও নিজেদের নজরদারির ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে সক্ষম করে তুলেছে। চীন সরকারের সরাসরি অস্ত্রব্যবস্থা সরবরাহ সহায়তার একটি নতুন স্তর হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে রক্ষা করতে প্রকাশ্যে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার কোনো বাস্তব কৌশলগত মূল্য চীনের কাছে নেই। তারা জানে, এ যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়।
ওই সূত্র বলেছে, তার চেয়ে বেইজিং বরং নিজেদের ইরানের একজন স্থায়ী মিত্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। ইরানের তেলের ওপর চীন ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটি একই সঙ্গে বাহ্যিকভাবে নিজেদের নিরপেক্ষ দেখানোর চেষ্টা করছে, যেন যুদ্ধ শেষ হলে তারা নিজেদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করতে পারে।
সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, চীনের কর্মকর্তারা এ যুক্তিও দিতে পারেন, তাঁদের সরবরাহ করা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আক্রমণাত্মক নয়; বরং প্রতিরক্ষামূলক। এভাবে তাঁরা তাঁদের সহায়তাকে রাশিয়ার সহায়তা থেকে আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কো পুরো যুদ্ধ চলাকালে ইরানি শাসনকে সহায়তা দিয়ে আসছে, যার মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়। এসব তথ্য ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও সম্পদের ওপর হামলায় সহায়তা করেছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে ইরান ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে, বিশেষ করে তাদের শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছে। পাশাপাশি ইরান তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চীনের কাছে প্রচুর পরিমাণে তেল বিক্রি করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা দিচ্ছে বা গাজায় নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে যুক্তরাষ্ট্র যে ইসরায়েলকে অস্ত্র দিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ করেনি সিএনএন।