আবাসিক হোটেলে ফেডারেল এজেন্টদের থাকতে দেওয়ার প্রতিবাদে সেখানে ভাঙচুর চালান সাধারণ মার্কিনরা। এ সময় আইসিইর এক সদস্যকে সেখানে সতর্ক অবস্থান নিতে দেখা যায়। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, মিনিয়াপোলিস
আবাসিক হোটেলে ফেডারেল এজেন্টদের থাকতে দেওয়ার প্রতিবাদে সেখানে ভাঙচুর চালান সাধারণ মার্কিনরা। এ সময় আইসিইর এক সদস্যকে সেখানে সতর্ক অবস্থান নিতে দেখা যায়। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, মিনিয়াপোলিস

মিনিয়াপোলিসে গুলি করে আরেকজনকে হত্যা কি ট্রাম্পের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসন চলতি সপ্তাহে বোধ হয় বিলম্বে হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছেন, মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে তাঁদের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই, যা আইস নামে পরিচিত) অভিযানগুলো মোটেও ভালো যাচ্ছে না।

গত মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প তাঁর টিমের প্রচারকৌশলের দুর্বলতা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। তিনি ও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করতে শুরু করেছেন, আইসিই ‘ভুল’ করেছে বা ভবিষ্যতে করতে পারে।

সিএনএন গত শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এমন উদ্বেগের পেছনে একটি আতঙ্ক কাজ করেছে। সেটি হলো পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোও এমন আভাসই দিয়েছে।

তবে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের যে কৌশলগত অবস্থান, তাঁদের এই দুর্দশার মধ্যে ফেলেছে। তাতে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেননি তাঁরা। ফলে পরিস্থিতি এখন মাঠপর্যায়ে ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

মিনিয়াপোলিসে গত শনিবার স্থানীয় সময় সকালে ফেডারেল এজেন্টের গুলিতে ৩৭ বছর বয়সী পেশায় নার্স অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হন, যা অনেক দিক থেকেই আড়াই সপ্তাহ আগের একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সে সময় এক ফেডারেল এজেন্ট রেনি নিকোল গুড নামের এক নারীকে গুলি করে হত্যা করেন। সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক পদক্ষেপ যখন একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে, তখন এ দুজনের নিহতের ঘটনা প্রশাসনের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা এখনো দেখার বিষয়। তবে একটা বিষয় একেবারেই স্পষ্ট। তা হলো, বেশির ভাগ মার্কিন আগে থেকেই বিশ্বাস করেন, অভিযানের নামে আইসিই সব সময় সীমা ছাড়িয়ে যায়।

অ্যালেক্স প্রেটির ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসার পর অনেকে রেনি গুডের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর তুলনা করছেন। ওই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং আইসিই সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আরও তীব্র হয়।

রেনি গুডের ঘটনার মতো প্রশাসন আবারও সংশ্লিষ্ট ফেডারেল এজেন্টদের পক্ষ নিতে এবং নিহত ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। রেনি গুডের মতো অ্যালেক্স প্রেটিকেও এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যে তিনি ফেডারেল এজেন্টদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার চেষ্টা করেছেন।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম খুব জোর দিয়েই বলেছেন, প্রেটি ‘সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি করার’ চেষ্টা করছিলেন। তাঁর বিভাগের অনুমান, প্রেটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের গণহত্যার চেষ্টা করছিলেন।

হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার ঘটনাটিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘একজন আততায়ী ফেডারেল এজেন্টদের হত্যার চেষ্টা করেছে।’

মিনিয়াপোলিসের পুলিশপ্রধান বলেছেন, ঘটনার সময় প্রেটির কাছে একটি বন্দুক ছিল। সেটি রাখার অনুমতিও তাঁর ছিল। এজেন্টরা তাঁর দিকে রাসায়নিক স্প্রে করার পরই তিনি ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে এজেন্টদের হত্যাচেষ্টার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুলিশের হাতে আসা কোনো ভিডিওতে প্রেটির হাতে কোনো অস্ত্র দেখা যায়নি।

প্রকৃতপক্ষে ভিডিওতে দেখা গেছে, ফেডারেল নিরাপত্তারক্ষীরা এক নারীকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়ার পর ঘটনার সূত্রপাত হয়। প্রেটি ওই নারীকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেলে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। গুলির আগে এক সদস্য তাঁর কোমরের দিক থেকে একটি বন্দুক টেনে সরিয়ে নেন। অর্থাৎ গুলি করে হত্যার সময় তিনি নিরস্ত্র ছিলেন।

তবে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের দাবি, তিনি নিরাপত্তা সদস্যদের দিকে (বন্দুক তাক করে) এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

রেনি গুডের ওপরও একইভাবে দায় চাপানোর চেষ্টা করেছিল প্রশাসন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা প্রশাসনের বক্তব্য মোটেও বিশ্বাস করেনি। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান ক্রিস্টি নোয়েম দাবি করেছিলেন, রেনি গুড ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদে’ লিপ্ত ছিলেন।

জনমত জরিপে দেখা গেছে, তিন-চতুর্থাংশ মানুষ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এ দাবির সঙ্গে একমত হতে পারেননি।

দুটি ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে আরেকটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। রেনি গুডকে গুলি করা আইসিই সদস্যের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এড়াতে প্রশাসন স্পষ্ট চেষ্টা চালিয়েছিল। উল্টো রেনি গুডকেই তদন্তের আওতায় আনতে চেয়েছিল।

অ্যালেক্স প্রেটিকে হত্যার পর দেখা গেছে, ফেডারেল সদস্যরা ঘটনাস্থলের ধারে-কাছে পুলিশকে ঘেষতে দিচ্ছেন না। এ ছাড়া মিনেসোটা ব্যুরো অব ক্রিমিনাল অ্যাপ্রিহেনশন জানিয়েছে, তাদের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কোনোভাবেই সহযোগিতা করছে না।

অ্যালেক্স প্রেটির মৃত্যু কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের একটি চরম বহিঃপ্রকাশ। প্রশাসন এখন বুঝতে পারছে, এই হত্যাকাণ্ডগুলো তাদের ভোটের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা এখন জনমত হারানোর ভয় পাচ্ছে।

অন্যদিকে, সাধারণ মার্কিনরা দীর্ঘদিন ধরে এসব সহ্য করছিল। কিন্তু একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং দমনমূলক নীতির ফলে মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে কারও বাড়িতে ঢুকতে আদালতের পরোয়ানা লাগে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে প্রশাসন দাবি করেছে, তারা এখন বিচারকের অনুমতি ছাড়াই মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে বা বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি চালাতে পারে। এটি মার্কিন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর (যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে) পরিপন্থী বলে অনেকে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অ্যালেক্স প্রেটি নামে ওই ব্যক্তিকে মাটিতে ফেলে পেটানোর পর গুলি করা হয়

আইসিইর অভিযানে কেবল অবৈধ অভিবাসীরাই নন, বরং খোদ মার্কিন নাগরিকেরাও ভুলবশত আটক হচ্ছেন। এটি প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতাকে ফুটিয়ে তুলছে।

স্থানীয় পুলিশের বরাতে বলা হচ্ছে, আইসিই কেবল নির্দিষ্ট জাতি বা বর্ণের মানুষের ওপর বেশি চড়াও হচ্ছে। সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো শিশুদের নিশানা করা। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের তাদের মা–বাবার সঙ্গে আটকে রাখা এবং বিমানে করে দেশছাড়া করা হচ্ছে।

গত বছর থেকেই অনেক মার্কিন আইসিইর ওপর অসন্তুষ্ট। কিন্তু এ বছরের জানুয়ারিতে তাদের প্রতি ক্ষোভ আরও বেড়েছে। সংস্থাটির জনপ্রিয়তা হু হু করে কমছে।

সিবিএস নিউজ ও নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন মনে করছেন, আইসিই ‘অতিমাত্রায় কঠোর’ হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ১০ জন স্বতন্ত্র ভোটারের মধ্যে ৭ জনই এখন প্রশাসনের এই নীতির বিরুদ্ধে। এমনকি ট্রাম্পের নিজ দলের ২০ শতাংশ সমর্থক মনে করছেন, পরিস্থিতি এখন সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে।

সাধারণত কোনো গোলাগুলির ঘটনায় মানুষ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কিছুটা ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দেয়। কিন্তু আগের মিথ্যাচার ও বর্তমান নেতিবাচক জনমতের কারণে মার্কিনরা এখন ফেডারেল এজেন্টদের আর সেই ছাড় দিতে রাজি নন। মানুষ ধরে নিচ্ছেন, এজেন্টরাই ভুল করেছে।

পরিস্থিতি এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এতটাই প্রতিকূল যে খোদ নিজের দলের ভেতর থেকেও সমালোচনার আওয়াজ উঠছে। সাধারণত ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন (এনআরএ) পর্যন্ত এবার প্রশাসনের ওপর চটেছে। তাদের মতে, বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স থাকা কোনো নাগরিককে এভাবে ‘সন্ত্রাসী’ সাজিয়ে মেরে ফেলা যায় না।

শুধু তা–ই নয়, রিপাবলিকান পার্টির অনেক প্রভাবশালী আইনপ্রণেতাও এবার এজেন্টদের পক্ষে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প মনে করছেন প্রচারকৌশলের ভুলে মানুষ চটেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাঁর গণবহিষ্কার নীতিকেই মার্কিনরা এখন ঘৃণা করতে শুরু করেছে। এই জেদ মিনিয়াপোলিসের চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।