নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

ইরান যুদ্ধে ভুগছে সবাই, যুক্তরাষ্ট্র কতটা সুবিধায় আছে

ইরানে দুই মাসের যুদ্ধের প্রভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ভারত ও বাংলাদেশের বস্ত্রকলগুলো। থমকে পড়েছে আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড ও জার্মানির বিমান চলাচল। ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডে জ্বালানি সাশ্রয়ে চলছে রেশনিং। অর্থনৈতিক এই চাপ থেকে একটি দেশকেই দৃশ্যত মুক্ত দেখা যাচ্ছে, সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এই যুদ্ধ শুরু করেছে তারাই।

এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মন্দার আশঙ্কা তৈরি করেছে ইরান যুদ্ধ। তবে এমন পরিস্থিতিতেও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অধিকাংশ শক্তিশালী অর্থনীতির চেয়ে ভালো করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটিতে প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল ও বেকারত্বের হার কম। গত সপ্তাহে রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডা এ বিষয়ে বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিপক্ষে বাজি ধরা এখনো কঠিন।’

সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। তাদের ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সার্বভৌম বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির অনেক গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তাদেরও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হাত পাততে হচ্ছে।

যুদ্ধের মাত্র আট সপ্তাহেই বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ ওলটপালট হয়ে গেছে। একটি ঐতিহ্যবাহী ইংলিশ ফ্রুটকেক তৈরি হতে যে সময় লাগে, এটি তার চেয়েও কম সময়।

এই অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে দরিদ্র দেশগুলোর ওপর। এসব দেশের সাধারণ মানুষের চড়া দামে জ্বালানি কেনার সামর্থ্য নেই। তা ছাড়া এসব দেশের সরকারের এই বাড়তি খরচ সামাল দিতে ভর্তুকি দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় এসব দেশের অতি প্রয়োজনীয় ঋণের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি

জ্বালানি ও সারের আকাশচুম্বী দামের কারণে বছরের শেষ দিকে খাদ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, আফ্রিকায় ‘খাদ্য নিরাপত্তা প্রকট আকার ধারণ করছে’। অন্যদিকে এ সংঘাতের কারণে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের লাখো মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর রঘুরাম রাজন বলেন, এশিয়ার অনেক দেশ এখনই জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

পানি ফুটছে, আর ব্যাঙটি সেই পানির ভেতরেই আছে এবং তাপমাত্রা ক্রমে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আপনারা একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হতে দেখবেন।
রঘুরাম রাজন, সাবেক গভর্নর, ভারত

আইএমএফের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘এই সংকট ক্রমেই আরও তীব্র হবে।’ এরই মধ্যে অনেক দেশে এর প্রকৃত প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে।

জ্বালানির মজুত ফুরিয়ে আসছে এবং পণ্যের কিছু চালান আসা বন্ধ হয়ে গেছে। রঘুরাম রাজন রূপক অর্থে এই পরিস্থিতির বর্ণনায় বলেন, ‘পানি ফুটছে, আর ব্যাঙটি সেই পানির ভেতরেই আছে এবং তাপমাত্রা ক্রমে বাড়ছে।’

‘এমন পরিস্থিতিতে আপনারা একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হতে দেখবেন,’ বলেন এই কর্মকর্তা।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজ দেখা যাচ্ছে

ভারতের ইস্পাত কারখানা এবং জাপানের গাড়ি নির্মাতারা জ্বালানির উচ্চমূল্য ও চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে চীনের খেলনা শিল্প আগে থেকেই সংকটে ছিল। এখন জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় সেখানে হাজার হাজার শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

গত সপ্তাহের এক সকালের ঘটনা। ভারতের ফিরোজাবাদ শহরের একটি খোলা শ্রমবাজারে শ্রমিকদের অলস বসে থাকতে দেখা যায়। রাজমিস্ত্রি মুহাম্মদ ওয়াসিম বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে কাজ কমে গেছে।’

সেখানে সম্ভাব্য একজন নিয়োগকর্তার সঙ্গে মজুরি নিয়ে দরদাম করছিলেন ওয়াসিম। একটি নির্মাণকাজের জন্য তাঁকে মাত্র ৫০০ রুপি দিতে চেয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। অথচ ওয়াসিম এ ধরনের কাজ করে সাধারণত এর চেয়ে অনেক বেশি আয় করেন।

২৫ বছর বয়সী আস মুহাম্মদ ট্রাকে ইট ও সিমেন্ট তোলার কাজ করেন। বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল পথ হেঁটে ওই বাজারে আসতে হয়েছে তাঁকে। তিনি ৫০০ রুপি মজুরিতেই কাজ করতে রাজি ছিলেন। তবে এই সামান্য টাকায় খুব একটা লাভ হবে না। আগে যে এক কেজি রান্নার গ্যাসের দাম ছিল ৮০ রুপি, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ রুপিতে।

লাখ লাখ ভারতীয় শ্রমিক সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে কাজ করেন। তাঁরা প্রতিবছর সম্মিলিতভাবে শত কোটি ডলারের প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) দেশে পাঠান। এসব শ্রমিক এখন কাজ হারিয়ে বিদেশে আটকা পড়েছেন।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত হিলিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও ন্যাপথার মতো বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা হয়। এখন বাজারে এসব পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এর কারণে কনডম থেকে শুরু করে মাইক্রোচিপ পর্যন্ত হরেক রকমের পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

মার্কিন অর্থনীতি যে এই ধাক্কা থেকে পুরোপুরি মুক্ত, তা বলা যাবে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সেখানে প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম ১ ডলারের বেশি বেড়েছে। এটি মার্কিন ভোক্তাদের ওপর বাড়তি করের মতো চেপে বসেছে। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওমানের সুলতান হাইসাম বিন তারিকের সঙ্গে মাসকটে বৈঠক করেন

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে। বিপরীতে তারা মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আভাস দিচ্ছে। এমনকি আগামী শরতের আগে সুদের হার কমানোর যে সম্ভাবনা ছিল, ব্যাংকগুলো এখন সেই আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে।

বিশ্বের বাকি অংশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব এখনো বেশ কম। দেশটিতে মানুষের কেনাকাটা বা খরচ করার প্রবণতা এখনো ভালোই আছে। কর্মী ছাঁটাইয়ের হারও বেশ কম। এ ছাড়া চলতি বছর দেশটিতে ভালো প্রবৃদ্ধির আশা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে ওঠে, তবেই তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার আশঙ্কা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাববেন। তাঁদের মতে, এর আগে তেলের দাম বাড়লেও তা দেশটিতে বড় কোনো সংকট তৈরি করবে না।

তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি মোটেও এমন নয়। প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সেখানে অর্থনৈতিক স্থবিরতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে পণ্যের ঘাটতি ও উচ্চমূল্য একধরনের সংকটের আবর্ত তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় এর চাহিদা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান যেমন কমছে, তেমনি মানুষের কেনাকাটার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ভারতের আহমেদাবাদে পেট্রলপাম্প থেকে তেল নিচ্ছেন যাত্রীরা। সাম্প্রতিক ছবি

সংকটের প্রভাবে জার্মানির বিমান সংস্থা লুফথাহানসা এবারের গ্রীষ্মের ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করেছে। বিমানের জ্বালানির দাম দ্বিগুণ হওয়ায় বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বিমান সংস্থাই তাদের ফ্লাইট কমিয়েছে। এ তথ্য জানিয়েছে ডিজিটাল শিপিং মার্কেটপ্লেস ‘ফ্রেটোস’। ফ্লাইট কমে যাওয়ায় পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিপণিবিতানগুলোতেও বেচাকেনা কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তারা নিজেদের চাহিদার চেয়ে বেশি তেল ও গ্যাস উৎপাদন করে। এর মানে এই নয় যে বিশ্ববাজারের অস্থিরতার প্রভাব তাদের ওপর পড়ছে না। তবে উৎপাদন বেশি হওয়ায় তারা বড় ধরনের ধাক্কা সামলে নিতে পারছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত হিলিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও ন্যাপথার মতো বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা হয়। এখন বাজারে এসব পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এর কারণে কনডম থেকে শুরু করে মাইক্রোচিপ পর্যন্ত হরেক রকমের পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘হাই ফ্রিকোয়েন্সি ইকোনমিকস’ জানিয়েছে, তেল-গ্যাস উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে আগামী চার বছর তেলের দাম চড়া থাকতে পারে। এমনকি দাম আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

চিন্তন প্রতিষ্ঠান পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম পোজেন বলেন, ‘জ্বালানি খাতের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা আমাদের থাকলেও এটি টিকে থাকবে বলে আমার মনে হয় না।’

ভিয়েতনামের এক পেট্রলপাম্পে তেল নিতে মানুষের ভিড়। সাম্প্রতিক ছবি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাস্তিমূলক বাণিজ্য নীতি ও গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবির মতো খামখেয়ালি আচরণের কারণে অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও এই তালিকায় ছিল।

অ্যাডাম পোজেন বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বের বড় একটি অংশ মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

পোজেন আরও বলেন, ‘আপাতত মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি খুব একটা সংকটে নেই। তবে এ নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার বা স্বস্তিবোধ করার কিছু নেই।’