তুলসী গ্যাবার্ড
তুলসী গ্যাবার্ড

তুলসীকে পদে রাখা হবে কি না, উপদেষ্টাদের মত চেয়েছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডকে সরিয়ে দেওয়া উচিত কি না, সে বিষয়ে গত কয়েক সপ্তাহে নিজের মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে জানতে চেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তুলসীকে নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষের কারণ হলো, তিনি তাঁর একজন সাবেক সহকারীকে সুরক্ষা দিয়েছেন, যিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে ট্রাম্পের যুক্তিকে খাটো করে দেখেছিলেন। আলোচনা সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তির বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

এটি স্পষ্ট নয় যে ট্রাম্প এ ঘটনার জেরে সত্যিই তুলসীকে বরখাস্ত করবেন কি না। বর্তমানে এই পদের জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য প্রার্থী নেই। উপদেষ্টারা সতর্ক করে বলেছেন, উত্তরসূরি প্রস্তুত হওয়ার আগে শীর্ষ পর্যায়ের এই পদটি শূন্য হলে তা অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বিড়ম্বনার সৃষ্টি করতে পারে।

তবে ট্রাম্পের এই আলোচনা তুলসীর জন্য একটি অশুভ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, প্রেসিডেন্ট যখন কোনো পদে পরিবর্তন আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করেন, তখনই সাধারণত উপদেষ্টাদের মতামত নিয়ে থাকেন। নাম না প্রকাশ করার শর্তে ওই দুই ব্যক্তি ব্যক্তিগত এ আলাপচারিতার বিষয়টি জানান।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত মাসে ক্যাপিটল হিলে বিশ্বব্যাপী হুমকিবিষয়ক এক শুনানিতে তুলসীর দেওয়া সাক্ষ্যের পর তাঁকে নিয়ে ট্রাম্পের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। ওই শুনানিতে জো কেন্টকে তিরস্কার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তুলসী। এর মাত্র কয়েক দিন আগে কেন্ট পদত্যাগ করেছিলেন এই যুক্তি দেখিয়ে যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো আসন্ন হুমকি ছিল না।

জো কেন্ট জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এটি একটি মার্কিন সংস্থা, যা সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় ও বিশ্লেষণের দায়িত্বে নিয়োজিত।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কেন্টের পদত্যাগের ধরন এবং যুদ্ধের সমালোচনা ট্রাম্পকে আগেই ক্ষুব্ধ করেছিল। তবে তুলসী যেভাবে কেন্টকে সমর্থন দিয়েছেন এবং ইরানের ওপর হামলার বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষে শক্তভাবে থাকতে যে অনীহা দেখিয়েছেন, তা নিয়ে ট্রাম্প বিশেষ করে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।

তুলসীর নেতৃত্বের ওপর এখনো আস্থা আছে কি না, রোববার এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানান। এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি বলতে চাইছি, তাঁর চিন্তাভাবনা আমার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, কিন্তু তার মানে এই নয়, কেউ দায়িত্ব পালনের অযোগ্য হয়ে পড়েছেন।’

এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র স্টিভেন চেউং তুলসী গ্যাবার্ডের দায়িত্ব পালনের সপক্ষে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে যেমনটা বলেছেন, পরিচালক গ্যাবার্ড এবং তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপর তাঁর আস্থা রয়েছে। তিনি এযাবৎকালের সবচেয়ে মেধাবী ও প্রভাবশালী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। তাঁরা সম্মিলিতভাবে আমেরিকান জনগণের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক বিজয় এনে দিয়েছেন।’

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প সরাসরি কাউকে বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে অনীহা দেখাচ্ছেন। অনেক সময় বোঝা মনে করলে কর্মকর্তাদের সরিয়ে অন্য দায়িত্ব দিচ্ছেন। অতি সম্প্রতি তিনি ক্রিস্টি নোয়েমকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে দূত হিসেবে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে বদলি করেছেন।

প্রশাসনের ভেতরে সাধারণভাবে এটি স্বীকৃত যে তুলসীকে প্রায়ই এমন কাজের মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে সামান্য ভুল হলেই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে তাঁকে মাঝেমধ্যে হিমশিম খেতে হয়েছে। প্রথাগতভাবে এই পদের কাজ হলো যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং তাদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও তদারকি করা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তুলসীর যে সাক্ষ্য ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে, তা মূলত বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়া নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সমালোচনারই প্রতিফলন। পাশাপাশি ২০১৯ সালে কংগ্রেসের কাছে দেওয়া তাঁর আগের বক্তব্যের সঙ্গেও এর মিল রয়েছে, যেখানে তিনি মনে করতেন যে প্রেসিডেন্ট আইনত আগাম হামলার নির্দেশ দিতে পারেন না।

বিষয়টি নিয়ে জানাশোনা আছে এমন এক ব্যক্তির মতে, তুলসীর সেই সাক্ষ্য মূলত শুনানির আগেই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে নেওয়া হয়েছিল। ওই ব্যক্তি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সমর্থনে তুলসী প্রায় প্রতিদিন হোয়াইট হাউসে সময় দিচ্ছেন।

অন্যান্য ক্ষেত্রে তুলসী ট্রাম্পের প্রিয়ভাজন হতে পেরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে একটি সরকারি প্রতিবেদন পেশ করা, যেখানে দাবি করা হয়েছে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের ক্ষতি করে ট্রাম্পের প্রচারণাকে এগিয়ে নিতে রাশিয়া কোনো সহায়তা করেনি। যদিও সেই সময়ে কংগ্রেসের তদন্তে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছিল।

তবে বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তুলসীর বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের একটি তালিকাও দ্রুত দীর্ঘ হচ্ছে।

ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে তুলসী আইনপ্রণেতাদের কাছে সাক্ষ্য দিলে ট্রাম্প জনসমক্ষেই তাঁর বিরোধিতা করেন। ফর্দো, ইস্পাহান ও নাতাঞ্জে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে হামলার অনুমতি দেওয়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘সে ভুল বলছে।’

তুলসী এরপর হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়েন, যখন তিনি কংগ্রেস সদস্যদের সহকারীসহ ৩৭ জনের নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করেন। এটি করার অধিকার তাঁর আছে কি না, হোয়াইট হাউস প্রশাসন তা যাচাই করার আগেই তিনি এ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন।

এমন প্রেক্ষাপটে তুলসীর সহযোগীরা সিআইএর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন, তারা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য একটি অজুহাত তৈরির চেষ্টা করছে। যদিও হোয়াইট হাউস পরে বিষয়টি মিটমাট করে দেয়।