তীব্র ঠান্ডা, চারদিকে তুষার জমে আছে। তার মধ্যেই স্তালিনগ্রাদে চলছে লড়াই
তীব্র ঠান্ডা, চারদিকে তুষার জমে আছে। তার মধ্যেই স্তালিনগ্রাদে চলছে লড়াই

ফিরে দেখা

সোভিয়েত বাহিনীর কোন কৌশল স্তালিনগ্রাদে হিটলার বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত হিটলারের নাৎসি বাহিনীর সামনে প্রতিপক্ষের বাহিনীগুলো বড় দুর্বল ও অসহায় ছিল। বিপুল বিক্রমে অক্ষশক্তি একের পর এক যুদ্ধ জিতে নিচ্ছিল। তাদের মূল শক্তি ছিল তড়িৎ আক্রমণ। বিমান হামলার পাশাপাশি অক্ষশক্তির পদাতিক বাহিনী দ্রুত এক একটি অঞ্চলে প্রবেশ করে সেটির দখল নিত।

ভলগা নদীর তীরঘেঁষা ঐতিহাসিক শহর স্তালিনগ্রাদ (বর্তমান নাম ভলগোগ্রাদ)। ১৯৪২ সালের ২৩ থেকে ২৬ আগস্ট অক্ষশক্তির প্রায় ৬০০ যুদ্ধবিমান নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের এই শিল্প শহরটি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। আকাশ থেকে বোমাবর্ষণ ছিল স্তালিনগ্রাদে জার্মানির নেতৃত্বে অক্ষশক্তির পদাতিক অভিযানে পূর্বপ্রস্তুতি। কিন্তু শহরটিতে তাদের জন্য কী বিপদ ওত পেতে আছে, তা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।

ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অ্যাডলফ হিটলারের জার্মান বাহিনীর নেতৃত্বে অক্ষশক্তি প্রায় পুরো ইউরোপ দখলে নিয়েছে। অক্ষশক্তির দেশগুলো হলো—জার্মানি, ইতালি, জাপান, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, বুগলেরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ।

অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে মিত্র বাহিনীর দেশগুলো হলো—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত হিটলারের নাৎসি বাহিনীর সামনে প্রতিপক্ষের বাহিনীগুলো বড় দুর্বল ও অসহায় ছিল। বিপুল বিক্রমে অক্ষশক্তি একের পর এক যুদ্ধ জিতে নিচ্ছিল। তাদের মূল শক্তি ছিল তড়িৎ আক্রমণ। বিমান হামলার পাশাপাশি অক্ষশক্তির পদাতিক বাহিনী দ্রুত একেকটি অঞ্চলে প্রবেশ করে সেটির দখল নিত।

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ডের আকাশে জার্মান যুদ্ধবিমান

হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ

২২ জুন ১৯৪১, ইতিহাসে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন অ্যাডলফ হিটলারের নির্দেশে জার্মান বাহিনীর এক বিশাল বহর সোভিয়েত ইউনিয়ন জয় করার উদ্দেশ্যে পূর্বদিকে যাত্রা শুরু করল। ততদিনে ইউরোপের দুই–তৃতীয়াংশ হিটলারের দখলে।

জার্মান বাহিনীর তিনটি বড় বড় দল সোভিয়েত ইউনিয়ন দখলের পথে যাত্রা করে। তিন দলে কম করে হলেও ৩০ লাখ সেনা ছিল।

সে সময়ে শক্তি ও কৌশলের দিক দিয়ে জার্মান বাহিনী ছিল সোভিয়েত রেড আর্মির চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী। দুর্বার জার্মান বাহিনী ইউক্রেন হয়ে রাশিয়ার ইউরোপ অংশের অনেকটা দখল করে ফেলেছিল। হিটলারের লক্ষ্য তখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করা।

দ্রুত বেগে জার্মান বাহিনী মস্কোর উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। কিন্তু ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরের প্রচণ্ড শীত ও রেড আর্মির প্রবল প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হয় মস্কো অভিযান। যদিও যুদ্ধে সোভিয়েত বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। মস্কো দখলে ব্যর্থ হিটলার দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। এবার তিনি নিজেই দায়িত্ব নিলেন ইস্টার্ন ফ্রন্টের।

হিটলার সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রথমে চেচনিয়ার তেলের খনিগুলো দখল করতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে অবস্থান নেওয়া জার্মান বাহিনীর তেলের মজুত ফুরিয়ে আসছিল। এ কারণে হিটলার তাঁর ইস্টার্ন ফ্রন্টের একটি অংশকে পাঠিয়ে দিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ককেশাস অঞ্চলে, অর্থাৎ চেচনিয়ার উদ্দেশে। অন্য অংশকে পাঠালেন স্তালিনগ্রাদের দিকে।

১৯৪২ সালের ১৯ জুলাই স্তালিনগ্রাদ দখল করতে রওনা হয় জার্মান বাহিনীর ‘সিক্সথ আর্মি’। দিকে দিকে তখন হিটলারের নাৎসি বাহিনী এক আতঙ্কের নাম। এ আতঙ্কের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্তালিন দেশবাসীর মনোবল ধরে রাখতে মরিয়া।

এ কারণে নিজের নাম বহনকারী শহরটির নিয়ন্ত্রণ যেকোনো মূল্যে ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন স্তালিন। স্তালিনগ্রাদে সে সময় চার লাখ মানুষ বসবাস করত। জার্মান বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে, এ খবরে শহরের বেশির ভাগ শস্য মজুত অন্যত্র সরিয়ে নিলেও বাসিন্দাদের শহরেই থেকে যেতে বলা হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নে (বর্তমান রাশিয়ায়) জার্মান সেনারা

যুদ্ধের প্রস্তুতি

জার্মান বাহিনীকে আটকাতে স্তালিনগ্রাদে স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হয়। নারীরাও এই বাহিনীতে যোগ দেন। শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিটি ব্লক, প্রতিটি সড়ক ও প্রতিটি ভবনের নিয়ন্ত্রণ যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় ধরে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

৪ আগস্ট অক্ষশক্তির সেনারা আকসাই নদী অতিক্রম করে স্তালিনগ্রাদ শহরের বহিঃসীমান্তের দিকে রওনা হয়।

অক্ষশক্তি স্তালিনগ্রাদ দখলের এ অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘আপারেশন হেরন’। অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘সিক্সথ আর্মির’ কমান্ডার জার্মান জেনারেল ফ্রেডরিখ পাউলাসের ওপর।

অভিজাত বাহিনী ‘সিক্সথ আর্মি’ ছিল হিটলারের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাদল। জেনারেল ফ্রেডরিখ পাউলাস প্রায় ৩ লাখ জার্মান সেনা নিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর স্তালিনগ্রাদের বহিঃসীমায় পৌঁছে যান।

তার আগে ২৩ আগস্ট থেকে প্রায় তিন দিন ধরে ব্যাপক বোমাবর্ষণের পর ১২ সেপ্টেম্বর জার্মান সেনারা মূল শহরে প্রবেশ করে।

জার্মানির ‘সিক্সথ আর্মির’ কমান্ডার জেনারেল ফ্রেডরিখ পাউলাস

র‍্যাটেনক্রিগ বা ইঁদুরের যুদ্ধ

তিন দিন ধরে ব্যাপক বোমাবর্ষণে স্তালিনগ্রাদ তখন অনেকটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে জার্মান সেনারা সহজেই শহরে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছে।

বরং স্তালিনগ্রাদে জার্মান সেনাদের প্রতি মিটারে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে, খানাখন্দ, নর্দমা ও ভূগর্ভস্থ লুকিয়ে থাকার জায়গা পরিষ্কার করতে করতে সামনে এগোতে হয়েছিল। তাদের মূল ভয় ছিল বন্দুক হাতে লুকিয়ে থাকা স্নাইপাররা, অসতর্ক হলেই দূর থেকে ছুটে আসা গুলিতে নির্ঘাত মৃত্যু।

কিন্তু শহরে ঢুকে জার্মান সেনাদের অজানা যে শত্রুর মুখে পড়তে হয়েছিল, তার জন্য তারা একেবারে প্রস্তুত ছিল না। সোভিয়েত সেনারা ইচ্ছাকৃতভাবে ট্যাঙ্ক নিয়ে ধ্বংসস্তূপের ভেতর লুকিয়ে থাকত। শত্রু সেনাদল নাগালের ভেতরে না আসা পর্যন্ত তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যেত না, শত্রুর দিকে অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের গুলি ছুটে যেত।

সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মি বা লাল ফৌজের এই অচেনা যুদ্ধকৌশলে জার্মান বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা এ কৌশলের নাম দেয় ‘র‍্যাটেনক্রিগ’ বা ইঁদুরের যুদ্ধ।

যুদ্ধক্ষেত্রে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে জার্মান বাহিনীর কমান্ডাররা তাদের সৈন্যদের কীভাবে নেতৃত্ব দেবেন, তা ঠিক করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তখন তাদের এক কমান্ডার ৫০ থেকে ১০০ জন সৈন্যের এক একটি ‘শক গ্রুপ’ তৈরির কৌশল ঠিক করেন।

এসব গ্রুপের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। তারা পরিস্থিতি অনুযায়ী, তৎক্ষণাৎভাবে শত্রুকে মোকাবিলার করার কৌশল নিজেরাই ঠিক করত।

জার্মানির সিক্সথ আর্মির সেনা ছিলেন প্রাইভেট উইলহেল্ম হফম্যান। তিনি নিজের ডায়রিতে যুদ্ধের ভয়াবহতার দৈনন্দিন চিত্র লিখে রাখতেন।

ডায়েরিতে ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে লেখা—‘আমাদের ব্যাটালিয়ন স্তালিনগ্রাদ উপকণ্ঠে লড়াই করছে। সারাক্ষণ গুলি চলছে। যেদিকে তাকাবেন, আগুন আর জ্বলন্ত শিখা। রুশ তোপ ও মেশিনগান জ্বলন্ত শহর থেকে গুলি চালাচ্ছে, উন্মাদের মতো’।

১৬ সেপ্টেম্বর লেখেন—‘আমাদের সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক নিয়ে শস্যগুদামে আক্রমণ করছে। লড়াইয়ে আমাদের ব্যাটালিয়ন ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। শস্যগুদামের উঁচু ভবনটি মানুষ নয়, বরং দানবেরা দখল করে রেখেছে, যাদের কোনো গুলি বা আগুন দিয়ে ধ্বংস করা যায় না।’

১৮ সেপ্টেম্বর: ‘শস্যগুদামের ভেতরে লড়াই চলছেই। যদি স্তালিনগ্রাদের সব ভবন থেকে এভাবেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়, তবে আমাদের কোনো সৈন্যই আর জার্মানিতে ফিরে যেতে পারবে না।’

জার্মান বাহিনী আত্মসমর্পণের পর স্তালিনগ্রাদ সেন্টারের চিত্র

প্রতিটি ভাঙা ভবন একেকটি দুর্গ

স্তালিনগ্রাদে একেকটি ভবনের দখল নিতে জার্মান সেনাদের কেন এত প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সোভিয়েত সেনা প্রাইভেট অ্যান্টন বোসনিক।

বোসনিক বলেছিলেন, ‘আমরা এক ভবন থেকে পিছু হটে অন্য ভবনে আশ্রয় নিতাম, প্রতিটি ভবনকে এক একটি শক্তশালী দুর্গে পরিণত করি। একজন সৈন্য তখনই নিজের দখল করা অবস্থান থেকে বের হতো, যখন তাঁর পায়ের নিচের মাটিতে আগুন জ্বলত এবং তাঁর পোশাক থেকে ধোঁয়া বের হতো।’

এভাবেই স্তালিনগ্রাদের ভাঙা ভবনগুলো সোভিয়েত বাহিনীর একেকটি দুর্গ হয়ে ওঠে। দেখা যেত, জার্মান সেনারা দিনের বেলায় যে এলাকা দখল করত, রাতের বেলা সোভিয়েত বাহিনী সে এলাকার পুনর্দখল নিত।

সোভিয়েত বাহিনীর চোরাগোপ্তা হামলার সামনে জার্মানির অত্যাধুনিক আর্টিলারি ও আর্মার কোনো কাজেই আসছিল না। পুরো যুদ্ধ তখন সৈন্যদের মুখোমুখি যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। আর স্তালিনগ্রাদ পরিণত হয়েছিল জার্মান বাহিনীর দুঃস্বপ্নপুরীতে।

দখল ও পাল্টা দখলের লড়াই জার্মান বাহিনীর ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। তাদেরকে স্তালিনগ্রাদ উপকণ্ঠে মামায়েভ কুরগান নামক পাহাড়টি মোট ১৪ বার দখল করতে হয়েছিল। দুপক্ষের গোলাগুলিতে সেবার প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও পাহাড়টিতে তুষার জমতে পারেনি। এত বেশি গোলাগুলি হয়েছিল যে সব বরফ গলে ঝরে গিয়েছিল।

তবে এত সব প্রতিরোধের পরেও জার্মান সৈন্যরা স্তালিনগ্রাদের প্রায় ৯০ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

স্তালিনগ্রাদে লড়াই করছে সোভিয়েত রেড আর্মি

পাল্টা হামলায় ফাঁদে জার্মান বাহিনী

একসময় মনে হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত স্তালিনগ্রাদের পতন হতে চলেছে। এদিকে সোভিয়েত বাহিনী পিছু হটে গেলেও আশা ছাড়েনি। লেফটেন্যান্ট-জেনারেল নিকোলাই ফেদোরোভিচ ভাতুতিনের নেতৃত্বে নতুন পরিকল্পনা সাজায় সোভিয়েত বাহিনী।

সোভিয়েত বাহিনী এবারও যুদ্ধের নতুন কৌশল নেয়। তাঁরা স্তালিনগ্রাদ দখলে নেওয়া শক্তিশালী জার্মান বাহিনীকে আক্রমণ না করে অক্ষশক্তির প্রতিরক্ষা লাইনের দুর্বল অংশে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই দুর্বল অংশ ছিল রোমানিয়ার তৃতীয় ও চতুর্থ সেনাবাহিনী, ইতালির অষ্টম সেনাবাহিনী এবং হাঙ্গেরির দ্বিতীয় সেনাবাহিনী। তাঁরা জার্মান বাহিনীকে লড়াইয়ে সহায়তা করতে স্তালিনগ্রাদ আসছিল।

লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ভাতুতিনের নেতৃত্বে ১৯ নভেম্বর রোমানিয়ার তৃতীয় সেনাবাহিনীর ওপর আঘাত হানতে লাল ফৌজের দুটি ফিল্ড আর্মি ও একটি ট্যাংক আর্মি মোতায়েন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের এই পাল্টা হামলার নাম দেয় ‘অপারেশন ইউরেনাস’। তীব্র তুষারপাতের মধ্যে শত্রু সেনাদের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যাপক গোলাবর্ষণ চালানো হয়।

২০ নভেম্বর লেফটেন্যান্ট-জেনারেল আন্দ্রেই ইয়েরেমেনকোর (ইয়েরিওমেনকো নামেও পরিচিত) নেতৃত্বে রেড আর্মি বা লাল ফৌজের ৫১তম বাহিনী রোমানিয়ার চতুর্থ সেনাবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অতর্কিত এই আক্রমণ স্তালিনগ্রাদের দুই প্রান্তে অবস্থান নেওয়া অক্ষশক্তির সেনারা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

২৩ নভেম্বর দুদিক থেকে স্তালিনগ্রাদ শহর ঘেরাও করে সোভিয়েত সেনারা। জার্মান সিক্সথ আর্মি শহরের ভেতর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

জার্মানির শক্তিশালী সাঁজোয়া বাহিনী ‘ফোর্থ প্যাঞ্জার আর্মি’ তখন স্তালিনগ্রাদ থেকে মাত্র তিন দিনের দূরত্বে ছিল। ফলে তারাও শহরের ভেতরে থাকা সিক্সথ আর্মিকে কোনো সহায়তা করতে পারল না।

সোভিয়েত বাহিনী বাইরে থেকে শহর ঘিরে ফেলায় ভেতরে জার্মান বাহিনী স্থলপথে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল।

অর্থাৎ অবরোধ করতে গিয়ে উল্টো জার্মান বাহিনীই এখন অবরোধের শিকার। সে সময় জার্মান বাহিনী চাইলে অবরোধ ভেঙে স্তালিনগ্রাদ থেকে পিছু হটতে পারত। জার্মান সিক্সথ আর্মির প্রধান জেনারেল ফ্রেডরিখ পাউলাস সেটাই চাচ্ছিলেন।

কিন্তু হিটলার চাচ্ছিলেন জার্মানরা যাতে একচুল পরিমাণও না সরে। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে নতুন বছরের শুরুতে হিটলার জেনারেল পাউলাসকে উৎসাহ দিতে তাঁকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেন। আর কড়া নির্দেশ দেন, যেকোনো মূল্যে শহরের ভেতর থেকেই সেটির দখলে রাখতে হবে।

এদিকে অবরুদ্ধ জার্মান বাহিনীর গোলাবারুদ, রসদ ফুরিয়ে আসছিল। হিটলার আশ্বাস দিলেন, আকাশপথে পৌঁছে দেওয়া হবে প্রয়োজনীয় রসদ ও অস্ত্র। সে সময় স্তালিনগ্রাদে থাকা জার্মান সৈন্যদের প্রতিদিন দরকার ছিল ৮০০ টন রসদের, অথচ আকাশপথে জোগান ছিল মাত্র ১৪০ টন।

শেষের দিকে অবশ্য হিটলার পিছু হটার অনুমতি দিয়েছিলেন, তবে শহরের ভেতরের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রেখে। এদিকে দিনের পর দিন অস্ত্র ও খাবারের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়া জার্মান আর্মির পক্ষে এটি করা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

বরং আটকে পড়া জার্মান বাহিনী অনেকগুলো ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অনাহারে ও অস্ত্রের অভাবে একে একে মরতে শুরু করল সিক্সথ আর্মির সৈন্যরা। বলা হয়, স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধে প্রায় দেড় লাখ জার্মান সৈন্য নিহত হয়েছিল, আর বন্দী হয়েছিল আরও প্রায় ১ লাখ সৈন্য।

তবে এ যুদ্ধে সোভিয়েত রেড আর্মির ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা ছিল এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল।

জার্মান বাহিনীর আত্মসমর্পণ

প্রায় ছয় মাস ধরে যুদ্ধ চলার পর ১৯৪৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বন্দী হন ফিল্ড মার্শাল ফ্রেডরিখ পাউলাস। ৩১ জানুয়ারি থেকে জার্মান সৈন্যরা আত্মসমর্পণ শুরু করে, ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ জার্মান সেনা আত্মসমর্পণ করে।

বন্দী জার্মান সেনাদের সাইবেরিয়ার দিকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এ দলের মাত্র পাঁচ হাজারের মতো সেনা প্রাণ নিয়ে জার্মানি পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

অ্যাডলফ হিটলার

জার্মানদের পরাজয়ের কারণ

স্তালিনগ্রাদে পরাক্রমশালী জার্মান বাহিনীর ফাঁদে আটকা পড়ার খবর সাধারণ জার্মানদের জানতে দেওয়া হয়নি। এমনকি ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে বড়দিনের সময়ও সারা দেশের মানুষ জানে, তাদের বীর সৈন্যরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছে। যেকোনো সময় আসবে বিজয়ের সংবাদ। অথচ সে সময়ে স্তালিনগ্রাদে আটকা পড়া জার্মান সৈন্যরা খাবারের অভাবে মারা পড়ছিলেন।

স্পষ্টতই হিটলারের কিছু হটকারী সিদ্ধান্ত স্তালিনগ্রাদে জার্মানদের পরাজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

হিটলার শীত আসার আগেই স্তালিনগ্রাদে বিজয়ের ব্যাপারে এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন যে জার্মান বাহিনীকে রাশিয়ার প্রচণ্ড শীত মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত গরম কাপড় সরবরাহ করা হয়নি।

এ ছাড়া এত কিছুর পরও জেনারেল পউলাসকে ডিসেম্বরের শুরুতে পিছু হটার অনুমতি দিলে হয়তো এলিট সিক্সথ আর্মিকে বাঁচাতে পারতেন হিটলার।

সে যাত্রায় বেঁচে গেলে হয়তো পরের বছর গ্রীষ্মে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারত জার্মান বাহিনী। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও জাত্যভিমানে ভুগতে থাকা হিটলারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত স্তালিনগ্রাদে দেড় লাখের বেশি জার্মান সৈন্যের কবর খোঁড়ে। বলা হয়, স্তালিনগ্রাদের এই পরাজয়ই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, অক্ষশক্তির পরাজয়ের সূচনা করেছিল।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত টানা ৬ বছর ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলেছে। এ যুদ্ধে প্রায় ৬ কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানব সভ্যতার ইতিহাসের বাঁক বদলে দিয়েছিল। হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের সিদ্ধান্তকে এই যুদ্ধে প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর জার্মানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তথ্যসূত্র: হিস্ট্রিডটকম, ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রিডটকম, বিবিসি