জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান আর কত দূর এগোবেন

শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতের রাজনৈতিক রূপান্তরের একটা স্পষ্ট পর্যায় শেষ হলোছবি: প্রথম আলো

আওয়ামী লীগ সরকার নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বিদায় নিয়েছে। বেশ গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনও হয়ে গেল। কাকতালীয়ভাবে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে এখন বসন্ত। সামনে ঈদ, বৈশাখ ও বৈসাবি। সময়টা সব ধরনের উৎসবের জন্য দারুণ উপযোগী।

অনেক বছর পর সাড়ে ১৭ কোটি মানুষ খানিকটা স্বস্তিতে আছে। ব্যবসায়ীরা তুমুল প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভালো একটা ব্যবসা মৌসুমের। মুহূর্তটা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য এখানে কেউ চট করে দিতে পারছেন না। আশাভঙ্গের ইতিহাস এ দেশে বেশ জীবন্ত।

অন্তত দুজনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। একজন অবশ্যই তারেক রহমান। আরেকজন ডা. শফিকুর রহমান—জামায়াতে ইসলামীর আমির।

দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যম গেল নির্বাচনে প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে বিএনপিকে ‘ভূমিধস’ বিজয়ের গৌরব দিয়েছে। বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং শক্তিধর ব্যবসায়ী সমাজের জন্য স্বস্তিকর ছিল। কারণ, তাতে ৫৪ বছর বয়সী ‘স্থিতিশীলতা’ রক্ষা পেয়ে গেল। যদিও স্থিতিশীলতা নষ্টের ভীতি যে অমূলক, সেটা বোঝাতে কসুর করেননি জামায়াতের আমির। তিনি পুরো ব্যর্থ হয়েছেন, এমন বলা যায় না মোটেই; বরং নির্বাচনী পরিসংখ্যান সামাজিকভাবে অনুবাদ করলে দেখা যায়, প্রকৃতই এক চমকের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুন

নির্বাচনী ভাষ্যকারেরা যে ইংরেজি শব্দের অনুবাদ হিসেবে ভূমিধস কথাটি ব্যবহার করেন, তার অন্তর্নিহিত অর্থ নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে প্রায় কবর দিয়ে দেওয়া। কিন্তু অতীত পরিসংখ্যানের আলোকে বলতে হয়, ভূমিধস বিজয় ঘটেছে এবার শফিক সাহেবেরও।

ইংরেজি ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টোরি’ অর্থ হিসেবে একধরনের যৌথ সাধারণ ইচ্ছার উত্থানের কথাও বলে। সেটা ঘটেছে প্রকৃতপক্ষে জামায়াতের পেছনে। অতীতের সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ৬৮ আসন পেয়েছে তারা। প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি এটা। যেবার তারা ১৮ আসন পায়, সেবার ভোট পেয়েছিল ৪১ লাখ। এবার দলটি ২ কোটি ৪১ লাখের বেশি ভোট পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃদ্ধি প্রায় ছয় গুণ।

ডা. শফিকের নেতৃত্বের এক দশকে জামায়াতের আদর্শিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের একটা স্পষ্ট পর্যায় শেষ হলো এবার। তিনি যে দলটিকে একাত্তরকালীন নেতৃত্ব ও তখনকার চিন্তাকাঠামো থেকে বের করে গণমুখী করতে চেষ্টা করছেন, তাঁর আরও পদক্ষেপ সামনে দেখা যাবে বলে মনে হয়।

ভোট ও আসনের এ রকম বৃদ্ধিকে হয়তো অনেকে ভূমিধস বিজয় বলতে চাইবেন না। কারণ, জামায়াত গতানুগতিক অর্থে কাউকে পরাজিত করেনি। তা ছাড়া ঢাকা ও রাজশাহীতে অন্তত ২০-২২টি আসনে তারা বেশ কম ভোটের ব্যবধানে জিতেছে। যেগুলো হারানোর ঝুঁকিতেও থাকতে হবে তাদের। আবার প্রধান প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাদের মোট ভোটের ব্যবধান প্রায় এক কোটি। এটা অতিক্রম করা সহজ নয়।

তবে জয়-পরাজয় বিশ্লেষণের চলতি পদ্ধতিগুলো এড়িয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির সামাজিক বার্তাগুলো আরও খতিয়ে দেখার সুযোগ আছে এবং ডা. শফিকের ভূমিধস কৃতিত্ব শনাক্ত করা যায় সেখানে।

জামায়াতে ইসলামী যে মাওলানা মওদুদীর প্রতিষ্ঠিত দল, সেটা সবাই জানেন। এই দলের নবীন সদস্যরা মওদুদীর বইপুস্তক পড়ে আদর্শিক দীক্ষা নেন। এটা দলটির পাকিস্তান ও ভারতের কর্মীদের বেলায় যেমন সত্য, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্যও সত্য।

আরও পড়ুন

মওদুদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিতন্ত্রের ঘোর বিরোধী ছিলেন। একই রকম অবস্থান ছিল তাঁর সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চিমা বিশ্ব নিয়ে। কিন্তু বর্তমানে সমাজ চলছে সর্বগ্রাসী এক পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কে। জামায়াতে ইসলামীর লাখ লাখ কর্মীও এই সমাজেই জীবন যাপন করেন। দলটির অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যও ক্যাপিটাল মার্কেটের নিয়মশৃঙ্খলা মেনেই কাজ করছে।

একদিকে মওদুদীর আদর্শিক বিদ্যা, অন্যদিকে জীবনযাপনের পুঁজিতান্ত্রিক ধরনের এই টানাপোড়েন থেকে ডা. শফিক এবার স্পষ্টত তাঁদের কর্মীদের উদ্ধার করেছেন অনেকখানি! নির্বাচনপূর্ব ‘পলিসি সামিট’ এবং নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণাকালে তিনি বাজার অর্থনীতি বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যেই ‘সুশাসন’ ও ‘স্থিতিশীলতা’ চাওয়া একটা দল এখন জামায়াত।

মওদুদীর চিন্তা থেকে দলটির এই মোড়বদল সহজ ছিল না নিশ্চয়ই, যদিও রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের কাছে এটা বেশি মনোযোগ পেয়েছে বলে মনে হয় না। শফিকুর রহমানের নেতৃত্ব যে হিসাবপত্তর করেই ইসলামী আন্দোলন ও হেফাজতের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার ঝুঁকি নিয়েছেন, সে–ও বেশ নজরকাড়া ঘটনা।

আরও পড়ুন

নির্বাচনকালে শফিকুর রহমান বেশ সমালোচিত ও নিন্দিত হয়েছেন নারীপ্রশ্নে। রাজনীতির নেতৃত্ব পর্যায়ে নারী ও সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্তি অনুমোদন করেননি মাওলানা মওদুদী। তাঁর আদর্শের অবিভাজ্য অংশ এসব। তবে ফাতিমা জিন্নাহ প্রেসিডেন্ট হন, সেটাও চেয়েছিলেন একদা মওদুদী—এমনকি জামায়াতও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের হিস্যা প্রত্যাখ্যান করবে না; বরং পুরো কোটায় নিজ দল থেকে নারীদের মনোনয়ন দেবে তারা।

বস্তুতপক্ষে ডা. শফিকের অধীনে জামায়াতে নারী সদস্যভুক্তি ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং এবারের নির্বাচনে জামায়াতের নারী কর্মীদের প্রচার-সক্রিয়তার কাছে বিএনপিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়েছে।

কিন্তু রাজধানী থেকে উপজেলা পর্যন্ত নানা স্থানে জামায়াত যে নারীদের বড় বড় মিছিল-সমাবেশ করিয়েছে, সেটা এই দলের অভ্যন্তরীণ ইতিহাসে নতুন চর্চা। অতীতে এই দলে নারীরা মিলনায়তনের চৌহদ্দিতে থাকতেন। সেটার বদল ঘটছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান।
ছবি: জামায়াতের ফেসবুক পেজ থেকে।

নারীদের সংসদ সদস্য করার বিষয়ে আল-জাজিরার সঙ্গে জামায়াতের আমিরের বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারের একটা বাক্য ছিল, ‘আমরা তাদের প্রস্তুত করছি।’ এই বক্তব্যকে সমালোচকেরা খুব বেশি খতিয়ে দেখেছেন বলে মনে হয় না। বক্তার ওই চার শব্দ ইঙ্গিত দেয়, অর্থনৈতিক নীতি-আদর্শের মতো নির্বাচনী রাজনীতির জাতীয় পর্যায়েও নারীদের নিয়ে আসার বিষয়ে ডা. শফিক একধরনের সংগ্রামে আছেন।

২০২৬ সালের বিশ্বে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে জামায়াতের কথিত নীতি অবশ্যই বিস্ময়কর; কিন্তু তাকে সংস্কারের চেষ্টা এবং সে রকম চেষ্টার সফলতার জন্য প্রধান নেতার পরিশ্রম মনোযোগ পাওয়ার মতো। তিনি যে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে গেলেন, তাকেও দলটির চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা যায়। যে ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে এই দলের মনোনয়নে অমুসলিম প্রতিনিধি আরও বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

ইতিমধ্যে বৈশ্বিক যোগাযোগও বহুমুখী অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে। বাংলাদেশের যেকোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ে এ ক্ষেত্রে তাদের অর্জন ও প্রাপ্তি ঈর্ষণীয়। বিদেশে থাকা বহু সাবেক কর্মীকে তারা এবার দেশে এনে নির্বাচনী কাজে যুক্ত করেছিল—যাঁদের কাছে ‘ইসলামি বিপ্লব’–এর চেয়ে ক্ষমতার প্রশ্ন ছিল বড়। আবার ভারত, চীনসহ অনেক দেশের সঙ্গেই তাদের বোঝাপড়ার ভিত্তি এখন আর ধর্মীয় অনুভূতি নয়, ক্ষমতার ব্যবহারিক স্বার্থ।

সব মিলিয়ে ডা. শফিকের নেতৃত্বের এক দশকে জামায়াতের আদর্শিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের একটা স্পষ্ট পর্যায় শেষ হলো এবার। তিনি যে দলটিকে একাত্তরকালীন নেতৃত্ব ও তখনকার চিন্তাকাঠামো থেকে বের করে গণমুখী করতে চেষ্টা করছেন, তাঁর আরও পদক্ষেপ সামনে দেখা যাবে বলে মনে হয়।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য এই দলের দিকে সামাজিক যেসব ন্যায্য প্রশ্ন আছে, সেসবের এখনো খোলামেলা মীমাংসা হয়নি। তবে দলটির নেতৃত্বের বড় অংশ এখন একাত্তর–পরবর্তী প্রজন্ম। তারা দলের অতীত ভূমিকার নির্মোহ একটা মূল্যায়ন করতে প্রস্তুত বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এনসিপিকে কাছে রাখতে কিংবা এ রকম দলের কর্মী বাহিনীকে দলভুক্ত করে ফেলতে সেই কৌশল ভালো কাজ করবে বলে ধারণা করা যায়।

আরও পড়ুন

তবে ডা. শফিকের ধীরলয়ের সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলোর একটা বড় পরীক্ষা হবে বিএনপির নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে জামায়াতের নতুন প্রজন্মের সম্পর্কের ওপর। জামায়াতের পুরোনো নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার যে বোঝাপড়া ছিল, ২০২৬-এ এসে সেটা পুরোপুরি অনুপস্থিত।

বিএনপির নীতিনির্ধারণে বর্তমানে সম্পূর্ণ নতুন একটা টিম কাজ করছে। আবার জামায়াতের বিজয়ী এমপিদের তালিকায় সাবেক শিবির ও মাঠপর্যায়ের সংগঠকদের আধিপত্য লক্ষ করার মতো। এটা উভয় দলের সম্পর্ক ও বোঝাপড়ার ভবিষ্যৎকে নতুন করে নির্ধারণের অপেক্ষায় রাখছে। উভয়ের রাজনৈতিক সংঘাত আওয়ামী লীগ-বিএনপির আদল নিলে ডা. শফিকের সংস্কারবাদী ভঙ্গি নতুন পরীক্ষায় পড়বে। রাজনীতির মাঠে লীগ নিষেধাজ্ঞা পেরোতে পারলে সে রকম পরীক্ষা নিশ্চিতভাবে ভিন্ন আরেক চেহারা নেবে।

  • আলতাফ পারভেজ গবেষক ও লেখক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব