‘আমি ও ডামি’র সাজানো ছকে ভোট করে ৭ মাসের মধ্যে পতন

২০১৪ ও ২০১৮-এর পর তৃতীয় দফা সাজানো নির্বাচন করে আর টিকতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার। পতন হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের পরদিন ৮ জানুয়ারি প্রথম আলোতে নির্বাচনের ফলাফলের সংবাদ

আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে শেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি, যা ছিল তাদের আগের দুটি নির্বাচনের চেয়েও অভিনব। সেটি ‘আমি’ ও ‘ডামি’ নির্বাচন নামে পরিচিত লাভ করেছে। অর্থাৎ মূল প্রার্থী আওয়ামী লীগের, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও একই দলের—পার্থক্য শুধু স্বতন্ত্র পরিচয়। এর বাইরে ছোট ছোট কিছু দলের প্রার্থীও ভোটে ছিলেন। তবে তারাও আওয়ামী লীগেরই মিত্র। কেউ কেউ আবার নৌকা প্রতীকে ভোট করেছিলেন। সাজানো এ নির্বাচনের ফলাফলও আগে থেকে জানা ছিল, ভোট ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা।

দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি নেতিবাচক নজির হয়ে থাকবে। এই নির্বাচন ঘিরে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা, কৌশল ও পরিণতি হয়েছিল, তা শুধু একটি ভোটের দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ছিল টানা এক দশকের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসের চূড়ান্ত প্রকাশ।

‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত ২০১৮ সালের নির্বাচনের দিন ৩০ ডিসেম্বর সকালে ভোট গ্রহণ শুরুর আগে চট্টগ্রামে বিবিসি সংবাদদাতার ক্যামেরায় ধরা পড়ে আগেই ভরে রাখা ব্যালট বাক্স।
ছবি: বিবিসির ভিডিও থেকে।

এই নির্বাচনকে বুঝতে হলে তাকাতে হয় পেছনের দিকে—২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের দিকে। ২০১৪ সালে বিএনপিসহ ১৮-দলীয় জোটের বর্জনের মুখে একতরফা ভোট করে আওয়ামী লীগ। ২০১৮ সালে সব দল অংশ নিলেও অভিযোগ ওঠে ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে ফেলার। সরকারবিরোধীরা একে আখ্যা দেয় ‘রাতের ভোট’ হিসেবে। ২০২৪ সালের ‘ডামি’ নির্বাচন নিয়ে আগেই বলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ওই তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। ওই কমিশন গত ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে বলা হয়, ওই তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম করে জেতার ‘অভিনব’ পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালের ভোটের পর থেকেই। এই পরিকল্পনা হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে। আর তা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এক দফা দাবিতে বিএনপির মহাসমাবেশ চলাকালে দলটির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেল ও বিএনপির কর্মীদের ইটপাটকেলে পুরো এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। গতকাল বেলা আড়াইটায় রাজধানীর কাকরাইলে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

বিরোধীশূন্য নির্বাচন  ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। দলটি ২০২৩ সালজুড়ে দেশব্যাপী সমাবেশ, পদযাত্রা ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। এসব কর্মসূচিতে ব্যাপক জমায়েত ছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার নয়াপল্টনে মহাসমাবেশ করে বিএনপি। বিপুল মানুষের জমায়েত ছিল সেটা। আকস্মিকভাবে কয়েক দিক থেকে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং লাঠিপেটা করে সেই মহাসমাবেশ পণ্ড করে দেয়। ওই দিন সংঘর্ষে এক পুলিশ সদস্যসহ নিহত হন দুজন। এরপর বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু করে পুলিশ। মূলত ওই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে হামলার পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে কোণঠাসা করে আওয়ামী লীগ একক নির্বাচনের দিকে এগোয়। বিরোধী দলগুলোর হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। বর্তমানে তিনি কারাগারে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

যদিও এ ধরনের একটি নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগ সরকারকে বিরত রাখতে বিদেশি চেষ্টা ছিল। ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর দেশের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে চিঠি দেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শর্তহীন সংলাপের আহ্বান জানানো হয়। যদিও আওয়ামী লীগ তাতে কান দেয়নি।  লু চিঠি দেওয়ার দুই দিন পরেই (১৫ নভেম্বর, ২০২৩) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তবে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সংলাপের পরামর্শ দেন তিনি। যদিও সংলাপ আর হয়নি।

জাতীয় পার্টি নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন চরমে পৌঁছায়। ওই নির্বাচন বর্জনের পক্ষে জাতীয় পার্টির ভেতরে জোরালো মত তৈরি হয়েছিল। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি দলের বৈঠকগুলোতে জেলা পর্যায় ও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের বড় অংশ নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত দেয়। মতামতগুলো যেসব বৈঠকে উঠে আসে, সেসব বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছিলেন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

এমতাবস্থায় জাতীয় পার্টি নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দলটির নেতাদের ওপর কঠোর নজরদারিতে যুক্ত করা হয়। জি এম কাদের তাঁর প্রয়াত বড় ভাই এইচ এম এরশাদের মতো (২০১৪ সালের ভোটে) নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন, শেষ মুহূর্তে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বসতে পারেন—এমন আশঙ্কায় রওশনপন্থী নেতাদের আবার সক্রিয় করে সরকার। অন্যদিকে জি এম কাদেরের অংশ ছিল আসন ভাগাভাগির দর-কষাকষিতে।

মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ১৭ ডিসেম্বর (২০২৩)। এদিন বেলা ১১টার দিকে বনানী কার্যালয়ে যান জি এম কাদের। আগে থেকে সেখানে ছিলেন দলের মহাসচিব মুজিবুল হক, সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সালমা ইসলাম ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান। নেতারা কার্যালয়ে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই বাইরে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিতে থাকেন। তখন জি এম কাদের কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ভিক্ষার সিট আমি নেব না।’ এ কথা বলে তিনি তাঁর কক্ষে চলে যান।

এমন অবস্থার মধ্যেই সরকারি সংস্থাগুলো আশঙ্কা করে যে জি এম কাদের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিতে পারেন। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য ওই কার্যালয়ের ভেতরে–বাইরে অবস্থান নেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের (প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর) কয়েকজন কর্মকর্তা সেখানে পৌঁছান। তাঁরা জি এম কাদেরসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে একটি কক্ষে বসেন। পরে দেখা যায়, জি এম কাদের নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আরও পড়ুন
২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট

স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে দলীয় নেতা-কর্মীদের উৎসাহ  ২০২৪ সালের নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ‘অংশগ্রহণমূলক’ ও ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখাতে আওয়ামী লীগ নজিরবিহীন কৌশল নেয়। দলীয় নেতা-কর্মীদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে উৎসাহ দেওয়া হয়।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেয় ২৬৬ আসনে। স্বতন্ত্র আওয়ামী লীগ ছিলেন ২৬৯ জন। ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া তখনকার সংসদে বিরোধী দলের আসনে থাকা জাতীয় পার্টিকে ২৬টি আসনে ছাড় দেয়। ওই সব আসনে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থীদের সরিয়ে নেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় শরিকেরা সমঝোতার মাধ্যমে ছয়টি আসনে ছাড় পায়। এর মধ্যে জাসদ তিনটি, ওয়ার্কার্স পার্টি দুটি ও জাতীয় পার্টি (জেপি) একটি আসন পায়। তাঁরা অবশ্য আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা নিয়ে নির্বাচন করেছেন।

ভোটের আগে নতুন করে নিবন্ধন পাওয়া ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম ও সুপ্রিম পার্টি ভোটে অংশ নেয়। পাশাপাশি বিএনপির দলছুট কিছু নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তাঁদের অন্তত ১৫ জনকে জিতিয়ে আনতে সরকার-ঘনিষ্ঠ কোনো কোনো মহল ও গোয়েন্দা সংস্থা তৎপর ছিল। তাঁদের পক্ষে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মাঠে নামায় গোয়েন্দা সংস্থা। ফলে নির্বাচনী মাঠে দেখা যায় এক অদ্ভুত চিত্র, আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র আওয়ামী লীগ।

বিতর্কিত তিন নির্বাচনের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক দেখাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এতে তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম ও বিএসপির মতো নতুন দল গঠন ও নিবন্ধনের পেছনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।

বিএনপি নেতা শাহজাহান ওমরকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দ্রুত আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ানো, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমকে বিশেষ সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে আনা—এসবই ছিল গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনের সহযোগিতায় রাজনৈতিক ‘ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অংশ। উদ্দেশ্য ছিল সংসদে কিছু ভিন্ন নাম ও প্রতীক রাখা, যাতে নির্বাচনকে একদলীয় নয় বলে দাবি করা যায়।

সহিংসতা, আগুন ও আতঙ্ক ‘আমি’ ও ‘ডামি’ নির্বাচনেও সংঘাত ও প্রাণহানি থামেনি। প্রচারপর্বের ১৮ দিনে সারা দেশে শতাধিক সংঘাতের ঘটনা ঘটে, প্রাণ যায় অন্তত তিনজনের। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল-অবরোধের মধ্যে অনুষ্ঠিত ওই ভোটের আগের ২৪ ঘণ্টা ছিল চরম অস্থির। ১৪ জেলার ২১টি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া হয়। এর বাইরে নির্বাচনী ক্যাম্প, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে যে তথাকথিত ‘স্বতন্ত্র কৌশল’ নেওয়া হয়েছিল, সেটিই মাঠে সংঘাত বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের ভোট দিতে আসছেন ভোটাররা। ঢাকা–১৩ আসন। ৭ জানুয়ারি, ২০২৪
ছবি: প্রথম আলো

নিরুত্তাপ কেন্দ্র, ফাঁকা ভোটকেন্দ্র

৭ জানুয়ারির ভোটের দিন ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম। অনেক কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বাইরে কোনো পোলিং এজেন্ট দেখা যায়নি। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজে ভোট দিতে গিয়ে জানান, তিনি নৌকার বাইরে আর কোনো এজেন্ট পাননি। রাঙামাটির বাঘাইছড়ির দুটি কেন্দ্রে একটি ভোটও না পড়ার ঘটনা এই নির্বাচনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এ ছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকদের ভোটারের লম্বা লাইন দেখাতে ‘ডামি লাইন’ দাঁড় করানো হয়েছিল। জাল ভোট, ব্যালট ছিনতাই, কেন্দ্র দখল, প্রকাশ্যে সিল মারা—এসব অনিয়মের অভিযোগ আসে বিভিন্ন এলাকা থেকে।

ভোট গ্রহণ চলার সময় তিন দফা ভোটের শতকরা হার ঘোষণা করেছিল ইসি। সেই হিসাব অনুযায়ী, বেলা তিনটা পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানিয়েছিল ইসি। তখন বলা হয়েছে, সব জায়গার হিসাব পাওয়া যায়নি। ভোটের হারে কিছু হেরফের হতে পারে। বিকেল চারটায় ভোট শেষ হওয়ার ঘণ্টা দেড়েক পর প্রেস ব্রিফিংয়ে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল শুরুতে বলেন, ভোট পড়েছে ২৮ শতাংশ। তখন পাশ থেকে একজন সংশোধন করে বলেন, সংখ্যাটি ৪০ শতাংশ হবে। সিইসি তখন ভোটের হার ৪০ শতাংশ হতে পারে বলে জানান। তিনি বলেন, এটা নিশ্চিত হিসাব নয়। বাড়তে পারে, না-ও পারে।

পরদিন ইসি প্রায় ৪২ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানায়। এই হার অনুযায়ী শেষ এক ঘণ্টাতেই ভোট পড়েছে ১৪ শতাংশের বেশি। এ নিয়ে ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত খবরের শিরোনাম ছিল, ‘ভোটের হার নিয়ে সন্দেহ, প্রশ্ন’।

জামানত হারান ২৩ দলের প্রায় সবাই

ফলাফলে কোনো চমক ছিল না। সংসদের ৯৪ শতাংশের বেশি সদস্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের অংশ হয়ে ওঠেন। কোনো সরকারবিরোধী কণ্ঠ সংসদে উপস্থিত ছিল না। নির্বাচনে অংশ নেয় নিবন্ধিত ২৮টি দল। আওয়ামী লীগ (২২৪টি) এবং দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা (৫৯) মিলে জিতেছেন ২৮৩ আসনে। আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টি ১১টি এবং ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও কল্যাণ পার্টির প্রার্থীরা একটি করে আসনে জয়ী হন। অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন তিনটি আসনে। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, কল্যাণ পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাকি ২৩ দলের প্রার্থীদের মধ্যে একজন ছাড়া অন্য সবাই জামানত হারান।

নির্বাচনটি যে আওয়ামী লীগের ভেতরকার ছিল, তা তুলে আনা হয় ভোটের পরদিন প্রথম আলোর শিরোনামে। শিরোনাম ছিল ‘আ.লীগ ১৬০, আ.লীগের স্বতন্ত্র ৩৯’ (পুরো ফল তখনো আসেনি)।

ছাত্র–জনতার বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান
ছবি: সংগৃহীত

আমৃত্যু ক্ষমতার মিথ ও পরিণতি

একতরফা নির্বাচন দিয়ে অন্যায্যতার শুরু, রাতের ভোট দিয়ে টিকে থাকা, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি ডামি নির্বাচন দিয়ে বৈধতার অভিনয়—এই তিনটি অধ্যায় মিলেই তৈরি হয়েছিল এক দীর্ঘ বিভ্রম। সেই বিভ্রমে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, শেখ হাসিনা বুঝি আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী এবং ২০৪১ সালের আগে এই ক্ষমতার পালাবদল অসম্ভব।

২০২৪-এর ৭ জানুয়ারির ভোটের সাত মাসের মাথায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের (৫ আগস্ট, ২০২৪)। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের আয়োজনে ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন।

দেখার বিষয়, এই নির্বাচন অতীতের কলঙ্কের বিপরীতে নতুন উদাহরণ তৈরি করতে পারে কি না।