দিদিয়ের দেশমের দেশের অন্তত ৩৭ জন ফুটবলার কাতার বিশ্বকাপে ৯টি দেশের হয়ে খেলছেন, ফিফার যথাযথ নিয়ম মেনে। যেখানে বলা হয়েছে, কোনো ফুটবলার যদি ২১ বছর বয়সের আগে কোনো দেশের হয়ে তিনটির বেশি ম্যাচ না খেলে ও বিশ্বকাপ বা মহাদেশীয় টুর্নামেন্টে অংশ না নেয় তাহলে জাতীয়তা পরিবর্তন করতে পারবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল প্রকৃত অর্থেই বৈচিত্র্যের। কবির ভাষায়, ‘শক-হুন-দল পাঠান মোগল/ এক দেহে হল লীন’। জার্মানি দলে যেমন ফরাসি খেলোয়াড় আছেন, তেমনি ওয়েলস দলে আছে জার্মান খেলোয়াড়। আবার ওয়েলসের হয়ে যাঁরা খেলছেন, তাঁদের অনেকের জন্ম ইংল্যান্ডে। আবার ইংল্যান্ডের অন্যতম সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ বুকায়ো সাকা নাইজেরীয় বংশোদ্ভূত।

বিশ্বকাপের খেলোয়াড়দের জন্ম–ঠিকুজি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া ফুটবলাররা নাচাচ্ছেন সারা দুনিয়া। আর ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ফুটবলারদের আধিপত্য বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে আফ্রিকার দলগুলোয়।

কাতার বিশ্বকাপের ৩২টি দলের মধ্যে কেবল চারটি দলের সব খেলোয়াড় তাদের নিজের দেশের। কোনো অভিবাসী খেলোয়াড় নেই তাদের। দেশগুলো হলো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও দক্ষিণ কোরিয়া। এর বাইরে দেড় শর মতো ফুটবলার বাকি ২৮টি দলের হয়ে খেলছেন, যে দেশ হয়তো তাঁদের জন্মভূমি নয়।

এই বিশ্বকাপে সেনেগালের ৯ জন ফুটবলারের জন্ম ফ্রান্সে। তিউনিসিয়ার রয়েছে ১০ ফরাসি খেলোয়াড়, আর ক্যামেরুনের রয়েছে ৮ জন। পর্তুগালেও আছেন ফরাসি সৌরভ রাফায়েল গেরেরো, জার্মানিতে আছেন আরমেল বেলা-কচাপ, স্পেনে এমেরিক লাপোর্তে ও কাতারে করিম বুয়াদিয়াফ।

আর ৫০ জনেরও বেশি ফুটবলার, যাঁদের জন্ম আফ্রিকায় বা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত, ১১টি দলের হয়ে খেলছেন। জার্মানিতে এ রকম খেলোয়াড় আছেন ৮ জন। এর বাইরে যদি নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড় তালিকার দিকে তাকানো হয়, সহজেই দেখা যাবে, তাঁদের অধিকাংশই এসেছেন ক্যামেরুন, সুদান, ঘানা, মালি, গিনি বিসাউ, অ্যাঙ্গোলা, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, আইভরিকোস্ট এবং অন্যান্য আফ্রিকান দেশ থেকে।

এই খেলোয়াড়দের প্রায় সবাই এসব উন্নত দেশে পা রেখেছেন শরণার্থী হিসেবেই। অস্ট্রেলিয়ান ফরোয়ার্ড গারাং কুয়োলের কথাই ধরা যাক। তাঁর পরিবার যুদ্ধবিধ্বস্ত দক্ষিণ সুদানের বাসিন্দা। সেখান থেকে তাঁর পরিবার পালিয়ে চলে যায় মিসরে। সেখানেই গারাংয়ের জন্ম, ২০০৪ সালে। এরপর শরণার্থী হিসেবে পরিবারের সঙ্গে তিনি চলে যান অস্ট্রেলিয়া।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, অস্ট্রেলিয়ার গারাংয়ের দুই সতীর্থ টমাস ডেং এবং আওয়ার মাবিলের দেশও দক্ষিণ সুদান। তিনজনের গল্পেই অভিন্ন বেদনার রং।

অভিবাসী খেলোয়াড়দের অবদানের কথা বলতে গেলে আমাদের চোখ রাখতে হবে ২০১৮–এর বিশ্বকাপে। ফ্রান্সের হয়ে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন তরুণ তুর্কি কিলিয়ান এমবাপ্পে, তাঁর নাড়ি পোঁতা তো আফ্রিকাতেই, আলজেরীয় ও ক্যামেরুনীয়, যৌথ রক্তধারা বইছে তাঁর শরীরে। এনগোলো কান্তে আর দুষ্টু ছেলে পল পগবা, যাঁরা এ বছর কাতার বিশ্বকাপ মিস করছেন—দুজনই এসেছেন মালি ও গিনি থেকে।

কীভাবে তাঁরা এত সাফল্য পাচ্ছেন? ফুটবল–গবেষকেরা বলছেন, শরণার্থীজীবনের কষ্ট ফুটবল মাঠের আনন্দে রূপান্তর করার দর্শন থেকেই এমন সাফল্য। ছোট্ট ঘরে দম আটকা পরিবেশে না থেকে ফুটবল নিয়ে মাঠে পড়ে থাকাই তাঁদের কাছে শ্রেয় মনে হয়েছে।

দেখা যাচ্ছে, যে অভিবাসী তরুণ কোনো বড় দেশের জাতীয় দলে খেলছেন, তাঁদের বাবা বা বড় ভাইও ফুটবলার ছিলেন। এই বাবা ও বড় ভাইদের বিশেষ অবদান রয়েছে তাদের আজকের অবস্থানে আসার পেছনে। ছেলেকে পিয়ানো ক্লাসে না নিয়ে গিয়ে ফুটবল মাঠে তালিম দিয়েছেন। আর তাঁদের সামনে রোল মডেল হিসেবে ছিলেন জিনেদিন জিদান, করিম বেনজেমারা।