ইরানে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতারা টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে স্পষ্ট করেছিলেন যে তাঁরা ইরানে শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন করতে চান। শান্তি প্রতিষ্ঠায় চুক্তি করার জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ করছেন না।
ইরানে দুই দেশের যৌথ হামলা এবং দ্রুত ইরানের পাল্টা আঘাত দেখিয়ে দেয়, কূটনীতি কতটা অনিশ্চিত হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং পরবর্তী সপ্তাহে আবার আলোচনা শুরু হবে বলে মধ্যস্থতাকারীরা ঘোষণা দেওয়ার পর ওই হামলা হয়। এতে স্পষ্ট হয় যে কূটনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান চাওয়া হয়নি। এখানে কূটনীতিকে মূলত যুদ্ধ পরিকল্পনাকে আড়াল করতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হামলার পর এটা অনুমান করা যায়, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব কয়েক সপ্তাহ আগেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। হামলার প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘বিজয়’ ঘোষণার পথে থাকার কথা বলেন। যদিও তাঁরা বিজয় অর্জন করতে পারবেন কি না, সেটা অনিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এবং সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বলে। সম্ভবত তারা আশা করেছিল, দ্রুতই এই যুদ্ধ শেষ করতে পারবে। ইসরায়েল দাবি করে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইরানের নেতৃত্বকে নির্মূল করে তারা ‘বিরাট সাফল্য’ অর্জন করেছে।
তবে এবারের হামলায় খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বেশ কয়েকজন নিহত হলেও পাল্টা হামলা চালাতে সময় নেয়নি তেহরান। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা।
যেভাবে ইরাক পাল্টা হামলা চালিয়েছে, তা এই ইঙ্গিত দেয় যে হামলা হবে বুঝতে পেরে তারা প্রতিশোধ পরিকল্পনাও প্রস্তুত করে রেখেছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রকে এ অবস্থান থেকে টলাতে পারবে কি না। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এ যুদ্ধ নিয়ে দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছে।
দেশের মধ্যে চাপে পড়বেন ট্রাম্প
মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে বিদেশে সংঘাতে জড়ানো নিয়ে তেমন আগ্রহ না থাকলেও ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন। ‘ইউগভ’ ও দ্য ইকোনমিস্ট-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পক্ষে। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অপর একটি জরিপে এই সমর্থনের হার আরও কম, মাত্র ২১ শতাংশ।
এ যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা ডেকে আনতে পারে। ইরান যদি আত্মসমর্পণ না করে, তাহলে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বেন। হয় তাঁকে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হবে আর নয়তো পিছু হটে ‘দুর্বল’ হিসেবে জনগণের সামনে হাজির হতে হবে।
সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এ যুদ্ধ একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দেখা দেবে। যুদ্ধ যদি প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা অনুযায়ী না এগোয়, তাহলে নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যদি ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, তাতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি কংগ্রেস ডেমোক্র্যাটদের দখলে গেলে ট্রাম্পের ওপর অভিশংসনের চাপ আরও বাড়তে পারে।
ট্রুথ সোশ্যালে ‘বিজয় ঘোষণা’ হতে পারে যুদ্ধ শেষের কৌশল
বিশ্লেষকদের কেউই মনে করছেন না যে এই যুদ্ধ অল্প সময়ে শেষ হবে। এর আগে গত বছর জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। ওই যুদ্ধের তুলনায় বর্তমান সংঘাত অনেক বেশি বিস্তৃত ও গভীর মনে হচ্ছে। পুরো অঞ্চলে ইরানের পাল্টা আঘাত ইঙ্গিত দেয় যে দেশটি সমঝোতার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ করতেই বেশি আগ্রহী।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিব বর্তমানে দুটি সমস্যার মুখোমুখি। প্রথমত, এ অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত অস্থিতিশীলতা তৈরি না করে কীভাবে তেহরানের ওপর চাপ বজায় রাখা যায়। দ্বিতীয়ত, দেশ দুটি ইরানের ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনকে’ নিজেদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
ইরানে হামলার ঘোষণা দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট আভাস দেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল আকাশপথে হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং কোনো স্থলসেনা মোতায়েন করবে না; বরং ইরান সরকারকে উৎখাতের দায়িত্ব তিনি দেশটির জনগণের ওপরই ছেড়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় ঘনিয়ে এসেছে।’ এ সময় ইরানিদের বিদ্রোহ করারও আহ্বান জানান ট্রাম্প।
দুই মাস আগে ইরানজুড়ে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের পর এ আহ্বান জানানো হয়। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ সেই সময় দমনের কঠোর পথ বেছে নিয়েছিল, যাতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হন। বর্তমানে দেশটিতে এ ধরনের বড় গণবিক্ষোভের সম্ভাবনা খুব কম বলেই মনে হচ্ছে। সেই দমন-পীড়নের ক্ষত এখনো সমাজে গভীরভাবে রয়ে গেছে এবং ইরান আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল।
এদিকে ইরানের নেতৃত্বকে নির্মূলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা সম্ভবত অব্যাহত থাকবে। এ ধরনের হামলা সফল হলেও সেটি সরকার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে না।
শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের জেনারেলরা হয়তো পরামর্শ দেবেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সুবিধাজনক হবে না, যা অনেকটা ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতারই পুনরাবৃত্তি হবে। ট্রাম্পের জন্য এমন এক জয়হীন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পুরোনো কৌশল হতে পারে, (নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম) ট্রুথ সোশ্যালে বিজয় ঘোষণা করা এবং আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া।
তখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে একটি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করা। আলোচনার নামে দুবার প্রতারিত হওয়ার পর তেহরান এবার নিজের অবস্থান আরও কঠোর করতে পারে। যদি বর্তমান সরকার টিকে থাকে, তবে নতুন করে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মরিয়া ভাবকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের দাবি আদায় করে নিতে পারে। সেই অর্থে, আজকের কূটনৈতিক ব্যর্থতা আগামী দিনে ইরানকে শক্তিশালী অবস্থানে থেকে দর-কষাকষির সুযোগ করে দিতে পারে।