আজ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস

'বোঝা' হয়ে রাউজানের বৃদ্ধাশ্রমে তাঁরা

শয্যায় বসে আছেন সত্তরোর্ধ্ব নজরুল ইসলাম। তাঁর পিঠের ঘায়ে পরম মমতায় ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছেন আরেক বৃদ্ধ মো. হোসেন। তাঁরা থাকেন একই কক্ষে। তবে তাঁরা কেউ কারও আত্মীয় নন। কিন্তু স্বজনের মায়া-মমতাবঞ্চিত এই প্রবীণেরা পরস্পরের প্রতি বাড়িয়ে দেন এ রকম সহানুভূতির হাত।

স্বজনের ‘বোঝা’ এই দুই বৃদ্ধের ঠাঁই হয়েছে চট্টগ্রামের রাউজানের নোয়াপাড়ার আমেনা বশর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে। শুধু তাঁরা নন, তাঁদের মতো আরও ১৫ জনের ঠিকানা এখন এই বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধাশ্রমে আসার পেছনের গল্পটা প্রায় সবারই এক রকম। স্বজনের কাছে ‘বোঝা’ হয়ে ওঠার পর এখানে আসতে বাধ্য হন তাঁরা।

২০১৪ সালের ১ মে নোয়াপাড়া কলেজের পাশে এই বৃদ্ধাশ্রমের যাত্রা শুরু হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা মো. সামছুল আলম। বৃদ্ধাশ্রমের নামকরণ হয় তাঁর প্রয়াত বাবা-মায়ের নামে।

বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ১৭ জনের মধ্যে আছেন শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও বিদেশফেরত ব্যক্তি। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় বৃদ্ধাশ্রমে আসার পেছনের গল্প। একসময় তাঁরা স্বজনের ভালোবাসা পেয়েছেন। একপর্যায়ে উবে যায় স্বজনের সেই ভালোবাসা।

৪০ বছর ধরে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করেছেন অঞ্জু ভট্টাচার্য (৭৭)। তাঁর এক ছেলে, এক মেয়ে। স্বামী মারা গেছেন। ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়েছে। ছেলের বিয়ের পর থেকেই তাঁর জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ২০ দিন আগে তিনি আশ্রয় নেন বৃদ্ধাশ্রমে।

পটিয়ার অঞ্জু ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমার ওপর ভীষণ অত্যাচার শুরু করে পুত্রবধূ। একপর্যায়ে গায়ে হাতও তোলা হয়। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। এমন পরিস্থিতিতে আমার ছেলে বড় অসহায় হয়ে পড়ে। পরে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে চলে আসার। ছেলেমেয়ে দুজনে মিলেই এখানে দিয়ে গেছে।’

চন্দনাইশের বাণী চৌধুরী স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এখন বয়স হয়েছে। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা অসুখ। আট মাস আগে তিনি বৃদ্ধাশ্রমে আসেন। এই বৃদ্ধা বললেন, ‘আমার এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকে। ছেলের বউ খাবার দেয় না। সারাক্ষণ ঝগড়া করে। আমার ছেলে বউকে ভয় পায়। পাঁচ বছর আগে আমার স্বামী মারা যান। এখন অসহায়। পরে এখানে চলে আসি।’

আবদুল রব্বানী (৮০) চলতি মাসে বৃদ্ধাশ্রমে এসেছেন। একসময় মধ্যপ্রাচ্যে ছিলেন। দুই মেয়ে ও একমাত্র ছেলের বিয়ে হয়েছে। রব্বানী বলেন, ‘যখন রোজগার করতাম, তখন ভালোই ছিলাম। এখন বোঝা হয়ে গেছি। ছেলে ভাত দিত না। একদিন মেরে তাড়িয়ে দেয়। তারপর এখানে চলে এলাম।’

সাবেক সরকারি চাকুরে এ চৌধুরীর দুই মেয়ে। কোনো ছেলে নেই। তিনি বলেন, ‘এক মেয়ে এমন নির্যাতন করেছে, সেটা বলার মতো না। তাই এখানে উঠতে হলো।’

কেন বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলেছেন? জানতে চাইলে একটু পেছনে ফিরে গেলেন এর প্রতিষ্ঠাতা ব্যবসায়ী সামছুল আলম। ‘১৯৮৫ সাল। ইংল্যান্ডে বেড়াতে গিয়েছিলাম আমি। ছিলাম চাচাতো ভাইয়ের বাসায়। একদিন বিকেলে বসে ছিলাম বাসার বারান্দায়। দেখলাম সাইরেন বাজিয়ে একটি গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। আমার চাচাতো ভাই জানালেন, গাড়ির আরোহীরা বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। তাঁদের ঘোরানোর জন্য পার্কে নেওয়া হচ্ছে।’—বললেন সামছুল আলম। একটু দম নিয়ে তিনি বললেন, ‘সেদিনই ঠিক করেছিলাম আমি এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান করব। যেখানে অসহায় বয়স্করা তাঁদের জীবনের শেষ দিনগুলো নিশ্চিন্তে কাটাতে পারবেন।’

নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পেরে তৃপ্ত রাউজানের নোয়াপাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা সামছুল আলম। প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া অসহায় মানুষদের কাছে ছুটে যান চট্টগ্রাম নগরের এই ব্যবসায়ী। তাঁদের সুখ-দুঃখের খবর নেন। বৃদ্ধাশ্রমের চারতলা ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থাপক মো. হারুন জানান, পাঁচজনকে নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমের যাত্রা শুরু। একসময় ২৬ জন ছিলেন এখানে। বর্তমানে আছেন ১৭ জন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন নারী। তিনি জানান, সম্প্রতি পাঁচজন মারা গেছেন।

এখানকার বাসিন্দাদের চিকিৎসা দেওয়া হয় পাশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে। ছয়জন কর্মী প্রবীণদের দেখাশোনা করেন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক বন্দনা দাশ জানান, তাঁদের কাছ থেকে নিবন্ধন নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে আমেনা বশর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র। বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয় না। তিনি জানান, এটি ছাড়া চট্টগ্রামে আর কোনো বৃদ্ধাশ্রম নেই।