
প্রাইম ব্যাংক প্রেজেন্টস লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ শোতে সবাইকে স্বাগত। আজকের অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ‘আলোর ভেতরে মানুষ: সম্পাদক মতিউর রহমানের নীরব শক্তি ও জীবনবোধ’। লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচের সঙ্গে আমরা এমন সব আলোকিত মানুষকে আমন্ত্রণ জানানোর চেষ্টা করি, যাঁদের জীবনের অর্জন এবং সেই অর্জনের নীরব যাত্রাগুলো নিয়ে আমরা কথা বলি। আমার আজকের শোতে এমন একজন ব্যক্তি এসেছেন, যাঁর রয়েছে পেশাগত দৃঢ়তা, রয়েছে সমাজের প্রতি মানবিকতার উদাহরণ। ছাত্রজীবনের আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রজন্মের পাঠ এবং তাদের জীবনবোধ গঠনে তাঁর নীরব ভূমিকার রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। আমাদের আজকের শোর বিশেষ অতিথি প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। সঞ্চালনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হক।
মতিউর রহমানের জীবন একটি অবিরাম অনুসন্ধানের পথ; রাজনীতি, চিন্তাচেতনা এবং সাংবাদিকতার দীর্ঘ যাত্রায় গড়ে তোলা এক স্বতন্ত্র পরিচয়। প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মতিউর রহমান কয়েক দশকের বেশি সময় ধরে লাখো পাঠকের আবেগের জায়গায় ছুঁয়ে গেছেন। তিনি র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব, যিনি সততা ও দায়িত্ববোধের এক প্রতীক। মতিউর রহমান, আপনাকে অনেক অনেক স্বাগত।
মতিউর রহমান: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
একেবারে ছোটবেলায় ফিরে যাই। শৈশবের খেলার মাঠ, ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন—সেই শৈশবের মানুষটা কি আপনার ভেতরে এখনো বিচরণ করে?
মতিউর রহমান: আমার ভেতরে সেই শৈশব, কিশোরবেলা এখনো বিচরণ করে। তখন আমরা থাকতাম পুরান ঢাকার বংশাল রোডে। বংশাল রোডের খুব কাছে ছিল দৈনিক সংবাদ-এর অফিস। ১৯৫৩ সাল থেকে সকালে ঘুম থেকে উঠে হেঁটে গিয়ে দেয়ালে সাঁটানো পত্রিকা পড়াটা আমার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। শৈশবের সেই দিনগুলোতে আমার প্রধান আকর্ষণ ছিল খেলার সংবাদ। প্রথমেই আমি শেষ পৃষ্ঠার খেলার খবর পড়তাম। সেই ’৫৩ সাল থেকেই বলা যায় আমি খেলার মাঠে, ক্লাবের অনুশীলনে এবং খেলোয়াড়দের পেছনে ঘোরাঘুরি করেছি।
১৯৫৩ সালের ২৯ মে নিউজিল্যান্ডের এডমন্ড হিলারি ও শেরপা তেনজিং নোরগের এভারেস্ট বিজয়ের খবরটিও আমার বিশেষভাবে মনে পড়ে—সংবাদ-এ আট কলাম হেডিং দিয়ে প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল। খবরটি আমাকে খুব আকর্ষণ করেছিল। তার কয়েক বছর পরে, ভুল না হলে ১৯৫৬ সালে, আমাদের দেশের সাঁতারু ব্রজেন দাস যখন ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন, সেটি সে সময়ের একটা বড় ঘটনা। সে খবরটাও সংবাদ-এ বড় করে আট কলামে ছাপা হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনো অমলিন।
আমাদের স্কুল ছিল নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল, কাপ্তান বাজারে। কাপ্তান বাজার পেরিয়েই গুলিস্তান সিনেমা হলের পাশে পল্টন ময়দান, তারপর স্টেডিয়াম। হেঁটে স্কুলে যেতাম, আবার বাসায় ফিরে এসে হেঁটেই পল্টন ময়দানে যেতাম। একদিকে দৈনিক সংবাদ-এর খবর, অন্যদিকে খেলার মাঠ—এই দুটো মিলেই আমার শৈশব ও কৈশোর-স্মৃতি, যা এখনো আলোড়িত করে।
এখনো মাঝেমধ্যে ক্রীড়াজগৎ নিয়ে উৎপল শুভ্রর সঙ্গে প্রশ্নোত্তরে তর্কে লিপ্ত হই। যেমন ডেকাথলনে বব ম্যাথিয়াস ১৯৪৮ ও ’৫২ সালে অলিম্পিকে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন। তিনি ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৫৫ সালে। ঢাকা স্টেডিয়ামে তরুণদের নিয়ে কিছু প্রশিক্ষণও দিয়েছিলেন। সেদিন অপরাহ্ণে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তাকে যখন এসব বলি, সে এগুলোর উত্তর দিতে পারে না। আমি বলি, ‘আমি তোমার চেয়ে বেশি জানি!’
আপনি তো কালের সাক্ষী।
মতিউর রহমান: ১৯৫৪ সালে প্রথম হলো কোয়াড্র্যাঙ্গুলার ফুটবল প্রতিযোগিতা (ভারত, পাকিস্তান, বার্মা ও শ্রীলঙ্কা)। ফাইনালের পর ঢাকা স্টেডিয়ামে ভারত-পাকিস্তানের প্রীতি ম্যাচ আমি দেখেছি। ১৯৫৫ সালের ভারত-পাকিস্তানের প্রথম টেস্ট ম্যাচের শেষ অধিবেশনের খেলা দেখার সুযোগও হয়েছে। তারপর নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও অস্ট্রেলিয়া টিমের ঢাকার মাঠে খেলা দেখেছি। বড় বড় ফুটবল খেলাও দেখতাম। এই যে খেলার জগতে ঘোরাফেরা—এসবই আমার স্মৃতি। ওই খেলার জগতের মধ্যে এখনো আমার অনেকটা সময় কেটে যায়।
পাশাপাশি আমাদের পারিবারিক পরিবেশটা ছিল একটু রাজনীতিক-একটু বামধারার প্রভাব। বাবার জ্ঞাতি ভাইদের সঙ্গে মিলে ও রকম পরিবেশের মধ্যে আমরা বড় হয়েছি। তার ফলে নানা ধরনের বই, ম্যাগাজিন, পত্রিকা আমাদের কাছে আসত। শুধু ঢাকার নয়, কলকাতার এবং আন্তর্জাতিক ছাত্র-যুব সংগঠনের ম্যাগাজিনও।
তাই ’৫০-এর দশক থেকে একদিকে খেলার জগৎ, আরেক দিকে পত্রপত্রিকা পাঠ ও সংগ্রহ—এর মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। এসবের মধ্য দিয়ে বড় হতে হতে হারিয়ে গেল আমার স্কুলজীবনের পড়াশোনার জগৎ।
কিন্তু আপনি পড়াশোনা করে গেছেন।
মতিউর রহমান: পড়াশোনা বা ক্লাসে নিয়মিত না হলেও আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করেছি। ইন্টারমিডিয়েটে সায়েন্স নিয়ে পাস করেছি ঢাকা কলেজ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে অনার্স করেছি, মাস্টার্স করেছি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে, এগুলো পাসই করেছি শুধু।
তার মানে আপনি নম্বর নিয়ে খেলেছেন?
মতিউর রহমান: নম্বর নিয়ে খেলেছি বা খেলিনি—এটা এখন আমি বলতে পারব না। কিন্তু ওই যে স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—তখন আরেকটা জায়গায় আমি পৌঁছে গেলাম। আমাদের পারিবারিক পরিবেশ, বামপন্থী পরিবেশের মধ্য দিয়ে আনাগোনা ছিল নানা রাজনীতিবিদের। তাঁরা গোপনে থাকতেন তখন। তাঁদেরই একজনের সঙ্গে আমার এক কাকার বাসায় পরিচয়, দেখা। তাঁর সূত্রে ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর, যে বছর আমি ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছি, গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি।
১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। সেদিন থেকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন হাজির থাকতাম। আমি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। ওই ’৬২-এর ছাত্র আন্দোলনের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি দিনের আন্দোলনের সঙ্গে আমার যুক্ততা ছিল। এই যুক্ততা চলেছে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পর্যায় পর্যন্ত। ক্লাস নেই, পড়াশোনা নেই—ছিল ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।
১৯৬৪ সাল থেকে আমি দৈনন্দিন আন্দোলন ও সংগঠনের পাশাপাশি ছাত্র ইউনিয়নের প্রায় সব সংকলনে জড়িত ছিলাম। একুশে ফেব্রুয়ারির খুব ভালো সংকলন আমরা করতাম। এগুলো প্রকাশের পেছনে আমার একটা ভূমিকা ছিল। প্রায় সব সংকলন আমার কাছে রয়েছে। সংকলনগুলো মিলিয়ে আমি একটা বইও করেছি ‘বিদ্রোহী বর্ণমালা’। ওই ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের স্মৃতি এবং ছাত্র ইউনিয়ন ও সংস্কৃতি সংসদ যে ভালো কাজ করেছে তখন, তার একটা বড় প্রমাণ।
দেখুন, খেলার মাঠ, বাম রাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়ি। ’৬৫ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত আমি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলাম। ’৬৫ থেকে ’৬৮ পর্যন্ত ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক। এগুলোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যাঁরা সেরা কবি, সেরা লেখক, সেরা প্রবন্ধকার, সেরা শিল্পী ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটা তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
১৯৫৮ সাল থেকে আমি ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হই এবং ১৯৬০ সালে ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলি। ’৬৪ সালে আমি ভিক্টোরিয়া ক্লাবের ক্যাপ্টেন।মতিউর রহমান, সম্পাদক, প্রথম আলো
শিল্পী কামরুল হাসান, কবি শামসুর রাহমান ও সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী নিতুন কুন্ডু, শিল্পী রফিকুন্নবী প্রমুখ। আমার স্কুলের তিনজন ড্রয়িং টিচার ছিলেন সে সময়ের সেরা শিল্পী। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীর ও কাজী আব্দুল বাসেত। আবার সে সময় সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গেও আমার বন্ধুত্ব ছিল।
১৯৫৮ সাল থেকে আমি ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হই এবং ১৯৬০ সালে ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলি। ’৬৪ সালে আমি ভিক্টোরিয়া ক্লাবের ক্যাপ্টেন। সব মিলিয়ে খেলার মাঠ, ফুটবল, ক্রিকেট, ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন, সংস্কৃতি সংসদ, সভা, মিছিল, সংকলন, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও লেখকদের সঙ্গে সম্পর্ক—সবই ছিল।
১৯৬৪ থেকে ’৭১ সাল পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি বা এ ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোয় ছাত্র ইউনিয়ন সবচেয়ে ভালো করত। এ ক্ষেত্রেও আমার একটা ভালো ভূমিকা থাকত সব সময়। আবার প্রধান সাহিত্যিক-শিল্পীদের পাশাপাশি সেরা অভিনেতা আবুল হায়াত, আতাউর রহমান, গোলাম রাব্বানী, কাজী তামান্না—তাঁরা সবাই আমাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আমাদের সব অনুষ্ঠানে দেশের গান হতো। এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন শেখ লুৎফর রহমান, আলতাফ মাহমুদ, জাহেদুর রহিম, অজিত রায় প্রমুখ।
১৯৬৫ সালে আমরা তাসের দেশ করলাম। প্রথম পরিচালনা করলেন বিখ্যাত অভিনেতা মাসুদ আলী খান। তারপর আরেকবার করলেন হাসান ইমাম। আবার রক্তকরবী করলাম বিপুল সফলতার সঙ্গে। রাজা হয়েছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা গোলাম মোস্তাফা। নন্দিনী হয়েছিলেন কাজী তামান্না। পরিচালনা করেছেন হাসান ইমাম। মঞ্চ তৈরি করেছিলেন ইমদাদ হোসেন। কার্ড ও অন্যান্য সাজসজ্জার কাজ করেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী।
আমি বলব যে ষাটের দশক বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য একটা শ্রেষ্ঠ সময়। সে সময়ের সৃষ্টি সবই সেরা—সেরা ব্যক্তি, সেরা মানুষ, সেরা কাজ। এটা শুরু পঞ্চাশের দশকে, কিন্তু এর একটা বড় জায়গা তৈরি হলো ষাটের দশকে। যেখান থেকে ’৬৯-’৭০-এর পরে আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে গেলাম।
তাহলে যে বামধারার রাজনীতি, ’৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, আপনার কালচারাল অ্যাকটিভিটি, স্পোর্টস, পত্রিকা পড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা, কবি-সাহিত্যিক চেনা—সবকিছু মিলে কি আপনি স্বশিক্ষিত মানুষ হয়ে উঠলেন?
মতিউর রহমান: আমি প্রথম সিনেমা দেখি ১৯৫৬ সালে, তিন ভাই মিলে পুরান ঢাকার লায়ন সিনেমা হলে—রোমান হলিডে-গ্রেগরি পেক, অড্রে হেপবার্ন এখনো আমার প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী। পরের সপ্তাহে দেখেছিলাম সুচিত্রা সেন-উত্তম কুমারের ‘সবার উপরে’ সিনেমা। ’৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকাল পর্যন্ত আমরা লাহোর, করাচি, মুম্বাই, কলকাতা, হলিউড, ইতালিয়ান, ফরাসি, রুশ, ব্রিটিশ সিনেমা দেখেছি। গুলিস্তান, নাজসহ (শুধু বিদেশি সিনেমা চলত) অন্যান্য সিনেমা হলে এসব দেখেছি। তারপর ভারতীয় ছাড়া অন্যান্য দেশের সিনেমা দেখতাম। এর পরপরই ঢাকার সিনেমাও এগিয়ে গেল। বলা যায়, একটা স্বর্ণযুগ ছিল।
এখনকার তুলনায় তখনকার সেই পল্টন ময়দান, আশপাশের এলাকা, গুলিস্তান এলাকা, বেবী আইসক্রিম, রেক্স রেস্টুরেন্ট, গুলিস্তান ও নাজ সিনেমা হল, লা সানি রেস্টুরেন্ট এবং ঢাকা স্টেডিয়াম—আমার তো মনে হয় সেরা সময়, সেরা জায়গা, সেরা স্মৃতি। তার ধারেকাছেও এখন আমরা নেই।
একটু যদি জানতে চাই। আপনি বললেন আপনি পরিসংখ্যানে পড়েছেন, কিন্তু সংখ্যা নিয়ে তো খেলেননি। কিন্তু আমি উল্টোভাবে ভাবি—আপনি এখন সবচেয়ে বেশি সংখ্যা নিয়ে খেলেন। কারণ, আপনি বাংলাদেশ তো বটেই, দেশের সবচেয়ে বড় বাংলা পত্রিকা সম্পাদনা করছেন দুই দশকের বেশি সময়। হয়তো ছাত্রজীবনে আপনি সংখ্যা নিয়ে খেলেননি, কিন্তু পেশাগত জীবনে আপনাকে সংখ্যা নিয়ে প্রতিনিয়ত খেলতে হচ্ছে। সেটা আমি এভাবে দেখতে চাই। প্রথম আলোতে আসার আগে আপনার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন ছিল। কিন্তু একজন সম্পাদক হিসেবে আপনি যখন প্রথম আলো শুরু করতে চাইলেন—কেন একটা নতুন ব্র্যান্ড শুরু করতে চাইলেন?
সাংবাদিকতার জীবনে সরাসরি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও সেই ১৯৭০ সালের জুলাই মাস থেকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে একতা প্রকাশ করি। ১৯৯১ সালের মধ্যকাল পর্যন্ত আমি একতার সম্পাদক থাকলাম।
মতিউর রহমান: আমার সাংবাদিকতার শুরুটা যদি বলি, একটু পেছনে যেতে হবে। আমি ’৬২-’৬৩ থেকেই দৈনিক সংবাদ অফিসে যাতায়াত করি। তখন সংবাদ সম্পাদক ছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সার এবং সহকারী সম্পাদক রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান—তাঁরা ছিলেন তখন সেরা সাংবাদিক ও লেখক।
তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় ’৬৩-’৬৪ সালে। আমি তখন মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যেকোনো সময় যেতে পারতাম, কথা বলতে পারতাম তাঁদের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ-সম্পর্ক হয়, যা শেষ পর্যন্ত ছিল। আর রণেশ দাশগুপ্ত আমার এই জীবনের সকল শিক্ষার প্রধান গুরু, আমার আইডল।
এই সংবাদ অফিসে যাতায়াতটা আমার জন্য একটা বড় শিক্ষায়তনের মতো। আমি কবি হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। অনেক কবিতা ও গদ্য সংবাদ-এ ছাপা হয়েছে। তবে আমি কবি হতে পারিনি—ব্যর্থ কবি। কিন্তু ওই যে যোগাযোগ, সংবাদ পত্রিকা পাঠ, সেই ছাপার কাজ, সংকলন, বই পড়ার কাজ, সংগঠন করার কাজ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—এসব এগিয়ে চলল।
এর মধ্যেই গোপন কমিউনিস্ট পার্টি একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা একতা প্রকাশের অনুমতি পেয়েছিল এক কমিউনিস্ট বন্ধু ওয়াহিদুল হায়দার চৌধুরীর নামে, ’৭০ সালে। আমি হলাম ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বজলুর রহমান হলেন সম্পাদক। আমার সাংবাদিকতার জীবনে সরাসরি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও সেই ১৯৭০ সালের জুলাই মাস থেকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে একতা প্রকাশ করি। ১৯৯১ সালের মধ্যকাল পর্যন্ত আমি একতার সম্পাদক থাকলাম। এর মধ্যে বেশ কয়েক বছর সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতে কিছু কাজ করেছি, অনেক লিখেছি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পত্রিকা বন্ধ ছিল। বাকশাল হওয়ার পরেও আবার বন্ধ হয়ে গেল। জিয়াউর রহমানের সময় নতুন করে অনুমতি পেলাম। এরশাদ একবার বন্ধ করে দিলেন। এভাবেই চলেছে। এর মধ্যে আমি রাজনীতির কাজ করেছি, সংগঠনের কাজ করেছি, অন্যান্য কাজ করেছি—তবে পত্রিকার কাজও নিয়মিতভাবে করেছি।
দেশের রাজনীতির উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ’৮৮ সালে ঠিক করি যে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। কারণ, তখন আমার চোখের সামনে আমাদের স্বপ্নের আদর্শভিত্তিক যে রাষ্ট্র—সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সর্বশেষ আমি মস্কো যাই ১৯৮৮ সালে। তখন বুঝতে পারছিলাম যে এই ব্যবস্থা থাকছে না।
নিজেকে আরেকটু প্রসারিত করা, বড় করে সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার লক্ষ্য থেকে ১৯৮৮ সালে আমি দৈনিক সংবাদ-এ নিয়মিত কলাম লিখি। সংবাদ-এ আমি সংবাদ লিখেছি, সাক্ষাৎকার নিয়েছি। আরও একাধিক দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজে নানাভাবে লেখালেখি করেছি। ঢাকা কুরিয়ার-এ রিপোর্ট করেছি, লিখেছি। সাপ্তাহিক খবরের কাগজ-এ কলাম লিখেছি। মূলধারা নামে একটা সাপ্তাহিক কাগজ ছিল—শামসুর রাহমান সম্পাদক, সেখানে আমি বড় বড় সাক্ষাৎকার নিতাম। বন্ধু বেনজীর আহমদ ছিলেন নির্বাহী প্রধান। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমি বেশ কিছুদিন নতুন দৈনিক আজকের কাগজ-এ বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ রিপোর্ট ও কলাম লিখেছি। আরও কিছু কাগজে লিখেছি। আমি কেবল কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকার সম্পাদক না—আমি একজন সাংবাদিক, এটা প্রমাণ করার জন্য অতিরিক্ত কাজগুলো করেছি।
ওই অবস্থায় ১৯৯১ সালে আমি কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে নির্বাচনের প্রার্থিতা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিই। আমি কিন্তু কখনো কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পদত্যাগ করিনি বা আমাকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পদত্যাগ করে চলে যেতে বলেনি কেউ। সে জন্য আমি বলি, ‘মাই ফার্স্ট পার্টি অ্যান্ড লাস্ট পার্টি ইজ সিপিবি’। ’৯১ সালে এই কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে দূরে সরে আসি। একতার দায়িত্ব থেকে সরে যাই।
তারপর আজকের কাগজ-এর কয়েকজন তরুণ বন্ধুর সহযোগিতায় ভোরের কাগজ করি। শুরুতে আমি প্রকাশক এবং সম্পাদক—১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। পরে প্রকাশক বদল হয়। তখন বিএনপির আমল। রাজনীতিতে নানা অস্থিরতা ছিল। এর মধ্যে কাগজ করে গেলাম।
একসময় বিএনপি সরকার আমাদের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিল। তারপর আমাদের যিনি প্রকাশক ছিলেন, তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ’৯৬ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে উপমন্ত্রী হয়ে গেলেন। তখন আমাদের স্বাধীন সাংবাদিকতার জায়গাটা সংকুচিত হয়ে গেল, বাধা পড়তে শুরু করল। রাত্রিবেলা কাগজ ঠিক করে দিয়ে আসি, সকালে দেখি কাগজটা একটু অন্য রকম হয়ে গেছে। কিছুদিন দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি ভোরের কাগজ ছেড়ে দেব। তখন ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক আমার বন্ধু মাহফুজ আনাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় থেকে যাঁর সঙ্গে পরিচয়—তিনি উদ্যোগ নিলেন যে আমরা একটা বাংলা কাগজ করব।
তখন তিনি আমাকে জনাব লতিফুর রহমানের কাছে নিয়ে গেলেন। আমরা তিনজন মিলে পরামর্শ করে প্রথম আলো সংগঠিত করলাম। লতিফুর রহমান সাহেব খুবই প্রাজ্ঞ ও সচেতন একজন নাগরিক এবং মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। আমরা যেমন ভেবেছিলাম যে একটা স্বাধীন-নিরপেক্ষ সংবাদপত্র করব—তিনি এর প্রবল সমর্থক ছিলেন। সময়টা এমন ছিল যে তখন সবকিছু ভাগ হয়ে যাচ্ছে, বিভক্ত হয়েছে—সংবাদপত্রসহ সব। তখন বেসরকারি টেলিভিশন ছিল না। তিনি বললেন, মানুষ একটা নিরপেক্ষ সংবাদপত্র চায়। এর চার বছরের মধ্যে আমরা দেশের এক নম্বর কাগজ হয়ে যাই।
এই দলনিরপেক্ষ, স্বাধীন সাংবাদিকতাই আমাদের বাঁচিয়ে দিল, টিকে থাকলাম। তারপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এল, তারাও সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিল। আবার বিএনপি সরকার এল, একই কাজ করল।
তাহলে প্রথম আলো কি সব সময় এ রকম স্বাধীন থাকবে?
মতিউর রহমান: আমার মনে হয় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে, সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে সব সময় স্বাধীন থাকাটাই ভালো, শ্রেয়। আপনি যদি সরকারের সমর্থক হয়ে যান, সরকারের পক্ষের লোক হয়ে যান, আপনার পত্রিকা লোকে নেবে না, গ্রহণ করবে না। আবার ইচ্ছাকৃতভাবে জোর করে সরকারের বিরোধিতা করব না। ভালো কাজের সমর্থন, ভালো কাজ না করলে সমালোচনা—এটাই হওয়া উচিত সংবাদপত্রের ভূমিকা। সেটা আমরা এখন পর্যন্ত করে যাচ্ছি। বাধা এসেছে, বিপদ হয়েছে। সব সময় সত্যিকার অর্থে এটা করতে পারিনি, কিন্তু এই চেষ্টা আমাদের অব্যাহত ছিল। চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
আমি যেহেতু নিজে ব্যবসার ছাত্র, তো ব্যবসায়িক প্রশ্ন না করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারছি না। আমাদের মধ্যে একটা ধারণা ছিল যে পত্রিকা মানে হচ্ছে একটা চ্যারিটি। কিন্তু আপনি প্রথম পত্রিকার সঙ্গে একটা সফল বিজনেস মডেলকে একীভূত করতে পারলেন। কেন এবং কীভাবে এই দর্শনটাকে আপনি একসঙ্গে করলেন?
মতিউর রহমান: আমরা যখন একতা করি, তখন আমার খুব একটা প্রবল চেষ্টা ছিল এটার আয়-ব্যয় সমান করা এবং শেষ পর্যায়ে বেশ কিছুটা করতে পেরেছিলাম। ভোরের কাগজও প্রায় আয়-ব্যয়ের কাছাকাছি চলে এসেছিল। যখন আমরা ছেড়ে দিই, তখনো কিন্তু আমি খুব সচেতনভাবে ব্যবসার দিক থেকে ভাবিনি, ভাবতে পারিনি।
প্রথম আলোতে এসে লতিফুর রহমান সাহেবের চিন্তাভাবনার জগতে, তাঁর প্রভাবে সেটি হলো। তিনি বলেছিলেন, ‘দেখেন, শুধু দুইটা শর্ত আমার। এক, পত্রিকা হবে দলনিরপেক্ষ ও স্বাধীন। দুই, আর্থিকভাবে সফল হতে হবে। আয় করে এটাকে চলতে হবে। না হলে আমি কিন্তু টাকা দেব না।’
এটা যে আমরা খুব বুঝে নিয়েছিলাম, তা নয়। আমরা মন পরিষ্কার রেখে সাহসের সঙ্গে পত্রিকা করা শুরু করি—নিরপেক্ষভাবে, শক্তভাবে। তখন বিএনপি সরকার আবার ক্ষমতায় আসে। আমাদের শক্ত অবস্থান, নিরপেক্ষ অবস্থান, দলনিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে পত্রিকা বড় হতে থাকে। এবং যেটা বললাম, চার বছরের মধ্যে আমাদের আয়-ব্যয় সমান হয়ে যায়।
প্রথম দিকে তিন বছর বিজ্ঞাপনের অবস্থা ভালো ছিল না। যত সংখ্যা বাড়তে থাকল, বিজ্ঞাপন আসতে শুরু করল—সরকারি বিজ্ঞাপন, ব্যক্তি খাতের বিজ্ঞাপন, নানা বিজ্ঞাপন।
তার মানে সংখ্যা নিয়ে খেলা শুরু হলো।
মতিউর রহমান: হ্যাঁ, সংখ্যার খেলা শুরু। তখন আবার আমাদের পত্রিকায় প্রতিদিন ছাপা সংখ্যা ছেপে দিতাম—মানুষকে বোঝানোর জন্য যে আমরা যা বলেছি, সেটা সত্য, সঠিক। আর লতিফুর রহমান সাহেব বলেছিলেন, আপনার সংখ্যা যত বাড়বে, আপনার বিজ্ঞাপন আসবে, ভয় পাবেন না।
এটা দেখলাম একদম সত্য। প্রথম দিকে তিন বছর বিজ্ঞাপনের অবস্থা ভালো ছিল না। যত সংখ্যা বাড়তে থাকল, বিজ্ঞাপন আসতে শুরু করল—সরকারি বিজ্ঞাপন, ব্যক্তি খাতের বিজ্ঞাপন, নানা বিজ্ঞাপন। একসময় আমরা পত্রিকার প্রতি সংখ্যা শুরু করেছিলাম ১৬ পৃষ্ঠা দিয়ে, পরে ২০ পৃষ্ঠা, ২৪ পৃষ্ঠা, ২৮, ৩২, ৩৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত করেছি। দাম ৬ টাকা থেকে ৮ টাকা, পরে ১০ টাকা। কোভিডের পর একটা খুব কঠিন অবস্থার মধ্যে কাগজের দাম আমরা করি ১২ টাকা।
২০১৪ সালে গিয়ে ৫ লাখ ৪৫ হাজার পর্যন্ত কাগজ আমরা ছেপেছিলাম। এরপর এল আওয়ামী লীগ সরকারের চাপ ও আক্রমণ। তারা শুধু সরকারি বিজ্ঞাপনই বন্ধ করল না, প্রায় ৫০টি বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল, ন্যাশনাল কোম্পানিকে বিজ্ঞাপন দিতে মানা করল। ফলে একটা কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলাম।
তবে এটাও বলতে পারেন যে আমাদের শক্তি, সামর্থ্য, অবস্থানের জন্য ধীরে ধীরে নানা কারণে, নানাভাবে এই বৃহৎ কোম্পানিগুলো আমাদের বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করল। কারণ, তাদের ব্যবসা প্রসার, প্রচার ইত্যাদির জন্য লাগবে। তারা কেউ কেউ গিয়ে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে অনুমতি নিয়ে এল। কেউ এল না, কেউ সহ্য করে ধীরে ধীরে অন্যভাবে, নানাভাবে আসা শুরু করল।
বিগত সরকারের পতন হলো ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। এর আগে পর্যন্ত গ্রামীণফোন আমাদের ১২ বছর বিজ্ঞাপন দিতে পারেনি। একই অবস্থা হয়েছে ইউনিলিভারের সঙ্গে, আরও কোম্পানির সঙ্গে। কেউ কেউ নানা বুদ্ধি করে অনুমতি নিয়ে আসে, কিন্তু গ্রামীণফোন অনুমতি পায়নি। নরওয়ে থেকে মন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসে এখানকার সরকারের সঙ্গে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রদূত কথা বলেছেন নানাভাবে নানাজনের কাছে। কিন্তু তারা বিজ্ঞাপন দেওয়ার অনুমতি পায়নি।
এভাবে যদি বলেন—এই যে নানা উত্থান-পতন, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ঘটনার মধ্য দিয়ে কিন্তু প্রথম আলোকে যেতে হয়েছে—চাপের মধ্যে, ভয়ের মধ্যে, আক্রমণের মুখে, নানা রকম মামলা-মোকদ্দমা এবং সন্দেহের চাপে থেকে।
বিগত সরকারের পতন হলো ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। এর আগে পর্যন্ত গ্রামীণফোন আমাদের ১২ বছর বিজ্ঞাপন দিতে পারেনি। একই অবস্থা হয়েছে ইউনিলিভারের সঙ্গে, আরও কোম্পানির সঙ্গে। কেউ কেউ নানা বুদ্ধি করে অনুমতি নিয়ে আসে, কিন্তু গ্রামীণফোন অনুমতি পায়নি।মতিউর রহমান, সম্পাদক, প্রথম আলো
আপনাকে ব্যবসা নিয়ে চিন্তা করতে হয়েছে, আবার ভালো লেখা এবং সম্পাদকের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ, খুব ধারালো পজিশনে আপনাকে কাজ করতে হয়েছে। এই মিশ্রণটা কীভাবে সম্ভব হলো?
মতিউর রহমান: বলি যে অনেকটা না বুঝেই। আমাদের ভেতরে ওই যে একটা রাজনৈতিক সচেতনতা—সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষ—ভালোর সঙ্গে যুক্ত থাকা, ‘যা কিছু ভালো তার সাথে প্রথম আলো’ এবং মানুষের জীবনের উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করা...
১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসে, প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই কিন্তু আমরা দরিদ্র ছেলেমেয়েদের একটু একটু করে সাহায্য করা শুরু করলাম—স্কলারশিপ দেওয়া শুরু করলাম। ২০০০ সাল থেকে নারীদের ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপ এবং অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের প্রচারণা শুরু করলাম। ব্যাপক একটা কাজ করলাম। সরকারি আইন পর্যন্ত বদল করতে সক্ষম হলাম। এবং দেখেন, কয়েক বছরের মধ্যে এটা কমে গেল। অনেকেরই ভূমিকা ছিল, আমাদের কিছু ভূমিকা ছিল।
গণিত অলিম্পিয়াড, মাদককে না বলা আন্দোলন শুরু করলাম, বিতর্ক অনুষ্ঠান শুরু করলাম। এখন আমরা দেখি, সারা দুনিয়াতে কিছু সংবাদপত্র এই কাজগুলোই করে।
একটা গ্রামের নাম ‘প্রথম আলো চর’ হয়ে গেল।
মতিউর রহমান: হ্যাঁ। আমাদের কথাটা হলো, আমরা শুধু লিখব, করব না—এটা কেমন করে হয়? অন্যকে করতে বলব, পরামর্শ দেব, নিজেরা মানুষের জন্য কাজ করব না, তা তো হয় না। এমন একটা চিন্তা আমাদের মধ্যে কাজ করত। মানুষের জন্য, সমাজের জন্য কিছু করা—ওই যে বললাম বামপন্থার প্রভাব, মনের মধ্যে ওটা কাজ করেছে।
আমরা সব সময় বন্যা বা অন্য দুর্যোগের সময় ত্রাণ তহবিল গঠন করে সাহায্য করেছি, মানুষের পাশে থেকেছি। আমাদের সবচেয়ে ভালো কাজ হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে। দক্ষিণ অঞ্চলে সিডর হলো। তখন মানুষ আমাদের সাহায্য করেছে অর্থ দিয়ে। সবার নাম ছেপে দিতাম। ছয় মাস ধরে আমরা কাজ করলাম। প্রায় ৩ কোটি ৮ লাখ ৪২ হাজার ৫১২ টাকা পেলাম। তারপরের বন্যা-দুর্যোগের সময়ও কোটি টাকার বেশি ফান্ড নিয়ে আমরা কাজ করলাম। এভাবে কুড়িগ্রামে বন্যার সময় আমরা একটা ছোট চর, দুর্গম চরে কাজ করি এবং পরে ওখানে নানা সাহায্য, নানা উপকার করি, নানাভাবে কাজ করতে থাকি।
আমাদের কথাটা হলো, আমরা শুধু লিখব, করব না—এটা কেমন করে হয়? অন্যকে করতে বলব, পরামর্শ দেব, নিজেরা মানুষের জন্য কাজ করব না, তা তো হয় না। এমন একটা চিন্তা আমাদের মধ্যে কাজ করত। মানুষের জন্য, সমাজের জন্য কিছু করা—ওই যে বললাম বামপন্থার প্রভাব, মনের মধ্যে ওটা কাজ করেছে।
প্রথম আলো ট্রাস্ট থেকে হয়েছে এসব?
মতিউর রহমান: তখন ট্রাস্ট ছিল না, প্রথম আলো থেকে করতাম। ট্রাস্ট করলাম ২০০৯ সালে। কুড়িগ্রামের ছোট ওই চরটিতে কাজ করতে করতে ওই গ্রামের নাম হয়ে গেল ‘প্রথম আলো চর’—ওখানকার মানুষই দিল এই নাম। এখন ওটা সরকারের সকল কাজে, সর্বত্র লিখিত আছে। ঠিক সেভাবে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার একটি সড়ক তৈরিতে আমাদের সাহায্য ছিল। সেটাও ‘প্রথম আলো সড়ক’ লেখা। এ ধরনের কাজগুলো কিন্তু আমরা মন থেকে করলাম।
আমার মনে আছে, মাদকদ্রব্য বন্ধ বা মাদকাসক্তি নিরসনে সাহায্যের জন্য আমরা মাসে একটা করে মতবিনিময় সভা করতাম। সেখানে মাদকসেবীরাও আসতেন, সঙ্গে আসতেন তাঁদের মা-বাবা, ভাইবোন। এক নারী তাঁর মাদকাসক্ত ছেলেকে নিয়ে আসতেন। অবস্থাটা এমন হয়ে গিয়েছিল যে সে জন্য তাঁর স্বামী এই বাড়ি ছেড়ে আলাদা হয়ে চলে যান। আমাদের এখানে আসতে আসতে শেষ পর্যন্ত ছেলেটা সুস্থ হয়ে গেল, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেল। এটা ভাবলে এখনো আমার মনের মধ্যে শিহরণ জাগে—আমাদের একটা অনুষ্ঠানে এসে সেই মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন প্রথম আলোকে বেহেশতে নিয়ে যায়!’
আর কী চাই! এর চেয়ে বেশি পাওয়ার কী আছে?
আপনি যেটা শুরুতে বলছিলেন—আমরা বলতাম যে প্রথম আলোকে আমরা প্রকাশ্যে সর্বত্র একটি ভালো কাগজ, একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ কাগজ করতে চাই। অবশ্যই এটিকে ব্যবসায়িকভাবে সফল কাগজ করতে চাই। এটা আমাদের প্রকাশ্য বক্তব্য ছিল।
নিজে আয় করে চলার ফলে আমাদের কখনো কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোনো কোম্পানির কাছে গিয়ে হাত পাততে হয়নি। মালিকের কাছে গিয়ে বলতে হয়নি, ‘আমাকে কিছু টাকা দিন।’ এটাই আমাদের একটি শক্তি।
আরেকটা বিষয়—প্রথম দিন থেকে আমরা ট্যাক্স দেওয়া, ভ্যাট দেওয়া—এসব বুঝতাম না, জানতাম না। লতিফুর রহমান সাহেব বলেছিলেন, ‘আপনারা মানুষকে ট্যাক্স দেওয়ার কথা বলবেন, নিজেরা দেবেন না—এটা তো হতে পারে না।’ প্রথম দিন থেকে আমরা ট্যাক্স, ভ্যাট ইত্যাদি সবকিছু ঠিক রেখেছি। পরে তো আপনি দেখেছেন—পত্রিকায় যে ট্যাক্স, ভ্যাট ইত্যাদির বিষয়ে আমরা সরকারের মাধ্যমে আটবার স্বীকৃত, সম্মানিত হয়েছি—প্রথম আলো এবং প্রথম আলো সম্পাদক।
আপনাকে এটা বলতে আমার দ্বিধা নেই—দুই সরকারপ্রধানই আমাকে দুবার এই বিষয়ে বিপদে ফেলতে চেয়েছিলেন। যেহেতু আমাদের ট্যাক্স ফাইল, ভ্যাট ফাইল পরিষ্কার, পারেননি। ওটাতে যদি কোনো ঝামেলা বা গোলমাল থাকত, এই পত্রিকা নিয়ে আমাদের অবস্থান আমরা টিকিয়ে রাখতে পারতাম না। অর্থাৎ আপনি পত্রিকা করুন, ব্যবসা করুন—যা কিছু করুন, সৎ থাকবেন, ভ্যাট-ট্যাক্স দেবেন—তাহলে আপনি বুক ফুলিয়ে চলতে পারবেন, না হলে পারবেন না।
আমি একটু অন্যদিকে যাচ্ছি। এই যে কোভিড গেল, তারপর ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন শুরু হলো। আমি মনে করি, প্রতিটি চ্যালেঞ্জ থেকেই আমাদের নতুন একটা সম্ভাবনা খুলে যায়। প্রথম আলো তারপর ডিজিটালে যাওয়ার কাজ শুরু করল এবং সেটা এখনো খুব জোরেশোরে হচ্ছে। এই যে ট্রান্সফরমেশন—পত্রিকা পড়ার অভ্যাস, এনালগ থেকে ডিজিটালে চলে গেল—সেটার জন্য আমরা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে কতটা রেডি?
মতিউর রহমান: গত ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখি—এই যে বিভিন্ন ইভেন্ট করলাম বা আমরা যে গোলটেবিল করতে শুরু করলাম—এটা আমাদের নিজেদের সামাজিক দায়িত্ব থেকে করতাম। এই দুটো কাজই কিন্তু এখনো আমরা করি। নিজেরাও করি, আবার অন্যদের সহায়তাও করি।
পরে আমরা দেখলাম, আন্তর্জাতিক সেমিনারে বা বিদেশে গিয়ে—প্রত্যেকটা বড় কাগজ এগুলো করে এবং এগুলো থেকে তারা আয়ও করে। আমরা এগুলো আগে করতাম নিজের কাজের জন্য, সমাজের জন্য। এখন কিছু কাজ থেকে আমরা কিছু আয়েরও চেষ্টা করি।
আমরা কিন্তু এসব আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই দুটো ম্যাগাজিন শুরু করলাম—কিশোর-তরুণদের জন্য কিশোর আলো এবং বিজ্ঞানচিন্তা। এখান থেকেও আমরা কিছু আয় করি।
২০০৯ সালে শুরু করলাম বই প্রকাশনা। ওই যে আপনারা বলেন—ব্যবসায় একটা জায়গায় না থেকে বিভিন্ন পথে যাওয়া, আমরা বেঁচে গেলাম এই ডাইভার্সিফিকেশনের জন্য। শুধু পত্রিকার আয়ে আমরা এতটা করতে পারতাম না।
আমরা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলাম ২০২২ সাল থেকে—ডিজিটাল ফার্স্ট। এর দুই বছর পরে এল মোবাইল ফার্স্ট। তারপরে দুই বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে ভিডিও ফার্স্ট। এখন এআই ফার্স্ট। এখন বলা হচ্ছে যে নিউজপেপার কোম্পানিগুলোকে এআই কোম্পানিতে পরিণত হতে হবে—আরেক চ্যালেঞ্জ।
তার মানে আপনি একটা ঝুড়িতে সব ডিম রাখেননি।
মতিউর রহমান: না, সেটা করিনি। এটা কিন্তু আমাদের একটা শক্তি দিয়েছে, সাহস দিয়েছে, একটা আয়ের উৎস তৈরি হয়েছে।
কোভিডের পরের কথা যদি বলি, পত্রিকা ডিজিটাল হতে হবে, এটা আমরা ২০১২ সাল থেকে শুনি। সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম ২০১৪ সাল থেকে। ছাপা পত্রিকা পাঠ কমতে শুরু করল। পরে কোভিডের সময় একটা বড় ধাক্কা এল সারা দুনিয়ায়। আমাদের দেশেও পত্রিকা পাঠক কিছু কমে যায়। তখন আমাদের ব্যয় সংকোচন, বিপরীত দিকে আয়ের বিভিন্ন পথ করার জন্য চেষ্টা করতে হয়েছে। তবে আমরা কখনো বেতন না দেওয়া বা আটকে রাখার দিকে যাইনি। সেটি রেখে আমরা চেষ্টা করেছি। আমি দাবি করতে পারি, প্রথম ৩-৪ বছর বাদ দিয়ে পরবর্তী ২২ বছরে আমরা নিজেদের আয়ে চলেছি। প্রতিষ্ঠানের কাঠামো বেড়েছে।
এরপর এখন যেটা বললেন—অনলাইন, ডিজিটাল। চ্যালেঞ্জটা হলো এমন—আগে শুনে শুনে আমরা ’১২ সাল থেকে শুরু করলেও ’২২ সাল থেকে অনলাইনটা ভালোভাবে শুরু করলাম। যদিও একদম শুরু থেকে অনলাইনে কিছু কিছু সংবাদ দিতাম।
তারপর আমরা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলাম ২০২২ সাল থেকে—ডিজিটাল ফার্স্ট। এর দুই বছর পরে এল মোবাইল ফার্স্ট। তারপরে দুই বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে ভিডিও ফার্স্ট। এখন এআই ফার্স্ট। এখন বলা হচ্ছে যে নিউজপেপার কোম্পানিগুলোকে এআই কোম্পানিতে পরিণত হতে হবে—আরেক চ্যালেঞ্জ।
তারপরে আমি বলব—আমরা প্রথম আলোতে এই সবগুলো পার হয়ে বা একসঙ্গে করতে করতে, এআইয়ের ওপর ভীষণ জোর দিয়েছি। আমরা এটা দেখতে পাচ্ছি—এআই প্রয়োগ করে শুধু বার্তাকক্ষ নয়, প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আমাদের সাংবাদিকদের কাজের, সম্পাদকদের কাজের বহুমুখী সুবিধা পাব।
সর্বশেষ খবর হলো একটি কোম্পানির সঙ্গে মিলে আমরা ডিজিটালাইজেশনের ব্যাপারে কাজ করছি। যেসব এআই টুলস ব্যবহার করার কথা—আমাদের প্রতিটা কম্পিউটারে, প্রতিটা ক্ষেত্রে সেগুলো যুক্ত করে দ্রুত আমাদের সাংবাদিকেরা কাজ শুরু করতে পারবেন।
আপনি যে টিকে থাকার কথা বললেন, আপনার টিকে থাকা—ব্যক্তি হিসেবে, সম্পাদক হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া—এই টিকে থাকার বিষয়ে তো গান, কবিতা, সিনেমা ও সংস্কৃতির একটা ব্যাপক ভূমিকা আছে। আমি যদি খুব সংক্ষেপে, খুব ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি, যদি এক কথায় বলা যায়—আপনার প্রিয় গায়ক?
জর্জ হ্যারিসন আমার আরেকজন প্রিয় গায়ক। তাঁর গান, তাঁর ছবি, তাঁর ক্যাসেট, ভিডিও, তাঁর বই আমার সংগ্রহে আছে। তাঁর কথা মনে হলে ১৯৭১-এর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর কথা মনে পড়ে।মতিউর রহমান, সম্পাদক, প্রথম আলো
মতিউর রহমান: আমার প্রিয় গায়ক?
তিনটা নাম তো বলতে পারেন আপনি।
মতিউর রহমান: অনেক কঠিন। রবীন্দ্রসংগীত সবচেয়ে বেশি শুনি দেবব্রত বিশ্বাসের। আধুনিক গান—কখনো কিশোর কুমার, কখনো হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কখনো বলব যে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় আর শ্যামল মিত্র। আর বাংলাদেশে সৈয়দ আব্দুল হাদী, রফিকুল আলম, অবশ্যই সাবিনা ইয়াসমীন। রুনা লায়লার অনেক গান আমার পছন্দ। জেমসের অনেক গান খুব পছন্দের। আমাদের অনুষ্ঠানে তাঁরা সবাই আসেন, যোগাযোগ আছে, বন্ধুত্ব আছে।
বাংলাদেশের রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীর মধ্যে আমার খুব প্রিয় ছিলেন জাহিদুর রহিম (অনেক আগে মারা গেছেন), রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, অদিতি মহসিন—এঁরা। আরও দূরে গিয়ে আমি যদি বলি, আমার অত্যন্ত প্রিয় গায়ক হ্যারি বেলাফন্টে—কৃষ্ণাঙ্গ, দারুণ গায়ক। ক্যালিপসো সংগীতের জন্য বিখ্যাত। একটা সিনেমা দেখেছিলাম পুরান ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে ১৯৫৮ সালে—আইল্যান্ড ইন দি সান—তাঁর ওই গানটা এখনো আমি শুনি। এক বছর আগে মারা গেছেন হ্যারি বেলাফন্টে।
জর্জ হ্যারিসন আমার আরেকজন প্রিয় গায়ক। তাঁর গান, তাঁর ছবি, তাঁর ক্যাসেট, ভিডিও, তাঁর বই আমার সংগ্রহে আছে। তাঁর কথা মনে হলে ১৯৭১-এর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর কথা মনে পড়ে। জন লেননের ‘ইমাজিন’ গানটা শুনলে মনে হয়, কেন, এটাকে বিশ্বসংগীত করা যায় না? জাতিসংঘের একটা অনুষ্ঠানে শাকিরাকে একবার এই গানটা গাইতে দেখেছিলাম।
ব্যক্তিগত একটা প্রশ্ন আপনার কাছে—যখন আমি মাঝেমধ্যে আপনার রুমে যাই, ‘মতি ভাই’ বলতে প্রচুর লোক অজ্ঞান। এই ব্যাপারটা—‘মতি ভাই আমাদের’ বা ‘আমাদের মতি ভাই’—এটা খুব সর্বজন স্বীকৃত। আপনার জীবনে কার প্রভাব রয়েছে বলে আপনি মনে করেন? এমন কোনো ব্যক্তিত্ব কি আছে আপনার জীবনে?
মতিউর রহমান: তিনজনের কথা আমি সব সময় বলি। প্রথমজন হলেন রণেশ দাশগুপ্ত—সাংবাদিক, লেখক, বামপন্থী সংগঠক ছিলেন। ১৯৯৯ সালে কলকাতায় মারা যান। আমার প্রথম জীবনের সেই প্রথম দিনগুলিতে এবং আশি ও নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত তিনি কলকাতায় ছিলেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতিচর্চায় আমি তাঁর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছি। আমি তাঁর বই প্রকাশে ’৬০-এর দশকে, ’৭০-এর দশকে সাহায্য করেছি। আমি নিজে তাঁর একটি বই সম্পাদনা করে বের করেছি। তিনি আমার কাছে একজন আদর্শ মানুষ। তাঁকে নিয়ে আমি লিখেছি।
দ্বিতীয়জন চে গুয়েভারা। তাঁকে আমি খুব স্মরণ করি। সেটা কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সময় ’৬৭ সাল থেকে নয়, অনেক আগে থেকে। পরবর্তী সময়েও। রণেশ দাশগুপ্তের প্রায় সকল বই যেমন আমার সংগ্রহে আছে, তেমনি চে গুয়েভারাকে নিয়েও আমার বইয়ের সংখ্যা চল্লিশের বেশি। অনেকগুলো পড়েছি, অনেকগুলো পড়িনি। তাঁকে নিয়ে আমার নিজের লেখা আছে। তাঁর কবিতা অনুবাদ করেছি ‘ফিদেলের জন্য’। তাঁর কবিতা আমি পাঠ করেছি কোনো কোনো অনুষ্ঠানে। আমার একটা বড় লেখা আছে: ‘চে: বন্দুকের পাশে কবিতা’।
যখন তিনি মারা যান—তাঁর যে একটা ব্যাগ থাকত সব সময়, সেখানে ওই ব্যাগের মধ্যে হাতে লেখা একটা সবুজ নোটবুক ছিল। সেখানে ভুল না হলে তিনজন স্প্যানিশ কবি—পাবলো নেরুদা (১৯০৪-১৯৭৩), নিকোলাস গিয়েন (১৯০২-১৯৮৯) ও সেজার ভায়েহোর (১৮৯২-১৯৩৮) কবিতা ছিল হাতে লেখা। সেটা তিনি ওই সময় পড়তেন।
তৃতীয়জন পাবলো পিকাসো। আমি জীবনের প্রথম একটা ছবি সংগ্রহ করি ৩৫ টাকা দিয়ে—সেটা পিকাসোর ‘দ্য গার্ল বিফোর এ মিরর’-এর একটি প্রিন্ট। এই ছবিটা এখনো আছে মোমা-তে, নিউইয়র্কে। যতবার নিউইয়র্কে যাই—ওটা দেখতে একবার যাই। পিকাসো নিয়ে আমার সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা ৮৫। পিকাসোকে নিয়ে অনেক স্মারকও আমার সংগ্রহে আছে।
আমরা একেবারে শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। আমাদের কাছে একটি ছোট নোটবুক আছে। সেখানে আপনার একটু কমেন্টস চাই। আমাদের আগের অতিথিরা সবাই কিছু লিখে গেছেন। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি—যদি আপনি আমাদের এই শোটা নিয়ে কিছু বলতে চান বা কিছু লিখতে চান...
মতিউর রহমান: সক্রেটিসের কথাটিই সবাইকে বলি—নিজেকে জানো।