
শিশু হাসপাতালে হাম নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ২২ শিশু ভর্তি হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে একই সময়ে ভর্তি হয়েছে ৪২ শিশু।
সায়মা আক্তারের ছয় মাস বয়সী যমজ মেয়ে খাদিজা ও ফাতেমা হামে আক্রান্ত। নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা সায়মা গত শুক্রবার ঢাকার তিন হাসপাতাল ঘুরে দুই শিশুকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে (শিশু হাসপাতাল) ভর্তি করেন। অবস্থার কিছুটা উন্নতি দেখে গত শনিবার ছাড়পত্র দেওয়া হয় ফাতেমাকে। বাড়িতে নেওয়া হলে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে ফাতেমা। এখন হাসপাতালের শয্যা স্বল্পতার জন্য ফাতেমাকে আর শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা যাচ্ছে না।
গতকাল মঙ্গলবার এই হাসপাতালে ফাতেমার নানি সোনিয়া আক্তারের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ওরা তো যমজ, একজন চিকিৎসা পাবে, আরেকজন এভাবে মরে যাবে, তা কি হয়!’
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত শিশু হাসপাতাল সূত্র জানায়, খাদিজার মতো হামে আক্রান্ত ৫২ শিশু এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি করা হয়েছে ২২টি শিশুকে। হাসপাতালে শয্যা না থাকায় রোগী এলেও ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। মহাখালীতে অবস্থিত রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেরও একই পরিস্থিতি। শয্যার অভাবে এই হাসপাতালেও রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না।
শিশু হাসপাতাল
হামে আক্রান্ত যমজ খাদিজা ও ফাতেমার নানি সোনিয়া প্রথম আলোকে জানান, শিশুদের মা সায়মা নারায়ণগঞ্জ থেকে গত শুক্রবার দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন। সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মাতুয়াইল শিশু মাতৃসনদ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে তিনি শিশুদের জন্য অক্সিজেনের সুবিধাসম্পন্ন শয্যা পাননি। এরপর শিশু হাসপাতালে গিয়ে তাদের ভর্তি করেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খাদিজা গতকাল কিছুটা নিস্তেজ ছিল জানিয়ে সোনিয়া বলেন, সে আগের মতো আর খেলছে না, হাত-পা ছুড়ছে না; আর ফাতেমা বাসায় অসুস্থ। তাকে এখানে ভর্তি করতে না পেরে মা সায়মা কখনো নারায়ণগঞ্জে, কখনো এই হাসপাতালে এসে খাদিজার পাশে থাকছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা ইউনিট খোলা হয়েছে। ভর্তি শিশুদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। এই ইউনিটে চিকিৎসাধীন ৯ মাস বয়সী শিশু আয়মান হোসেনের অক্সিজেনের ঘাটতি বেশি। তাই বিশেষ ব্যবস্থায় তাঁকে অতিরিক্ত অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। তবে শিশুটিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ( আইসিইউ) ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া প্রয়োজন বলে প্রথম আলোকে জানালেন কর্তব্যরত চিকিৎসা কর্মকর্তা আপেল মাহমুদ।
আপেল মাহমুদ জানান, আইসিইউতে শয্যা স্বল্পতা ও সেখানে থাকা অন্য রোগীদের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় হামে আক্রান্ত শিশুদের আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া হাম নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী আসছে। শয্যা না থাকায় তাদের ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিশু হাসপাতাল সূত্র জানায়, এই হাসপাতালে চলতি বছর মোট ১২৪ শিশু হাম নিয়ে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে ৯ শিশু মারা যায়। আক্রান্ত শিশুদের বয়স পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৬ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৫টি, ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশু ৪৪টি, ৯ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশু ২৯টি, ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু ১১টি এবং ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশু ৫টি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউতে তিন দিন ধরে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত ছয় মাস বয়সী মরিয়ম। বাইরে তার মা মোছা. ইয়াসমিন ও নানি তাসলিমা বেগম। মা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমে নিউমোনিয়া দেখা দিয়েছিল। সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার পর আবার হালকা জ্বর দেখা দিয়েছিল। পরে জ্বর বাড়লে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎকেরা অক্সিজেন দেওয়ার পরামর্শ দেন। চার হাসপাতাল ঘুরে এখানে এসে অক্সিজেন পেয়েছি।’
নানি তাসলিমা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘হাসপাতালে ঈদ করছি। সব আনন্দ চইলা গেছে। আল্লাহ বাচ্চাটারে খালি বাঁচায় দেক।’
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (শিশুস্বাস্থ্য) এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, হাসপাতালটিতে হামের চিকিৎসার জন্য ১০টি শয্যা আছে। তবে গতকাল হামে আক্রান্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭২। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম নিয়ে নতুন ৪২ রোগী ভর্তি হয়েছে।
শিশুদের আইসিইউ নেই
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউর শয্যা পাঁচটি। বর্তমানে দুটি বাড়িয়ে সাতটি শয্যায় চিকিৎসা চলছে। এ সাতটি শয্যার ছয়টিতে হামের রোগী এবং একটিতে ধনুষ্টঙ্কারের রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। এ ছাড়া এইচডিইউ (হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট) ওয়ার্ডের পাঁচটি শয্যার প্রতিটিতেই হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি রয়েছে।
তবে এই হাসপাতালের আইসিইউগুলো বড়দের চিকিৎসার জন্য। চিকিৎসকেরা জানান, আইসিইউগুলোতে ছয় বছরের নিচের শিশুদের ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) শ্রীবাস পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের আইসিইউতে তো শিশুদের ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। এগুলো বয়স্কদের জন্য আছে। আমরা এখানে সর্বোচ্চ মাত্রায় অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা করি।’
অন্য রোগীদের ঝুঁকি
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়; কিন্তু হামের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রোগীদের আলাদা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে অন্য রোগীদের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। হাসপাতালের প্রায় সব ওয়ার্ডে এই রোগীদের রাখা হয়েছে।
এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের একই সঙ্গে সব রোগী জগাখিচুড়ি করে রাখতে হচ্ছে। পক্সের রোগীর সঙ্গে হামের রোগী রাখা হচ্ছে। দেখা যায়, হামের রোগী ভালো হয়ে বাড়ি যায়, আবার দুই দিন পর পক্স নিয়ে আসে। আবার পক্সের রোগী হয়তো বাড়ি যায়, আবার হাম নিয়ে আসে।’
সাত মাসের ছেলে আয়ানকে নিয়ে এই হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে ছিলেন মো. আল আমিন। কুমিল্লা থেকে এসেছেন তিনি। আল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমে (হাম) বুঝতে পারিনি। ডাক্তার দেখাইছি। স্যালাইন আর ইনজেকশন দিয়েছিল। তা–ও কোনো পরিবর্তন পাইনি। পরশু ওই লাল দাগ হলে ডাক্তার হাম বলে ঢাকায় পাঠায়।’
হাসপাতাল সূত্র জানায়, এ বছর প্রথম তিন মাসে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিয়েছে হামে আক্রান্ত ৬৪৪ রোগী। এই রোগীদের বেশির ভাগই মার্চ মাসে হাসপাতালে এসেছে। এখানে গত ২৪ ঘণ্টায় এক শিশুসহ এ বছর ২৩ শিশু মারা গেছে। এসব রোগীর সবারই মৃত্যু হয়েছে মার্চ মাসে। মৃত শিশুদের হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, হৃদ্রোগ ও কিডনির রোগের মতো জটিলতা ছিল।
১০ মাসের কম বয়সী রোগী বেশি
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, আক্রান্ত বেশির ভাগ শিশুর প্রথম হামের টিকা নেওয়ার সময় আসেনি। রোগীদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের বয়স ১০ মাসের কম। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকা নিয়েছে এমন শিশুও রয়েছে। অন্য বছরগুলোতে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা হাম নিয়ে না এলেও এ বছর এমন বয়সী শিশুরাও এই রোগ নিয়ে আসছে।
হাসপাতালটিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় হাম পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এটি কেবল ভর্তি রোগীদের জন্য। বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই।
এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রথমত যাকে টিকা দেওয়া হয়নি, ৯ মাস পার হলে অবশ্যই তাকে টিকা দিতে হবে। পাঁচ বছরের নিচের যেকোনো বয়সে শিশুর হাম হতে পারে। সর্দি-কাশির কয়েক দিনের মাথায় যদি ফুসকুড়ি দেখা দেয়, তাহলে তাকে অন্য বাচ্চাদের থেকে আলাদা করতে হবে এবং কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। অন্য বাচ্চাদের থেকে আলাদা রাখতে হবে। কেননা, এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে।’