বর্তমান সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত ২০টি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নিচ্ছে না। এর ফলে এগুলো আপনা–আপনি অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। এমন অধ্যাদেশের তালিকায় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশের পাশাপাশি বিচার বিভাগসংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আছে। এগুলো হলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কারের কথা বলে আসছি, এগুলো তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ একটা শাসনকাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এসব অধ্যাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আমার বিবেচনায় এই অধ্যাদেশগুলোর তাৎপর্য সাংবিধানিক সংস্কারের অনুরূপ।
এই অধ্যাদেশগুলোতে তাৎপর্যপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়েছিল। যেমন মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ও দুদক অধ্যাদেশে প্রতিষ্ঠান দুটিকে আরও স্বাধীন করা হয়েছিল, কার্যকর প্রতিষ্ঠান করার জন্য তাদের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছিল। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এখন মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ অকার্যকর হলে বর্তমান কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে। ফলে দুদকের পর মানবাধিকার কমিশনও পদত্যাগ করতে বাধ্য হবে।
অন্যদিকে বিচার বিভাগ সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশও বাতিলের সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। এগুলো হলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশ। সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয়বিষয়ক অধ্যাদেশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অধস্তন আদালতের কর্তৃত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর পুরোপুরিভাবে ন্যস্ত করার জন্য এটি করা হয়েছিল। এই অধ্যাদেশ সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় বাস্তবায়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে আদালতের এক রায়ে ৩ মাসের মধ্যে একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে বলা হয়। পরে পৃথক সচিবালয়ের জন্য অধ্যাদেশটি হলো। এই অধ্যাদেশের অধীনে অনেকগুলো কাজও এরই মধ্যে হয়ে গেছে। এই পৃথক সচিবালয়ের একজন সচিব নিয়োগ করা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, জনবলকাঠামো তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি একাধিক বৈঠক করেছে, জনবলকাঠামো তৈরি করেছে এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনবলও নিয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া পৃথক সচিবালয়ের বাজেট প্রণয়নের জন্য অনেকগুলো টেকনিক্যাল কাজ করা হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরের জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ হয়েছে, এর ভিত্তিতে সেখানে কাজও চলছে। এমনকি আগামী অর্থবছরের বাজেটও ছাড় করার জন্য প্রস্তুতি ছিল।
অর্থাৎ অধ্যাদেশটি হওয়ার পর এর অধীনে উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য দালিলিক ও বাস্তবিক দুই ধরনের কাজই হয়েছে। এখন এই অধ্যাদেশ যদি অকার্যকর হয়ে যায়, তাহলে এই সচিবালয়ের অবস্থা কী দাঁড়াবে? এটা নিয়ে একধরনের শূন্যতা বা সমস্যা তৈরি হবে। যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনি বাধ্যবাধকতা আছে, সেহেতু অধ্যাদেশটা অকার্যকর হলে এই বাধ্যবাধকতা কীভাবে আইন মন্ত্রণালয় পরিপালন করবে, সেটাও একটা প্রশ্ন। আইন মন্ত্রণালয় যদি এই বাধ্যবাধকতা পরিপালন না করে, তাহলে তা আদালত অবমাননা হবে। এখানে একধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। নতুন সরকারের শুরুতেই বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমরা বিরোধের জায়গায় চলে যাচ্ছি কি না, সেটাও বিবেচনা করতে হবে।
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ—এর সব কটিই জনগণের অধিকার সুরক্ষা, শাসনকাঠামোয় দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা এবং ক্ষমতার পৃথক্করণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এ কারণেই এই অধ্যাদেশগুলোর গুরুত্ব সাংবিধানিক সংস্কারের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কাজেই এগুলোকে অকার্যকর করা নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গিতে খুবই হতাশাব্যঞ্জক এবং এর ফলে দেশের শাসনকাঠামো সংস্কারের যে বিপুল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছিল, সেটা প্রথমেই একটা বড় ধরনের নেতিবাচক পদক্ষেপের মুখে পড়ল।
ড. শরীফ ভূঁইয়া: জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট