ভোটের আলাপ–২

রেখা বেগম চান খালের ওপর সেতু, কবির হোসেনের চাওয়া শান্তি

সুন্দরবন আর রেখা বেগমের বাড়ির মধ্যে ছোট নদী ভোলা। ছোট হতে হতে নদীটি নালার চেহারা নিয়েছে। রেখা বেগমের মহিষগুলো নিয়মিত নদী পেরিয়ে সুন্দরবনে যায় চরতে। সুন্দরবন থেকে শূকরের পাল এসে নিয়মিত রেখা বেগমের খেত নষ্ট করে। রেখা বেগমের গ্রামের নাম পিসি বারুইখালি ধানসাগর। এই গ্রামে এখনো নির্বাচনের তেমন বাতাস লাগেনি।

গ্রামটি বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৩ নম্বর বিশালবাড়িয়া ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে। গ্রামটি সুন্দরবন থেকে আলাদা করে রেখেছে ভোলা নদী। তবে নদী আর নদী নেই। নদী ভরাট হওয়া জমিতে গড়ে উঠেছে বসতি। গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের মতো রেখা বেগমের পরিবারও নদীর জমিতে বসবাস করছে ২৫-৩০ বছর ধরে।

১৬ জানুয়ারি শুক্রবার সকালে রেখা বেগমের সঙ্গে কথা হয় তাঁর বাড়িতে। কথায় কোনো জড়তা নেই। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। চার ছেলেমেয়ের মা। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বললেন, জীবনে কোনো দিন বাঘ দেখেননি। জীবনে কোনো দিন নদী পার হয়ে সুন্দরবনে যাননি।

মাঠে কাজ ফেলে কথায় যুক্ত হন রেখা বেগমের স্বামী নূরু ফরাজি। তিনি বলেন, ‘আগের বার ভোট দিতে গেছি, যাইয়ে দেহি মোর ভোট দ্যাওয়ন শেষ। এবার ভোট দিমু। ভোডডা নাহি সুন্দর হইবো।’

রেখা বেগম কিছুটা চমকে যান যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, এবার নির্বাচনে ভোট দেবেন? রেখা বেগম বলেন, এখনো কেউ ভোট চাইতে আসেনি। তবে তিনি ভোট দিতে চান, ভোট দেবেন।

মাঠে কাজ ফেলে কথায় যুক্ত হন রেখা বেগমের স্বামী নূরু ফরাজি। তিনি বলেন, ‘আগের বার ভোট দিতে গেছি, যাইয়ে দেহি মোর ভোট দ্যাওয়ন শেষ। এবার ভোট দিমু। ভোডডা নাহি সুন্দর হইবো।’

এরই মধ্যে রুহুল আমিন ফরাজি এসে হাজির। তিনি নূরু ফরাজির বড় ভাই। রুহুল আমিন ফরাজি বলেন, ‘এবার ভোট দিমু ইনশা–আল্লাহ।’ তবে তিনি এ–ও বলেন, ভোট দেওয়া ঠিকঠাকভাবে করতে হলে মাঠে সেনাবাহিনী নামাতে হবে।

একসময় ডিম ভাজি আর চা আসে। চা খেতে খেতে রুহুল আমিন ফরাজি বলেন, ছাত্ররা না থাকলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে কেউ সরাতে পারত না।

এরই মধ্যে রুহুল আমিন ফরাজি এসে হাজির। তিনি নূরু ফরাজির বড় ভাই। রুহুল আমিন ফরাজি বলেন, ‘এবার ভোট দিমু ইনশা–আল্লাহ।’ তবে তিনি এ–ও বলেন, ভোট দেওয়া ঠিকঠাকভাবে করতে হলে মাঠে সেনাবাহিনী নামাতে হবে।

তাঁদের কথা খুবই পরিষ্কার। কোনো সরকারই এই গ্রামের জন্য কিছু করে না। কোনো সংসদ সদস্য তাঁদের দিকে ফিরেও তাকায় না। তবু কী চান নতুন সরকার বা নতুন সংসদ সদস্যের কাছে—প্রশ্ন করি।

রেখা বেগম আর কিছু চান না। শুধু চান বাড়ির পাশের ছোট খালের ওপর একটা ব্রিজ হোক। খালটি এসে মিশেছে ভোলা নদীতে। এই ব্রিজ নেই বলে এক মণ ধান ১০০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হয়। আগামী নির্বাচনে যেই দলই জিতুক, তারা যেন ব্রিজটা করে দেয়। রেখা বেগমের কথায় ঘাড় নেড়ে সায় দেন নূরু ফরাজি।

এই গ্রামের কাছের বাজারটির নাম জিউদাড়া। মাটির রাস্তা ধরে, কাঠের নড়বড়ে সেতু পার হয়ে জিউদাড়া যেতে হয়। বাজারটি ছোট, কিন্তু বেশ কয়েকটি রাস্তা বাজারে মিশেছে। একটি ছোট খাল বাজারটিকে দুই ভাগ করেছে। খালের ওপর কালভার্ট। কালভার্টের অর্ধেক মোংলা উপজেলার মধ্যে, বাকি অর্ধেক মোরেলগঞ্জ উপজেলার মধ্যে।

ইলেকশন এখনো জমে নাই। আপনি ২২-২৩ তারিখ আসেন। এখনো ক্যান্ডিডেটরা বাড়ি বাড়ি যাওয়া শুরু করে নাই। মানুষ এখনো বুঝে উঠতে পারছে না কাকে ভোট দেবে। এখানে বিএনপিতে দুই ভাগ। আওয়ামী লীগের নেতারা না থাকলেও ভোটার আছে। একটা জগাখিচুড়ি পরিস্থিতি।
মোটরসাইকেলচালক মনিরুল ইসলাম

ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালক মনিরুল ইসলামের বাড়ি জিউদাড়া বাজারের মোরেলগঞ্জ অংশে। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। ১৭ বছর ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। হাতের তালুর মতো এই এলাকা তাঁর চেনা। তিনি বলেন, ‘ইলেকশন এখনো জমে নাই। আপনি ২২-২৩ তারিখ আসেন। এখনো ক্যান্ডিডেটরা বাড়ি বাড়ি যাওয়া শুরু করে নাই। মানুষ এখনো বুঝে উঠতে পারছে না কাকে ভোট দেবে। এখানে বিএনপিতে দুই ভাগ। আওয়ামী লীগের নেতারা না থাকলেও ভোটার আছে। একটা জগাখিচুড়ি পরিস্থিতি।’

ইজিবাইকচালক কবির হোসেনের বাড়ি জিউদাড়া বাজারের মোংলা উপজেলা অংশে। বয়স ষাটের ওপর। রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এ কারা, কেন আগুন দিয়েছে, তা–ও তিনি জানেন। সাংবাদিকেরা সব সময় কেন ঠিক কথা লিখতে পারেন না, তার দীর্ঘ একটি ব্যাখ্যা তিনি দিলেন। বললেন, স্কুল বা মাদ্রাসার কোনো শিক্ষা তাঁর নেই।

ইজিবাইকচালক বলেন, ‘ভোটাররা ঘাপটি মেরে আছে। কেউ মুখ খুলবে না। বিএনপির প্রার্থী এলে বলে হ্যাঁ, হ্যাঁ। জামায়াতের প্রার্থী এলে বলবে ঠিক আছে, ঠিক আছে। ভয়ে পক্ষ নেবে, ভয়ে পক্ষ নেবে না। পক্ষ নিয়ে কি মরবে? হারলে যদি বাড়িঘরে হামলা হয়, বাড়ি ছাড়তে হয়, ছেলে-মেয়ে-বউ রেখে এলাকা থেকে চলে যেতে হয়?’

ভোট কি সুষ্ঠু হবে বলে মনে হয়? উত্তরে কবির হোসেন বলেন, ভোটাররা তো শান্তি চায়, শান্তিমতো ভোট দিতে চায়। উসকানি দেয় তো প্রার্থী বা প্রার্থীর লোক। এ করব তা করব। বিএনপি আর জামায়াত যদি চায়, তবেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।