ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে বিশেষভাবে তৎপর থাকবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনী ইতিমধ্যে অভিযান জোরদার করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি। একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এবার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’–এর আওতায় আগে থেকেই সারা দেশে মোতায়েন আছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালন শুরু করেছে তারা। গতকাল বিকেলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তাঁরাও গতকাল থেকে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন।
ভোট কারচুপির কোনো ধরনের শঙ্কা নেই। খুব শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হবে।মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত শনিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, এবার ১ লাখ ৮ হাজারের মতো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বিজিবির সদস্য ৩৭ হাজারের বেশি, কোস্টগার্ড সাড়ে ৩ হাজারের বেশি, পুলিশ সদস্য প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার এবং আনসার সদস্য থাকবেন ৫ লাখ ৬৭ হাজার। র্যাব সদস্যরাও
দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটকেন্দ্র বা কেন্দ্রের বাইরে কোনো অভিযোগ বা সহিংসতা হলে নির্বাচনী সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে বার্তা চলে যাবে এবং দ্রুত হস্তক্ষেপ করা যাবে। বডি-ওর্ন ক্যামেরাও থাকবে।
এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে সেনাসদস্যরা মূলত ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এবার জাতীয় নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় তিন বাহিনীকে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও ভোটকেন্দ্রে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মতো ভোটকেন্দ্রেও দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার (ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা) ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকছে।
এর আগে গত জানুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা প্রতিটি জেলা, উপজেলা, মেট্রোপলিটন এলাকার নোডাল পয়েন্ট ও অন্যান্য সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান করবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে টহল ও অন্যান্য আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। প্রয়োজনে নিরাপত্তা সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নির্দিষ্ট কেন্দ্রে স্ট্যাটিকভাবে অথবা দ্বিতীয় পর্বে ভোটকেন্দ্রিক মোতায়েনের অংশ হিসেবে কয়েকটি কেন্দ্রকে গ্রুপ করে মোবাইল টহলের আওতায় মোতায়েন হবে। মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে। উপকূলবর্তী এলাকায় নৌবাহিনী প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে এবং সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বপূর্ণ এলাকা অনুযায়ী কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করবে।
গতকাল রংপুরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক মতবিনিময় সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো ধরনের শঙ্কা নেই। খুব শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হবে।
বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘যে জায়গায় যে রকম ব্যবস্থা নেওয়ার, ওই ধরনের প্রস্তুতি আমাদের নেওয়া হয়েছে।’
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ১৬ হাজার ৩৫৯টি। ঝুঁকি নেই, এমন ভোটকেন্দ্র (সাধারণ) ১৭ হাজার ৬৫৬। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, এবার মহানগর এলাকার বাইরে সারা দেশে প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৬ থেকে ১৭ জন সদস্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ থেকে ১৮ জন মোতায়েন থাকবেন। আর মহানগর এলাকার সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন থাকবেন। দুর্গম ঘোষিত ২৫ জেলার নির্দিষ্ট এলাকার ভোটকেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৮ জন করে সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এসব সদস্য ভোট গ্রহণের দুদিন আগে থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন।