
সন্তান হারানো শোকের কি কোনো শেষ আছে! দিন পেরিয়ে বছর গড়ায়—তবু বাবা-মায়ের হাহাকার থামে না। যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী সোহেল রানা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মা রাশেদা বেগমের জীবনও যেন থমকে ছিল একটি প্রশ্নে—কোথায় আমার ছেলে?
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলনে গিয়ে আর বাড়িতে ফেরেননি ৩৮ বছর বয়সী সোহেল রানা। পরে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মরদেহ চিনতে পারলেও কোথায় দাফন করা হয়েছে, তা জানত না পরিবার।
৩৪ দিন পর রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধসংলগ্ন কবরস্থানে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহগুলোর নথিতে সোহেলের ছবি খুঁজে পান তাঁরা। তখন থেকেই রাশেদা বেগম ছেলের লেমিনেটিং করা ছবি হাতে নিয়ে কবরস্থানে গিয়ে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করতেন। ১১৪টি বেওয়ারিশ কবরের ভিড়ে খুঁজতেন, কোনটি তাঁর ছেলের?
অবশেষে ৫ জানুয়ারি সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন রাশেদা বেগম। ছেলের ছবি নিয়ে কবরস্থানের যে জায়গায় তিনি প্রায় সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন, সেটি ২৯ নম্বর কবর। কবর থেকে ১১৪টি লাশ তুলে ডিএনএ পরীক্ষা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, ২৯ নম্বর কবরেই সোহেলকে দাফন করা হয়েছে।
সোহেলের কবর খুঁড়ে শুধু হাড় পাওয়া গেছে। তাই রাশেদা বেগমের কণ্ঠে চাপা ক্ষোভ, যদি আরও আগে লাশগুলো তোলা হতো, তাহলে হয়তো ছেলের মুখটা অন্তত শেষবার দেখতে পেতেন।
ছেলে বড় হয়ে তার বাপের কবর কোনটা, তা তো জানতে পারবে, এটাই স্বস্তি।জেসমিন আক্তার, জুলাই আন্দোলনে নিহত মাহিন মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী
চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সোহেল রানা ছিলেন সবার বড়। তিনি কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ কাজলায় তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ওই জুলাইয়ে উত্তাল ছিল বাংলাদেশ। ক্ষমতাসীনদের দমন–পীড়নে রক্তাক্ত দেশ এক অভ্যুত্থানের পথে যায়। সেই তোড়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার এসে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের পাশাপাশি তখন বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেয়।
আট পরিবারের অপেক্ষার অবসান
শুধু সোহেল রানার পরিবার নয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত এবং এত দিন বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া শহীদদের আটটি পরিবার তাদের স্বজনের কবর খুঁজে পেয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৮০ জন, আগস্টে আরও ৩৪ জনসহ মোট ১১৪টি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছিল।
পুলিশি আবেদনে আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে দাফন হওয়া এসব মরদেহ উত্তোলনের নির্দেশ আসে আদালত থেকে। গত বছরের ৪ আগস্ট আদেশ হওয়ার পর ৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে মরদেহ তুলে অস্থায়ী মর্গে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও ময়নাতদন্ত করা হয়। পরিচয় শনাক্ত করতে অজ্ঞাতপরিচয় শহীদদের নয়টি পরিবারের সদস্যরা ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন। স্বজনদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে আটজনের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে সিআইডি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ কাজে আন্তর্জাতিক ফরেনসিক–বিশেষজ্ঞ লুয়িস ফনডিব্রাইডারসহ দেশি-বিদেশি ফরেনসিক–বিশেষজ্ঞরা সহায়তা করেন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৮০ জন এবং আগস্টে আরও ৩৪ জনসহ মোট ১১৪টি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছিল।
স্বজনদের সঙ্গে ডিএনএ মেলার পর পরিচয় শনাক্ত হওয়া অন্য শহীদেরা হলেন মো. মাহিন মিয়া, আসাদুল্লাহ, পারভেজ ব্যাপারী, রফিকুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, ফয়সাল সরকার ও কাবিল হোসেন। অন্য একটি মৃতদেহের শনাক্তকরণপ্রক্রিয়া চলছে।
‘কবরডা পাইয়া একটু শান্তি পাইছি’
২৩ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি পারভেজ ব্যাপারীর কবরের নম্বর ২৪। তাঁর বাবা সবুজ ব্যাপারী এত দিন চাঁদপুরের মতলব থেকে রায়েরবাজারে এসে জিয়ারত করলেও কোনটা ছেলের কবর, জানতেন না। এখন জানতে পেরেছেন।
সবুজ ব্যাপারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন কবরডা অন্তত দেখতে পাইলাম। কবরডা পাইয়্যা তো একটু শান্তি পাইছি। তৃপ্তি হইছে।’
পারভেজ ব্যাপারীর নাম শহীদ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেটে তালিকাভুক্ত হয়েছে। মাসিক ভাতাসহ সরকারি আর্থিক সহায়তাও পাওয়া গেছে। সরকারি সহায়তার টাকায় দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন সবুজ ব্যাপারী। ১৪ বছর বয়সী এক মেয়ে পড়াশোনা করছে।
এখন কবরডা অন্তত দেখতে পাইলাম। কবরডা পাইয়্যা তো একটু শান্তি পাইছি। তৃপ্তি হইছে।সবুজ ব্যাপারী, জুলাই আন্দোলনে নিহত পারভেজ ব্যাপারীর বাবা
তবু ৫০ বছর বয়সী সবুজ ব্যাপারীর আক্ষেপ, ‘একমাত্র ছেলেটাই মারা গেছে, টাকাপয়সা দিয়া আর কী হবে?’
সবুজ ব্যাপারী সোনারতরি লঞ্চের ক্যানটিন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। বাড্ডায় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর ১০ থেকে ১৫ দিন হন্যে হয়ে থানা, হাসপাতাল, কারাগারসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেন। তখনো মনে আশা ছিল, ছেলে হয়তো বেঁচে আছেন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে গিয়ে জানতে পারেন, ‘ওপরের নির্দেশে’ সব লাশ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়েছে। মর্গে লাশের ছবির মধ্যে প্রথম ছবিটিই ছিল তাঁর ছেলের। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কার্যালয়ের বোর্ডে টানানো ছবিতেও ছেলেকে তিনি শনাক্ত করেছেন।
ছেলের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে চাকরি হারিয়েছেন সবুজ ব্যাপারী। ছেলে ও চাকরি—দুটিই হারিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কই থেইক্যা দেশ পামু? দেশ চলছে কই? মারামারি খুনাখুনি বাড়ছে। হুদাই ছেলেগুলান মরল।’
‘হাড় ছাড়া কিছুই ছিল না’
ছয় বোন ও দুই ভাইয়ের একজন ২৬ বছর বয়সী ফয়সাল সরকার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি শ্যামলী পরিবহনের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতেন। উত্তরায় আন্দোলনের সময় ১৯ জুলাই নিখোঁজ হন।
ফয়সালের ভগ্নিপতি মো. আবদুর রহিম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে গিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঠানো মাথায় গুলিবিদ্ধ লাশের ছবি দেখেই তাঁকে চিনতে পারেন। মাথার ব্যান্ডেজে লেখা ছিল—‘হাড় নেই, চাপ দেবেন না’।
লাশের ছবি শনাক্ত করতে পারলেও ফয়সালকে কোথায় দাফন করা হয়েছে, তা জানত না পরিবার। এখন জানে, কবর নম্বর ৩৫-এ শুয়ে আছেন তাঁদের ফয়সাল।
গত বছরের ৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে মরদেহ তুলে অস্থায়ী মর্গে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও ময়নাতদন্ত করা হয়। পরিচয় শনাক্ত করতে অজ্ঞাতপরিচয় শহীদদের নয়টি পরিবারের সদস্যরা ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন। স্বজনদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে আটজনের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে সিআইডি।
৩১ বছর বয়সী গাড়িচালক আসাদুল্লাহর কবরের নম্বর ২৩। তাঁর স্ত্রী ফারজানা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কবর থেকে লাশ তোলার সময় শুধু হাড় ছিল। সেগুলো দেখার মতো ছিল না।’
আসাদুল্লাহ উত্তরায় গাড়ি চালাতেন। আন্দোলনের সময় ১৯ জুলাই তিনি নিখোঁজ হন। তাঁর ১১ বছর বয়সী এক ছেলে ও ৫ বছর বয়সী এক মেয়ে আছে। স্বামীর মৃত্যুর নিশ্চিত তথ্য জানার পর তাঁর স্ত্রী ২৭ বছর বয়সী ফারজানা উত্তরা থেকে ছেলে-মেয়ে নিয়ে গাজীপুরে বাবার বাড়িতে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন।
দুই স্ত্রীর দুই সন্তান চিনবে এক বাবার কবর
আন্দোলনের সময় ১৮ জুলাই মোহাম্মদপুর থেকে নিখোঁজ হন ৩২ বছর বয়সী মাহিন মিয়া। তাঁর দুই স্ত্রী ও দুই ছেলে। সে সময় প্রথম স্ত্রী সাথী আক্তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। শিশুটি জন্মের আগেই বাবাকে হারায়।
স্বামীর মৃত্যুর পর ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে বাবার বাড়ি চলে গেছেন সাথী আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিয়ের ১০ বছর পর প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন। কিন্তু বাবা ছেলের মুখ দেখে যেতে পারলেন না। অথচ সন্তান হচ্ছিল না বলেই স্বামী আবার বিয়ে করেছিলেন।
মাহিন মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী জেসমিন আক্তারের ছেলের বয়স দুই বছরের বেশি। তিনিও ছেলেকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে থাকেন। সেখানে মায়ের কাছে ছেলেকে রেখে মানুষের বাসায় কাজ করেন।
জেসমিন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলে বড় হয়ে তার বাপের কবর কোনটা, তা তো জানতে পারবে, এটাই স্বস্তি।’
বাবা মারা গেছেন, এটা জানতেই লেগে গেছে আট মাস। এর মধ্যে অনেক ভোগান্তি গেছে। ভোগান্তি শেষ হয়নি এখনো, শহীদ হিসেবে গেজেটে নাম তুলতে দৌড়াতে হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়।সাগর হোসেন, জুলাই আন্দোলনে নিহত কাবিল হোসেনের ছেলে
মাহিন মিয়ার কবরের নম্বর ৯। শহীদ হিসেবে সরকারি গেজেটে নাম উঠলেও মাহিন মিয়ার জায়গায় শাহিন মিয়া লেখা হয়েছে। এটা পাল্টাতে হবে বলে জানান জেসমিন আক্তার।
যাত্রাবাড়ীর গোলাপবাগে ১৯ জুলাই আন্দোলনে গিয়েছিলেন ৫২ বছর বয়সী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরে। তাঁর একমাত্র ছেলে মো. রাইয়ান ইসলাম ১৮ মাস পর জানতে পারলেন, ২৫ নম্বর কবরটি তাঁর বাবার।
গেজেটে নাম ওঠেনি যাঁদের
শনাক্ত হওয়া আটজনের মধ্যে দুজনের নাম এখনো শহীদ হিসেবে গেজেটে নেই। তাঁদের একজন ফেনীর ২৯ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম। তিনি পেশায় টাইলসমিস্ত্রি ছিলেন। তাঁর কবর নম্বর ৩০।
আরেকজন হলেন মুগদা থানার গলির বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী ব্যবসায়ী কাবিল হোসেন। তিনি মাছের ব্যবসা করতেন। তাঁর কবর নম্বর ৫১।
রায়েরবাগে ভগ্নিপতি রেজাউল করিমের বাসায় থাকতেন টাইলসমিস্ত্রি রফিকুল ইসলাম। রেজাউল করিম বলেন, মৃত্যুর আট মাস পর তাঁরা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছ থেকে রফিকুলের লাশের সন্ধান পান। লাশ শনাক্তে দেরি হওয়ায় শহীদদের তালিকায় রফিকুলের এখনো নাম ওঠেনি। গেজেটে নাম তোলার জন্য এখন দৌড়াতে হচ্ছে।
কাবিল হোসেনের ২৫ বছর বয়সী ছেলে সাগর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাবা মারা গেছেন, এটা জানতেই লেগে গেছে আট মাস। এর মধ্যে অনেক ভোগান্তি গেছে। ভোগান্তি শেষ হয়নি এখনো, শহীদ হিসেবে গেজেটে নাম তুলতে দৌড়াতে হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়।
নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা করার একমাত্র সংস্থা হচ্ছে সিআইডির ‘ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি’। এই পরীক্ষাগারের প্রধান আহমাদ ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে উত্তোলন করা মরদেহ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় এটি সংগ্রহ করা হবে। কেউ এ বিষয়ে যোগাযোগ করতে চাইলে ০১৩২০০১৯৯৯৯ হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।