একদল উগ্রবাদী গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলার পর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলা–অগ্নিসংযোগের পর ভস্মীভূত প্রথম আলো কার্যালয়
একদল উগ্রবাদী গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলার পর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলা–অগ্নিসংযোগের পর ভস্মীভূত প্রথম আলো কার্যালয়

প্রথম আলোতে হামলা

চোখের সামনে ভবন পুড়ে অঙ্গার

১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। সারা দিন অফিসের কাজ শেষ করে রাতে বাসায় ফিরি। ঘণ্টাখানেক পর আমার বিভাগের প্রধান জাহিদুল করিম ফোন দিলেন। তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে ১১টা হতে পারে। তিনি শাহবাগ থেকে বললেন, ‘আমাদের অফিসের সামনে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে স্লোগান দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি যাও।’

১.

আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে গেলাম অফিসের নিচে। দেখলাম কয়েকজন পুলিশ সদস্য প্রগতি ইনস্যুরেন্স ভবনের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি মোটরসাইকেল নিরাপদ স্থানে রেখে আমাদের মূল ভবনের সামনে গিয়ে দেখতে পাই ৫০-৬০ জন লোক স্লোগান দিচ্ছেন। একসময় তাঁরা কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউর সিএ ভবনের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।

আমি তাদের ছবি তুলতে শুরু করি। বিক্ষোভকারীদের কথা শুনে বুঝতে পারি যে শাহবাগ থেকে আরেকটি মিছিল প্রথম আলো অফিসের দিকে আসছে। আমার ভেতরে আতঙ্ক জাগল। কারণ, আমি এখানে একা ফটোসাংবাদিক। সেই রাতে ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তোলা ছিল ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। আমি নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করি। কয়েকটি ছবি তোলার পর শাহবাগ থেকে আসা মিছিলটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

রাত ১১টা ৫৩ মিনিট। কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় বিক্ষোভকারীরা

২.

রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে কয়েক শ মানুষের একটা মিছিল এসে থামে কারওয়ান বাজার মেট্রোস্টেশনের নিচে। সেখানে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো ‘প্রথম আলো এই দিকে, প্রথম আলো এইদিকে’ বলতেই সবাই আইল্যান্ডের গ্রিল টপকে প্রথম আলো ভবনের দিকে ছুটে আসে। তারপর তারা একযোগে হামলা চালায় প্রথম আলো ভবনে। মব আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। তেজগাঁও থানার ওসিসহ পুলিশের ৫-৬ জন সদস্য ঘটনাস্থলে ছিলেন। ওসি একাই মব সৃষ্টিকারীদের থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। হামলাকারীরা ভবনের শাটার ভাঙতে লাফিয়ে লাফিয়ে লাথি মারতে থাকে। অনেকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবজির ট্রাকে উঠে আমি ছবি তুলতে থাকি।

রাত ১১টা ৫৫ মিনিট। প্রথম আলো ভবনে হামলা শুরু করে একদল উগ্রবাদী

৩.

শাটার ভাঙতে দেরি হওয়ায় তারা ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ঢিল ছুড়ে গ্লাস ভাঙতে শুরু করে। অনেক চেষ্টার পর কোনো রকমে শাটার একটু ফাঁক করে হামলাকারীরা দলে দলে ভবনের ভেতরে ঢোকে। ভবনে ঢুকেই তারা ভাঙচুর আর লুটপাট শুরু করে দেয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে চেয়ার, সোফা, টেবিল, বই–পুস্তক ও নথিপত্র নিচে ছুড়ে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

রাত ১২টা ৩ মিনিট। শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে মালামাল লুট

৪.

দ্রুতই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাস্তায়। এরই মধ্যে কয়েকজন হামলাকারী আমাকে ওখান থেকে চলে যেতে বলে। আমি তাদের কাছ থেকে একটু সরে বিপরীত দিক থেকে আবার ছবি তুলতে থাকি। ভবন থেকে নিচের আগুনের ভেতর যতই আসবাবপত্র ও বই–পুস্তক ফেলা হচ্ছিল, ততই আগুনের শিখা বাড়ছিল।

রাত ১২টা ৬ মিনিট। লুটপাট ও ভাঙচুরের পর আসবাব–নথিপত্রে আগুন

৫.

ভবনের ভেতর থেকে লুট করা টিভি, মনিটর, সিপিইউ, ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার সময় আমি ছবি তুলতে যাই; অমনি একজন হামলাকারী কুড়াল হাতে আমাকে বাধা দেয়। আমি কুড়ালসহ তার ছবি তুলে দ্রুত ওখান থেকে সরে যাই। আবার কয়েকজন হামলাকারী প্রথমার আউটলেট থেকে বের করে আনা বই দেখিয়ে অন্যদের বলে, ‘...এই সব এখানে বিক্রি করে’।

রাত ১২টা ১১ মিনিট। লুটপাটের ছবি তুলতে গেলে ভয় দেখায় কুড়াল হাতে এই হামলাকারী

৬.

রাত সাড়ে ১২টার পর হামলাকারীদের একটি অংশ মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায় ডেইলি স্টার–এর দিকে। আমিও তাদের পিছু পিছু যাই। এরই মধ্যে সেখানে চলে আসেন বিভিন্ন পত্রিকার কয়েকজন ফটোসাংবাদিক। নিরাপত্তার কথা ভেবে এক ফটোসাংবাদিককে আমার অফিসের পরিচয়পত্রটি তাঁর কাছে লুকিয়ে রাখতে বলি। আরেক পত্রিকার এক সহকর্মী তাঁর অফিসের পরিচয়পত্র আমাকে দিয়ে বলেন, ‘এটা রাখেন, বিপদে পড়লে এটা দেখাইয়েন।’

হামলাকারীদের সঙ্গে আমরা ডেইলি স্টার–এর দিকে যাওয়ার সময় দেখি, রাস্তায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা অনড় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরা কিছুই করছেন না। সেনাসদস্যদের চোখের সামনে দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে ডেইলি স্টার–এর দিকে এগিয়ে গেল হামলাকারীরা।

রাত ১২টা ৪০ মিনিট। কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান

৭.

আমি সেনাবাহিনীর ছবি তুলতেই হামলাকারীদের মধ্য থেকে একজন এসে আমার পরিচয় জানতে চায়। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে তাকে অন্য অফিসের কর্মীবন্ধুর দেওয়া পরিচয়পত্র দেখালে সে আমাকে বলে, ‘ইত্তেফাক–এ কাজ করেন?’ আমি বলি, হ্যাঁ।

পরিচয়পত্রটি ফিরিয়ে দিলে আমি দ্রুত ডেইলি স্টার–এর সামনে চলে যাই। গিয়ে দেখি সেখানেও লুটপাট আর ভাঙচুর চলছে। একদল ডেইলি স্টার ভবনেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সেই আগুন দ্রুত ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। আমি এ সবকিছুর ছবি তুলতে থাকলাম। ৪০ মিনিটের মতো ছবি তুলে আমি সেনাবাহিনীকে এ বর্বরতা থামাতে অনুরোধ করলাম। তারা নীরব দাঁড়িয়ে থাকল।

ডেইলি স্টার থেকে প্রথম আলোর দিকে ফিরে আসার সময় ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করলাম। জরুরি ভিত্তিতে এখানে যেন তারা টিম পাঠায়। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানাল, পুলিশ তাদের যদি আসতে বলে, তবেই তারা আসবে।

রাত ১২টা ৪৭ মিনিট। হামলাকারীদের দেওয়া আগুনে জ্বলছে ডেইলি স্টার ভবন

৮.

আবার আমার অফিসের সামনে ফিরে এলাম। এসে দেখি ইতিমধ্যে প্রথম আলো ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। ভবনের সামনে তারা বিক্ষোভ করছে। আবারও সব দিক থেকে ছবি তুলে যাচ্ছি। নিজের কর্মস্থল পুড়তে দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে। ছবি তোলা ছাড়া আমি আর কিছুই করতে পারছি না। ছবি তুলতে তুলতেই মনে হলো পুলিশের কথা। তাদের গিয়ে বললাম, যেন ফায়ার সার্ভিসকে তারা ফোন দিয়ে দ্রুত আসতে বলে। অনেক জোর করার পর পুলিশকে অবশেষে ফোন করতে দেখি। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় সেনাবাহিনীও চলে আসে। সবাইকে সরে যাওয়ার জন্য তারা হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিলেও হামলাকারীরা সে কথা শুনতে নারাজ। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কোনো তৎপরতা আমার চোখে পড়েনি।

প্রথম আলো ভবনের বেশির ভাগ পুড়ে যখন অঙ্গার, তখন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল। হামলাকারীরা ফায়ার সার্ভিসের সেই গাড়ি ও তাদের কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে গাড়ি ফিরিয়ে দেয়।

রাত ১টা ২৫ মিনিট। ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে আঘাত না করতে হামলাকারীদের প্রতি অনুরোধ

৯.

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আমি দাঁড়িয়ে থাকা সেনাবাহিনীকে বলি, ‘আগে এখান থেকে সবাইকে সরানো দরকার, তারপর ফায়ার সার্ভিস গাড়ির সাইরেন ও লাইট অফ রেখে কর্ডন করে নিয়ে আসতে পারবেন।’

সেনাবাহিনীর অফিসার বলেন, ‘একটু অপেক্ষা করেন।’

কিছুক্ষণ পর জ্বলন্ত প্রথম আলো ভবনের সামনে থাকা উল্লাসরত হামলাকারীদের সরিয়ে সেনাবাহিনী ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি নিয়ে আসে। অবশেষে রাত ২টা ৩০ মিনিটে আমার অফিস ভবনের আগুন নেভানোর কার্যক্রম শুরু হয়। ফায়ার সার্ভিসের আগুন নেভানোর চেষ্টার ছবি তুলে অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। রাত ৪টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে দেখলাম, আগুন নিভছে না। আমার তখন মনে হচ্ছিল সাংবাদিক হিসেবে কত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমি কাভার করেছি, কত মানুষকে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি; অথচ আজ নিজের প্রতিষ্ঠান যখন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, তখন আমিও সেই অসহায় মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থেকে শুধু দেখেছি।

রাত ১টা ৩১ মিনিট। প্রথম আলো ভবনে আগুন দেওয়ার পর হামলাকারীদের উল্লাস

মনে নানা রকম প্রশ্ন উঁকি দিয়ে গেল, ভবনটি কি আর আগের মতো কর্মব্যস্ত হবে? লুট হয়ে যাওয়া মালামাল কি উদ্ধার হবে? সহকর্মীরা পরিবার-সন্তানের ছবি, আবার অনেকে তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের ক্রেস্ট দিয়ে সাজিয়ে রাখেন তাঁর ডেস্ক। আগুনের সঙ্গে সেই সব স্মৃতিও পুড়ে যাচ্ছে। ভবন আবার নতুন করে গড়তে কত দিন লাগবে? এমন নানা চিন্তা মাথায় নিয়ে আমি বাসায় ফিরে যাই।

বাসায় গিয়ে চোখে আর ঘুম ধরল না। কোনো রকমে সকাল হতে না হতেই আবার ছুটে এলাম অফিসে। তখনো পোড়া ভবন থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বের হচ্ছে। তখনো ভবনের সামনে আগুনের অনেক তাপ।